পাণ্ডুর বিলাপের সোচ্চার অংশ থেকে বোঝা যায়–প্রসিদ্ধ কুরুবংশে অসংযত কামনার রাজত্ব চলছিল মহারাজ শান্তনুর সময় থেকেই। কামনার চরম প্রকাশ ঘটে বিচিত্রবীর্যের জীবন–চর্যায়। দুই স্ত্রীর সঙ্গে নব-নবতর বিলাসে তার দিন কেটে গেছে আদর্শ রাজধর্মের সমস্ত বিপরীত আচরণে। তার কামুকতা এতটাই স্পষ্ট ছিল যে মহর্ষি ব্যাসের ঔরসজাত সন্তান হয়ে পাণ্ড তার পিতৃলক্ষণাক্রান্ত পিতা বিচিত্রবীর্যকে চিহ্নিত করেছেন বড় অদ্ভুতভাবে। তিনি বলেছেন–আমি সাক্ষাৎ নারায়ণের সমগুণ ঋষি ব্যাসের পুত্র হলেও আমি জন্মেছি সেই কামুক বিচিত্রবীর্যের স্ত্রীর গর্ভে তস্য কামাত্মনঃ ক্ষেত্রে রাজ্ঞঃ সংযতবাগৃষিঃ।
পাণ্ডুর ভাব দেখে বোঝা যায় তিনি ব্যাসকে দোষ দিচ্ছেন না। দোষ দিচ্ছেন সেই নামে–মাত্র পিতা বিচিত্রবীর্যকে। যেন তার স্ত্রীর গর্ভে জন্মেই তার যত বিপত্তি হল, নইলে ব্যাসের ছেলে হয়ে তার এমন বিপরীত বুদ্ধি যেন হতেই পারে না–তস্যাদ্য ব্যসনে বুদ্ধি সঞ্জাতেয়ং মমাধমা। পাণ্ড বিলাপ করে বললেন–আমি মৃগয়া করতে গিয়ে মৈথুন-প্রবৃত্ত মৃগ-মিথুনকে বধ করে মৃগয়ার চিরন্তনী রীতি অতিক্রম করেছি। তাই দেবতারাও আমাকে ত্যাগ করেছেন।
মৃগ–মিথুনের হত্যা করেই হোক অথবা মুনির মুখের সেই কঠিন অভিশাপের কথা শুনেই হোক অথবা নিজের স্বাভাবিক প্রজনন-ক্ষমতা-রাহিত্যের কারণেই হোক, পাণ্ডু গভীর অনুতাপ–গ্রস্ত হলেন। তার বৈরাগ্য উপস্থিত হল। দুই সুন্দরী স্ত্রীর সামনে তিনি প্রতিজ্ঞা করলেন– সংসার-বন্ধন থেকে আমি মুক্তি চাই– মোক্ষমেব ব্যবস্যামি। আমার পিতা বেদব্যাসের যে সব সদগুণ আছে আমি সেই সদ্গুণ আশ্রয় করব। সংসারের সমস্ত সংসর্গ ছেড়ে আমি মুনি-বৃত্তি গ্রহণ করব। গায়ে আমার ধুলো লাগুক, আমার বাসস্থান হোক বৃক্ষমূল, বাড়ি বাড়ি ভিক্ষা করে আমি দিন কাটাব চরণ ভৈক্ষ্যং মুনির্মুক্তশ্চরিষ্যামি মহীমিমা। আমার প্রিয় বা অপ্রিয় বলে কিছু থাকবে না। স্তুতি-নিন্দার জ্বর আমাকে স্পর্শ করবে না। শীত-গ্রীষ্ম, লাভ-অলাভ, জয়-পরাজয় সব আমার কাছে সমান হয়ে উঠবে– ন শোচন্ন প্রহৃয্যংশ্চ তুল্যনিন্দাত্মসংস্তুতি।
পাণ্ডু যেভাবে বললেন, তার মধ্যে আন্তরিকতার অভাব আছে, তা আমরা মনে করি না। তবে কিনা স্বাভাবিক বৈরাগ্যের সঙ্গে এই বৈরাগ্যের তফাত আছে। যিনি বিপন্ন হয়ে বৈরাগ্য অবলম্বন করেন, তার বৈরাগের মধ্যে ভাবাবেগ বেশি থাকে। পাণ্ডু আরও অনেক প্রতিজ্ঞা করেছেন এবং সে প্রতিজ্ঞার ভাষা ভগবদ্গীতায় বলা উৎকৃষ্ট স্থিতধী জ্ঞানী পুরুষের লক্ষণ মনে করিয়ে দেয়। পূর্বের সাধন-সংস্কার ছাড়া অথবা ঈশ্বর-পুরুষের অহৈতুকী কৃপা ছাড়া তেমন বৈরাগ্য প্রায় অসম্ভব। কিন্তু পাণ্ডু প্রতিজ্ঞা করেছেন যোগী পুরুষের লক্ষণায় অথচ সে প্রতিজ্ঞা বড়ই সকারণ। সর্বত্র সমদর্শী মুনির প্রতিজ্ঞা উচ্চারণের সঙ্গে সঙ্গে তিনি এটাই বলেন গৃহস্থের ধর্মে থেকে আমার যখন পুত্র-কন্যা কিছুই হল না, মৃ-মুনির অভিশাপে আমার যখন প্রজনন-ক্ষমতাই নষ্ট হয়ে গেছে, তখন কী লাভ আমার গৃহস্থ হয়ে থেকে স্বধর্মাৎ সততাপেতে চরেয়ং বীর্যবর্জিতঃ।
পরিষ্কার বোঝা যায় পাণ্ডুর এই নির্বিগ্নতা তৈরি হয়েছে পুত্রোৎপাদনের অসামর্থ্য থেকেই। আমরা প্রশ্ন করতে পারি– কেন বাপু! গৃহস্থ–ধর্মের ওপর এত রাগ কিসের? পাণ্ডুর সমকালে অন্য পুরুষের দ্বারা পুত্রোৎপাদন তো বিধিসম্মত ছিল। পাণ্ডু নিজেও তো সেইরকমই এক ক্ষেত্রজ পুত্র। আর ক্ষেত্রজ পুত্রের পরিচয় তো পিতার নামেই হয়। পাণ্ডু নিজে ব্যাসের ঔরসজাত পুত্র হলেও তিনি তো বিচিত্রবীর্যের পুত্র বলেই পরিচিত। কাজেই অসুবিধে কী? পাণ্ডুও তার দুই স্ত্রীর গর্ভে অন্য সম্পন্ন পুরুষের দ্বারা পুত্রলাভ করে পিতা বলে পরিচিত হতে পারেন। এতে তাঁর পক্ষে গৃহস্থের জীবন যাপন করাও সম্ভব হবে।
কিন্তু নিজে ক্ষেত্রজ পুত্র বলেই পাণ্ডুর বোধহয় এমনতর পুত্রলাভের প্রতি এক ধিক্কার আছে। সমস্ত বৈরাগ্যের প্রতিজ্ঞা গ্রহণ করার পরেও তিনি বলেছেন– এ হল কুকুরের ব্যবহার। এক কুকুরের সঙ্গে এক কুকুরীর ভাব হল, যৌন-সংসর্গও হল, অথচ সেই কুকুরীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করার জন্য এখন যদি অন্য এক পুরুষের দিকে কাতর চোখে চেয়ে থাকতে হয়, তাহলে সে হল কুকুরের কায়দা–উপৈতি বৃত্তিং কামাত্মা স শুনাং বৰ্ততে পথি। অর্থাৎ পাণ্ডু এইভাবে পুত্র লাভ করতে চান না। তার চাইতে বৈরাগ্য-সাধনে মুক্তিও অনেক ভাল।
কুন্তী এবং মাদ্রী এতক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পাণ্ডুর বিলাপ শুনছিলেন। এমন বিলাপোক্তির মধ্যে তাদের পক্ষে কিছু বলাটাও মুশকিল ছিল। প্রিয় স্বামীর বিলাপের উদ্বেল ধারা রুদ্ধ না করে দিয়ে তারা দাঁড়িয়েই ছিলেন। পাণ্ডু এবার তাদের উদ্দেশ করে বললেন– তোমরা দুজনেই ফিরে যাও হস্তিনাপুরে। সেখানে গিয়ে আমার মা অম্বালিকাকে জানাবে যে, তাঁর ছেলে পাণ্ডু প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন। একথা জানাবে আর্যা সত্যবতীকে, জানাবে বিদুর, ধৃতরাষ্ট্র, সঞ্জয় এবং মহামতি ভীষ্মকে। জানাবে–পাণ্ডু বনে প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন। পৌর-জনপদবাসী এবং রাজপুরোহিতদের কাছেও আমার অনুনয় জানিয়ে বলবে– পাণ্ডু প্রব্রজ্যা গ্রহণ করেছেন– প্রসাদ্য সর্বে বক্তব্যাঃ পাণ্ডঃ প্রব্রজিতো বনম্।
