ঋষিরা যতই পার্বত্যভূমি আর দুর্গম পথের কথা বলুন, পাণ্ডু এই স্বর্গ-যাত্রা বা ব্রহ্মলোকে যাত্রার নিষেধটা নিজের মতো করেই ব্যাখ্যা করলেন। পাণ্ডু বললেন–মনুষ্য-জন্ম লাভ করে চার রকমের ঋণশোধ করতে হয় মানুষকে (দেব-ঋণ, ঋষি-ঋণ, পিতৃ-ঋণ এবং মনুষ্য-ঋণ)। আমি নানাবিধ যজ্ঞ করে দেব-ঋণ থেকে মুক্ত হয়েছি। বেদপাঠ এবং তপস্যা করে ঋষি-ঋণ থেকেও মুক্ত হয়েছি। লোকের ওপর দয়া করে মনুষ্য-ঋণ থেকে মুক্ত হয়েছি। কিন্তু পিতৃ-ঋণ থেকে আমি তো মুক্ত হতে পারিনি, কারণ, আমার সন্তানই নেই–পিৰ্যাদৃণা অনির্মুক্তঃ ইদানীমস্মি তাপসাঃ আমার কী হবে? আমি কি কোনওদিনই স্বর্গের পথে যেতে পারব না?
.
৭৯.
ওঁরা বলেন–এসকেটালজি (Eschatology) সোজা কথায় মৃত্যুর পরপারের ব্যাপার-স্যাপার স্বর্গ-নরক, পিতৃলোক ইত্যাদি। আমাদের পিতৃলোকের তত্ত্বও ওই এসকেটোলজির মধ্যেই পড়ে। তবে কিনা আমাদের শাস্ত্রে-দর্শনে পিতৃলোক বলে যে কথাটা আছে, সেটা ওই এসকেটোলজির চেয়ে অনেক গভীর এবং অনেক জটিল। যে কোনও পুরানো সভ্যতায় সে মিশরীয়ই বলুন, গ্রিক-রোমানই বলুন, অথবা চৈনিক-পিতৃপুরুষের অতিলৌকিক অস্তিত্ব নিয়ে নানা কথা, নানা আচার চালু আছে। পিতৃপুরুষকে সন্তুষ্ট করার নানা উপায়ও বাতলানো আছে শাস্ত্রে। ভারতবর্ষও এই পিতৃলোকের তত্ত্বে এখনও বিশ্বাসী, নইলে শ্রাদ্ধ-সপিণ্ডকরণ, পিতা-মাতার স্মরণ-তর্পণ এখনও চলে কেমন করে?
মহাভারতের সমাজ বিশ্বাস করত যে, মানুষ চারটি ঋণ নিয়েই পৃথিবীতে জন্মায়। প্রাণিত হওয়ার কারণে সে দেবতার কাছে ঋণী। পালন এবং শিক্ষার জন্য সে ঋষির কাছে ঋণী। পিতা-মাতা একটি মানুষকে পৃথিবীতে আনেন, তার মূত্রপুরীষ ঘেঁটে তাকে বড় করে তোলেন, সেইজন্য মানুষের ঋণ থেকে যায় পিতা-মাতার কাছে। অন্যদিকে সামাজিক সম্পর্কের কারণেই একটি মানুষ অন্য মানুষের কাছে ঋণী হয়। এটাই মনুষ্য-ঋণ। এই চার রকমের ঋণই মানুষকে কোনও-না-কোনও ভাবে শোধ করতে হয়।
পাণ্ডু হস্তিনাপুরের রাজা। রাজা বলেই তাকে নানা যাগ–যজ্ঞ করতে হয়েছে এবং সেই কারণেই দেবতার আহ্বান-তর্পণে তথা দেবতার তুষ্টিতে তাঁর দেব-ঋণ শোধ হয়ে গেছে। ছোটবেলায় ব্রহ্মচর্য আশ্রমে ঋষিদের কাছে তিনি শিক্ষা নিয়েছেন, বেদপাঠ করেছেন, তপস্যা করেছেন এবং এখনও তিনি বানপ্রস্থ অবলম্বন করে যত স্বাধ্যায়-অধ্যয়ন করেছেন, যত তপস্যা করেছেন, তাতে তার ঋষি-ঋণও শোধ হয়ে গেছে বলে পাণ্ডু মনে করেন–যজ্ঞৈস্তু দেবান্ প্রণাতি স্বাধ্যায়–তপসা মুনী। আর মনুষ্য-ঋণ একজন প্রজারঞ্জক রাজার পক্ষে কখনই খুব গুরুভার নয়। কারণ পাণ্ডু প্রতিনিয়ত দান–ধ্যান করেছেন, প্রতিনিয়ত প্রজাদের সুখ-দুঃখ অনুভব করেছেন এবং রাজার আপন ক্ষেত্রে পারিবারিক এবং সামাজিক কর্তব্যগুলি তিনি এমনভাবেই পালন করেছেন যে, মনুষ্য-ঋণও তার শোধ হয়ে গেছে।
বাকি শুধু পিতৃ-ঋণ। শাস্ত্রকারেরা বলেন– সন্তান না জন্মানো পর্যন্ত পিতৃ-ঋণ শোধ হয় না। বস্তুত সন্তানকে গর্ভে ধারণ করা থেকে আরম্ভ করে তার মূত্রপুরীষ পরিষ্কার করা এবং পালন-পোষণ করার মধ্যে যে কষ্ট এবং যন্ত্রণা থাকে, সেই কষ্ট-যন্ত্রণা নিজে ভোগ না করা পর্যন্ত বোধহয় একজন নারী-পুরুষ জীবনের ঋণ থেকেই মুক্ত হন না। পিতা-মাতার ঋণ থেকে মুক্ত হবার একমাত্র উপায় তাই সন্তান সোয়ং লোকঃ পুত্রেনৈব জয্যো নান্যেন কণা। পাণ্ডুর সেই সন্তান না থাকায় তিনি আজ পরম ব্যথিত হয়ে ব্রহ্মলোকে প্রস্থান-উন্মুখ মুনিদের কাছে পরামর্শ চাইলেন। পাণ্ডু আন্তরিকভাবে জিজ্ঞাসা করলেন– আমি যেমন আমার পিতার ক্ষেত্রে অর্থাৎ তার পত্নীর গর্ভে বেদব্যাসের ঔরসে জন্মলাভ করেছি, সেইরকম আমার পত্নীদের গর্ভে কীভাবে, কোন উপায়ে আমি পুত্রলাভ করতে পারি– তথৈবাস্মিন্ মম ক্ষেত্রে কথং বৈ সম্ভবেৎ প্রজাঃ।
পাণ্ডুর কথা শুনে বোঝা যায় যে, পূর্বে নিজের পুত্র উৎপাদনের শারীরিক অসামর্থ্যে তিনি যে বানপ্রস্থের প্রতিজ্ঞা করেছিলেন, সেই প্রতিজ্ঞা এখন শিথিল হয়ে আসছে। পুত্রহীনতার যে জ্বালা তাকে পীড়িত করত, সেই জ্বালা এতকাল স্বাধ্যায়-তপস্যার পরেও সমানই রয়ে গেছে। আরও বোঝা যাচ্ছে নিজের স্ত্রীর গর্ভে অন্যের দ্বারা সন্তান উৎপাদন করাটাকে তিনি যেমন ঘৃণা করতেন, এখন যেন আর সেই কঠিন আপত্তি নেই তার। পুত্রের জন্য আকুল দৃষ্টিতে অন্যের অপেক্ষা করার মধ্যে আগে তিনি কুকুরের সাযুজ্য দেখতে পেতেন, এখন এতদিন পুত্রহীনতার জ্বালায় সেই ঘৃণাবোধ তার চলে গেছে। যে কোনও উপায়ে পুত্র লাভ করার জন্য এখন তিনি চিন্তিত, ব্যস্ত।
তপস্যা-স্বাধ্যায়ে অনেকদিন ব্যস্ত থাকার পর পুত্রলাভ করার জন্য আবার পাণ্ডুর এই উচাটন ভাব আমাদের মতো পাঠকের সন্দেহের উদ্রেক করে। পুত্র-সন্তানের জন্য প্রাচীন পিতা-মাতাদের যে উৎকণ্ঠা আমরা দেখেছি, আধুনিকেরা সেই উৎকণ্ঠার মধ্যে অর্থনৈতিক অভিসন্ধি লক্ষ্য করেছেন। তাঁরা মনে করেন এ হল পরম্পরাগত পৈত্রিক সম্পত্তি নিজের আয়ত্তে রাখার অন্যতম প্রয়াস। পুত্র-সন্তান হলে মৃত্যুর পরেও সম্পত্তি অন্যের ভোগ-দখলে যাবে না, এই আকাঙ্ক্ষাতেই মানুষ পুত্র চায়।
