কুন্তী এবং মাদ্রী বেশ খানিকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে পাণ্ডুর উপদেশ শুনলেন। শোনার পর তারা দুজনেই একসঙ্গে বললেন– তৎসমং বচনং কুন্তী মাদ্রী চ সমভাষতাম। একসঙ্গে বললেন এই শব্দ মেনে নিয়েও বলি একসঙ্গে একই কথা বলা সম্ভব নয় বলেছেন একজনই এবং অন্যজন তা সমর্থন করেছেন। আমরা জানি এই বলার লোকটি হলেন কুন্তী। জীবনের অনেক আঘাত, অনেক জটিলতা এবং অভিজ্ঞতা তাকে অনেক বাস্তব-বুদ্ধিসম্পন্না করে তুলেছে। আর্যক শূরের ঘর থেকে তাকে দত্তক দেওয়া হয়েছিল কুন্তিভোজের বাড়িতে। পরের ঘরে সমস্ত স্বাধীনতা নিয়ে তিনি পালিত হননি। উপরন্তু কন্যাভাবে পুত্রজন্ম তার মধ্যে অন্য এক বিপন্নতা তৈরি করেছিল। স্বামীর ঘরে এসে স্বামীর ওপর অসীম নির্ভরতায় তিনি তার দুঃখ ভুলতে আরম্ভ করেছিলেন কেবলই। ঠিক সেই মুহূর্তে ঘোষিত হল– পাণ্ডুর প্রজননের সামর্থ্য নেই অতএব তিনি মুনিবৃত্তি গ্রহণ করবেন।
এই উদগ্র বৈরাগ্যের মুখে কুন্তী যদি তাকে বলতেন– না তোমার যাওয়া চলবে না। তুমি এই সংসারেই থাক– তাহলে ফল বিপরীত হত এবং পাণ্ডু হয়ত আরও উগ্র হয়ে উঠতেন। কুন্তী তাই বললেন–মহারাজ! আমরা তোমার ধর্মপত্নী। তুমি একা একা কেন তপস্যা করবে? গৃহস্থ-আশ্রম ছাড়াও অন্য কোনও আশ্রম তুমি অবলম্বন করতে পার, যেখানে আমরাও তোমার সহধর্মচারিণী হতে পারি, একই সঙ্গে আমরাও তোমার তপস্যার অংশীদার হতে পারি– আবাভ্যাং ধর্মপত্নীভ্যাং সহ তপুং তপো মহৎ।
কুন্তী বলতে চাইলেন–শম-দম-তপস্যার জন্য সংসার ত্যাগ করার কোনও প্রয়োজন নেই। বরঞ্চ পাণ্ডুর স্বার্থে তার গৃহিণীরাই ভোগ-সুখ পরিত্যাগ করে যোগিনী হবেন। তাছাড়া ব্রহ্মচর্য, গার্হস্থ্যের অব্যবহিত পরে বানপ্রস্থ আশ্রমের নাম আসে, সন্ন্যাসের নাম আসে না। বানপ্রস্থে পুত্রদের কাছে স্ত্রীকে রেখেও যেমন বনে যাওয়া যায়, তেমনই সপত্নীক অবস্থাতেও বানপ্রস্থ আশ্রম শাস্ত্রকারদের অনুমোদিত পুত্রে দারা নিক্ষিপ্য বনং গচ্ছেৎ সহৈব বা। পাণ্ডুর বৈরাগ্য–বাসনা দেখে কুন্তী প্রতিজ্ঞা করলেন– আমরা আজ থেকে ইন্দ্রিয়ের দ্বার রুদ্ধ। করে, কাম-সুখ ভোগ-বিলাস সমস্ত বাদ দিয়ে তোমারই সঙ্গে তপস্যা করব– ত্যক্তকামসুখে হ্যাঁবাং ত্যাবো বিপুলং তপঃ। এই বানপ্রস্থের তপস্যায় তোমার স্বর্গলাভ হলে আবারও আমরা তোমাকেই স্বামী হিসেবে পাব। আর তুমি যদি আমাদের ছেড়ে একা একা বনবাসী হও, তবে আজই আমাদের মরা ছাড়া গতি নেই–অদ্যৈবাবাং প্রহাস্যাবো জীবিতং নাত্র সংশয়ঃ।
কুন্তীর এই বক্তব্যের মধ্যে আন্তরিকতার অভাব ছিল না কোনও। বাপের বাড়ি, পালক পিতার বাড়ির শত অস্বস্তি বহন করেও কানীন গর্ভের আকস্মিকতা ভুলে কুন্তী নতুন করে শুধু স্বামীর ঘর করতে চেয়েছিলেন। সেই স্বামীর শারীরিক অসামর্থ্য প্রকট হতেও তিনি ব্যথিত হননি, যতখানি ব্যথিত হলেন তার আকস্মিক বৈরাগ্যে এবং একাকী তপশ্চর্যার বিলাসে।
পাণ্ডু কিন্তু কুন্তীর যুক্তি মেনে নিয়েছেন। মেনে নিয়েছেন কুন্তীর ঐকান্তিকতায়, তার ব্যক্তিত্বে এবং সাহচর্যের সরসতায়। পাণ্ডু বলেছেন–এই যদি তোমাদের একান্ত ইচ্ছে হয়, তাহলে তপস্যা, বৈরাগ্য, সাধন-ধ্যানে আমি দিনাতিপাত করব এখন থেকেই। বানপ্রস্থ আশ্রমের তীব্র–কঠিন সাধন অবলম্বন করব যতদিন আমার মৃত্যু না হয় এবমারণ্যশাস্ত্রাণা উগ্রমুগ্রতরং বিধিম্।
কুন্তী এবং মাদ্রীর সামনে উগ্র তপস্যার অঙ্গীকার করবার সঙ্গে সঙ্গেই পাণ্ডু তাঁর রাজমুকুটখানি খুলে ফেললেন। মণি-মুকুট, বক্ষের অলঙ্কার, শ্রবণের কুণ্ডল এবং রাজবস্ত্র পরিত্যাগ করে সব বিলিয়ে দিলেন ব্রাহ্মণদের। কুন্তী এবং মাদ্রীও তাঁদের মহামূল্য অলঙ্কার স্বামীর হাতে তুলে দিলেন। সেগুলিরও সদগতি হল–বাসাংসি চ মহাহানি স্ত্রীণামাভরণানি চ। ব্রাহ্মণদের হাতে সব তুলে দেবার পর রাজভৃত্যদের ডেকে পাণ্ডু বললেন– পাণ্ডভৃত্যান্ অভাষত। বললেন– তোমরা হস্তিনাপুরে গিয়ে সবাইকে বলবে যে, অর্থ, বিষয়ভোগ, স্ত্রীসম্ভোগ– সব পরিত্যাগ করে দুই স্ত্রীর সঙ্গে পাণ্ডু বনবাসী হয়েছেন গত্বা নাগপুরং বাচ্যং পাণ্ডঃ প্রব্রজিতে বনম্।
পাণ্ডুর কথা শুনে এতকালের রাজভৃত্যদের চোখে জল এল। পাণ্ডুর সামনে দাঁড়িয়ে অনেকক্ষণ কান্নাকাটি করে উষ্ণমং বিমুঞ্চতঃ– তারা হস্তিনাপুর রওনা হয়ে গেল। রাজধানীতে পৌঁছে তারা পাণ্ডুর সমস্ত বৃত্তান্ত নিবেদন করল অস্থায়ী রাজা ধৃতরাষ্ট্রের কাছে। পাণ্ডুর দেওয়া বেশ কিছু ধনরত্ন-অলঙ্কারও তারা ধৃতরাষ্ট্রের হাতে দিল– কথয়াঞ্চক্রিরে রাজ্ঞস্তদ্ধনং বিবিধং দদুঃ। সর্বশেষ সংবাদ জানিয়ে দূতেরা বলল– পাণ্ডু আর দেশে ফিরছেন না। তিনি বানপ্রস্থ অবলম্বন করেছেন অকালে। কথাটা শুনে প্রজ্ঞাচক্ষু ধৃতরাষ্ট্র মনে যথেষ্ট ব্যথা পেলেন। ছোট ভাই পাণ্ডুর জন্য তার শোকের অন্ত রইল না—ধৃতরাষ্ট্র নরশ্রেষ্ঠঃ পাণ্ডুমেন্বশোচত। ভাইয়ের কষ্ট অনুভব করে তার রাজভোগ তিক্ত মনে হল। রাজকীয় শয্যা, ভোজন এবং বিলাস তার কাছে অসহ্য হয়ে উঠল সাময়িকভাবেন শয্যাসন– ভোগেযু রতিং বিন্দতি কহিঁচিৎ।
ওদিকে রাজা পাণ্ডু রাজকীয় মর্যাদা এবং ভোগবিলাস ত্যাগ করে সহধর্মিণী দুই পত্নীকে সঙ্গে নিয়ে নাগশত পর্বতে চলে গেলেন। শাস্ত্রে বলেছে– চলে বেড়াও, থেম না কখনও। চলার মধ্যেই অমৃতের স্বাদ লুক্কায়িত– চরৈবেতি, চর বৈ মধু বিন্দেত। পাণ্ডু বুঝি সেই শাস্ত্রের অনুশাসন মাথায় বহন করে নাগশত পর্বত থেকে চৈত্ররথ বন, চৈত্ররথ থেকে কালকূট পর্বত, কালকূট থেকে হিমালয়ের উত্তরে গন্ধমাদন পর্বতে গিয়ে পৌঁছলেন। বন্ধুর পার্বত্যভূমিতে কত তপস্বী মুনিঋষির সঙ্গে তার দেখা হল। তাদের মুখে নীতিনিয়ম-তপস্যার হাজারো অনুশাসন শুনে এক সময়ে তিনি ইন্দ্রদ্যুম্ন সরোবর আর হংসকূট পর্বত পেরিয়ে শতশৃঙ্গ পর্বতে এসে পৌঁছলেন। শতশৃঙ্গ পাহাড় হিমালয়ের মধ্যে। অর্থাৎ পাণ্ডু যেখানে ছিলেন, তার চেয়ে আরও উত্তরে, অনেক উত্তরে একেবারে হিমালয়ের প্রত্যন্তদেশে চলে এসেছেন প্রায়। পাণ্ডু এই শতশৃঙ্গ পর্বতে এসে কঠোর তপস্যায় প্রবৃত্ত হলেন–শতশৃঙ্গে মহারাজ তাপসঃ সমপদ্যত।
