শতশৃঙ্গের হিম-শীতল পরিবেশে আরও কঠোর স্বরাগ্য অবলম্বন করে পাণ্ডু তপস্যা আরম্ভ করলেন। বাগিন্দ্রিয়–মনোবুদ্ধি একত্র সংযতইয়ায় পাণ্ডুর চেহারার মধ্যে স্বর্গীয় দ্যুতি পরিস্ফুট হল। একে ওই কঁচা সোনার মতো পাণ্ডুবর্ণ, তার মধ্যে পূর্বতন রাজকীয় অভিব্যক্তি আবার তার মধ্যে জিতেন্দ্রিয় শুদ্ধাচার। সব মিলিয়ে পাণ্ডু সিদ্ধ-চারণদের থেকেও সুন্দর দেখতে হয়ে গেলেন–সিদ্ধ-চারণ সংঘানাং বভূব প্রিয়দর্শনঃ। বয়সের অনুপাতে পর্বতনিবাসী মুনিরা কেউ তাকে পুত্রের মতো দেখতেন, কেউ ভ্রাতার মতে, কেউ বা আপন সখার মতো কেঞ্চিদভব ভ্রাতা কেষাঞ্চিভবৎ সখা। সঙ্গগুণে এবং আপন তপস্যায় পাণ্ডুও হয়ে উঠলেন ব্রহ্মর্যির মতো–ব্রহ্মর্ষিসদৃশঃ পাণ্ডু-বর্ভূব ভরতর্যভ।
পাণ্ডু মুনি-ঋষিদের সুখসঙ্গে ভালই আছেন। তার দুই স্ত্রী কুন্তী ও মাদ্রী স্বামীর ব্রত অবলম্বন করে পাণ্ডুকে যথেষ্ট সন্তুষ্ট রেখেছিলেন। এরই মধ্যে একদিন। সেদিন অমাবস্যা তিথি। সন্ধ্যা নামলে আকাশে চাঁদ উঠবে না। অতএব সকাল সকাল বেরিয়ে পড়তে হবে এমন একটা প্রয়াস নিয়েছিলেন মুনি-ঋষিরা। তপস্যার কঠোরতায় এই মুনি-ঋষিদের শরীর অত্যন্ত শক্ত। শীত-গ্রীষ্ম-রুক্ষতা ছাড়াও পথশ্রম এঁদের মোটেই ক্লান্ত করে না। এই মুনি-ঋষিরা ভগবান ব্রহ্মার সঙ্গে দেখা করতে ইচ্ছে করে গমনে উদ্যত হলেন–ব্রহ্মাণং দ্রষ্ট্রকামাস্তে সম্প্রতমহর্ষয়ঃ।
গমনোদ্যত ঋষিদের দেখে পাণ্ডু বললেন–কোথায় যেতে চাইছেন। ঋষিরা বললেন– আজ ব্রহ্মলোকে ব্রহ্মার সভায় অনেক মহাত্মা পুরুষের সম্মেলন ঘটবে– সমাবায়ো মহানদ্য ব্রহ্মলোকে মহাত্মানা। দেবতারা আসবেন, ঋষিরা আসবেন, এমনকি স্বর্গস্থ পিতৃগণও আসবেন সেখানে। আমরা তাই ব্রহ্মার সভায় উপস্থিত হতে চাইছি আজই।
দেবতা বা ঋযিদের থেকেও পূর্বতন পিতৃগণ এই সভায় আসবেন–পিতৃণাঞ্চ মহাত্মানাম–শুনে পাণ্ডুর কিছু ভাববিকার হল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে তার দুই স্ত্রীকে ইঙ্গিত করে ঋষিদের কোনও কথা জিজ্ঞাসা না করে তাদের অনুগমন করলেন নিঃশব্দে–পাণ্ডুরুথায় সহসা গন্তুকামো মহর্ষিভিঃ। পাণ্ডুর সঙ্গে তার দুই স্ত্রীকে আসতে দেখে তপস্বীরা একটু চিন্তিত হলেন। লোকে যাকে স্বর্গ বলে এ যে তার চেয়েও দূরের পথ। হিমালয় ছেড়ে আরও উত্তরে দুর্গম পথে যেতে হবে ব্রহ্মলোকে স্বর্গপারং তিতীষুঃ স শতশৃঙ্গা উদঙমুখঃ।
মানুষের এই সুন্দর পৃথিবীর মধ্যেই যে স্বর্গের ঠিকানা আছে– সেকথা আমরা মহাভারত–কথা আরম্ভ-পর্বেই বলে এসেছি। ব্রহ্মলোক আরও উত্তরে। ঋষিরা পাণ্ডকে বললেন– আমরা এই পর্বতরাজ হিমালয় অতিক্রম করে আরও উত্তরে আরও ওপর দিকে বেশ কয়েকবার গিয়েছি– উপর্যুপরি গচ্ছন্তঃ শৈলরাজ উদমুখাঃ। সে দেশ অত্যন্ত মনোরম কিন্তু ভীষণ দুর্গম। সমতল, বিষমতল প্রদেশ দিয়ে যেতে যেতে বড় বড় নদী, দুর্গম পর্বতগুহাও পড়বে–মহানদীনিতম্বাংশ্চ গহনা গিরিগরা।
এই চলার পথ দেখে বুঝতে পারি–এগুলিকেই ইংরেজিতে পাস বলে। যে পথ দিয়ে আর্যরা উত্তরকুরু-দেশ থেকে ভারতে এসেছিলেন, এ হল সেই সব পথ। মুনিরা বলেছেন যেতে যেতে অনেক দেশ পড়বে যেখানে সব সময়েই তুষারপাত ঘটছে, বৃক্ষ নেই, পশু নেই, পক্ষী নেই সন্তি নিত্যহিমা দেশা নিবৃক্ষ-মৃগ-পক্ষিণঃ। কোথাও ভীষণ বৃষ্টি হচ্ছে, কোথাও বা পথ এমনই দুর্গম যে আকাশগামী পক্ষীরাও সেখান দিয়ে উড়ে যেতে ভয় পায়।
আমরা মহাভারত–কথার আরম্ভে স্বর্গ, ব্রহ্মলোক, বিষ্ণুলোক ইত্যাদি মহান স্থানের একটা ভৌগোলিক অবস্থান দেখাবার চেষ্টা করেছি এবং বলেছি–সেকালের দিনে বয়সকালে কাশী যাবার মতো আর্যরাও তাদের এই পুরাতন বসতিতে ফিরে যাবার চেষ্টা করতেন। এখানে দৃঢ়ব্রত মুনি-ঋষিরাই–ঋষয়ঃ সংশিতব্রতাঃ–এই ব্রহ্মলোক-যাত্রায় শামিল হয়েছেন। পাণ্ডুও তার দুই স্ত্রীকে নিয়ে এই যাত্রায় ঋষিদের অনুষঙ্গী হতে চান। কিন্তু বাস্তব অবস্থা বুঝে ঋষিরা বললেন–আপনি একা হলেও হত। এই দুই রাজকন্যা আপনার সহধর্মচারিণী হলেও এই দুর্গম পথে যাবার অযোগ্য। তারা পথেই অবসন্ন হয়ে পড়বেন। এই দুর্ঘটনা যাতে না হয়, তার জন্য আপনার সেখানে যাবার চেষ্টা করা উচিত নয়, মহারাজন সীদেতামদুঃখাহেঁ মা গমনী ভরতৰ্ষভ।
পাণ্ডু কথাটা শুনলেন বটে কিন্তু তিনি বড়ই দুঃখিত হয়ে পড়লেন। বিশেষত আগে তিনি শুনেছেন–পূজনীয় পিতৃগণ ব্রহ্মার সভায় মিলিত হলেন। প্রধানত এই শব্দটিই তাঁকে উৎসাহিত করেছে। আমরা মহাভারত-পুরাণের উদাহরণ দিয়ে পুর্বে দেখিয়েছি যে, বয়স পরিপক্ক হলে সেকালের আর্যরা তাদের পুরাতন দেশে ফিরে যেতে চাইতেন। পরবর্তীকালে স্বর্গের ঠিকানা পালটেছে এবং এক্কেবারে এই কলিকালে সেটা গয়া-কাশী-বৃন্দাবনে এসে ঠেকেছে। পাণ্ড অন্তত এই পিতৃলোকের অধ্যুষিত ভূমিতে একবার যেতে চান। কিন্তু মুনিরা যখন বারণ করলেন, তখন তার মনস্তত্ত্বের এক গোপন স্থানে তা কাটা হয়ে বিধল। যেখানে বিধল, সেটা সেকালের মানুষের অন্তহীন বিশ্বাসের জায়গা।
পাণ্ডু বললেন– আপনারাই বলেন যে, নিঃসন্তান লোকের স্বর্গে যাবার অধিকার নেই–অজস্য মহাভাগ ন দ্বারং পরিচক্ষতে। আমার শরীর নষ্ট হলেই আমার পূর্বতন পিতৃগণের পতন হবে। কারণ তাঁদের ঋণ আমি শোধ করতে পারিনি। পিতৃঋণ শোধ করা যায় সন্তানের পালন-পোষণের মাধ্যমে। কিন্তু আমার সন্তানই হয়নি, আমি তাহলে কী করে পিতৃঋণ শোধ করব?
