অভিশাপ দিয়ে কিমিন্দম মুনি মারা গেলেন। পরম দুঃখিত অন্তঃকরণে পাণ্ডু ফিরে এলেন অরণ্য-কুটিরে। দুই স্ত্রীর সামনে তার চরম দুর্ভাগ্য বর্ণনা করে বিলাপ করতে আরম্ভ করলেন পাণ্ডু। ঠিক এই মুহূর্তে আমাদের কিছু নিবেদন আছে। আপনারা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে, কিমিন্দম মুনির উপাখ্যানের মধ্যে কিছু অলৌকিকতা আছে। মুনি মৃগের রূপ ধারণ করে তার মৃগ-পত্নীর সঙ্গে বিহার করছিলেন–একথার লৌকিক বিশ্বাসযোগ্যতা খুব বেশি নেই। আমাদের ধারণা–ঐতিহাসিক কোনও চরিত্র যখন মহাকাব্যের বিরাট পরিকল্পনার বিষয়বস্তু হল, তখন মহাকাব্যের কবিকে কতগুলি উদ্ভাবন করতেই হয়। বিশেষত পাণ্ডুর মতো এক ব্যক্তি, যাঁর পুত্রেরা ভবিষ্যতে মহাভারতের নায়ক হবেন, তাঁর প্রজনন-ক্ষমতা নেই–একথা বলতে মহাকাব্যের কবির বাধে। আর ঠিক সেইজন্যই সমাজ-সংস্কারের সঙ্গে মিলিয়ে এই কিমিন্দম মুনির উপাখ্যান রচনা করতে হয়েছে কবিকে। অভিশাপের ইতিবৃত্তও সেই কারণেই।
তাই বলে এই মৃগয়ার ঘটনাটাকে আমরা মিথ্যা বলতে পারি না। মৈথুনলিপ্ত হরিণ-হরিণীকে হত্যা করার ঘটনা হয়ত একটা ঘটেছিল এবং সে ঘটনা ঘটেছিল পাণ্ডুর মানসিক কোনও বিকারেই। যে পুরুষ বারংবার মৈথুনে লিপ্ত হয়েও সন্তান উৎপাদনে ব্যর্থ হন, তার চরম–আক্রোশ থাকে অন্যের মৈথুন-কর্মের ওপর। এক্ষেত্রে এক অসহায় মৃগ-মিথুন তার আক্রোশের শিকার হয়েছে। পাণ্ডু মনে করেছেন–তার দুটি স্ত্রী থাকা সত্ত্বেও যেখানে তিনি পুত্র উৎপাদন করতে পারছেন না, সেখানে অন্য কারও অধিকার নেই পুত্র লাভ করার। প্রধানত এইরকম এক রাজকীয় আক্রোশেই মৃগ-মিথুনের হত্যা সংঘটিত হয়েছে হয়ত। আর তারপরেই আমরা যেমন সানুতাপে বলি–অমুক পাপ করেছিলাম, তার ফলেই আমার এই দুর্ভাগ্য উপস্থিত হল। পাণ্ডুর ক্ষেত্রেও তাই ঘটেছে। তিনি হয়ত এখন কিমিমের অভিশাপের অজুহাতে বিলাপ করছেন পত্নীদের সামনে। মহাকাব্যের কবিও কিমিন্দম মুনি এবং তার অভিশাপের বৃত্তান্ত নিয়ে এসেছেন অজুহাতের মতো করেই।
আপনাদের মনে আছে নিশ্চয়–সঙ্গমকালে দ্বৈপায়ন ব্যাসের উগ্রমূর্তি সহ্য করতে না পেরে বিচিত্রবীর্যের দ্বিতীয়া পত্নী অম্বালিকার গাত্রবর্ণ পাণ্ডু অর্থাৎ সাদা ফ্যাসফেসে হয়ে গিয়েছিল। ফলে পাণ্ডুর গাত্রবর্ণও হয়েছিল সেইরকম অর্থাৎ পাণ্ডুবর্ণ। কিন্তু আধুনিক মনস্তত্ত্ব এবং শরীরবিজ্ঞানে বিশ্বাস করলে–সঙ্গমকালে ব্যাসের এই উগ্রমূর্তি অম্বালিকার কাছে হয়ত এতটাই শকিং এবং ধর্ষণের মাত্রায় ধরা দিয়েছিল যে, তারই ফলে হয়ত অম্বালিকার গর্ভজাত পুত্রটির ওই শারীরিক বিকার তৈরি হয়। অম্বালিকার দিদি অম্বিকা একটি জন্মান্ধ পুত্রের জন্ম দেন। কিন্তু অম্বালিকা যে পুত্রের জন্ম দেন তার কোনও শারীরিক বিকার আপাতত লক্ষিত না হলেও সে পুত্রটি প্রজনন-ক্ষমতা হারান জন্মলগ্নেই। নইলে একটি পুরুষ মানুষের শরীর সাদা ফ্যাসফেসে হল–এটা কোনও বিকার নয়। ধৃতরাষ্ট্রের জন্মান্ধতার নিরিখে পাণ্ডুর শারীরিক বিকারও ধরতে হবে জন্ম থেকেই এবং সেটা কোনওভাবেই পাণ্ডুবর্ণমাত্র নয়, বর্ণের অন্তরালে প্রজননের অসামর্থ্যই তার জন্ম-বিকার হিসেবে ধরতে হবে।
মৃগমিথুনের মৃত্যু অথবা মহাকাব্যিক সংস্কারে ঋষির অভিশাপের অভিসন্ধি সৃষ্টি করে মহাভারতের কবি এবং স্বয়ং পাণ্ডু দুজনেই এই সুবিধা পেলেন যে, এখন পাণ্ডুর দুই প্রিয়তমা পত্নীর সামনে প্রজননের অসামর্থ্য প্রকট করে দেবার কোনও লজ্জা থাকল না।
.
৭৮.
মুনির অভিশাপেই পাণ্ডু যে প্রজনন-ক্ষমতা হারিয়েছেন–এই কথা বারংবার বলেই তিনি বিলাপ করতে লাগলেন তার দুই স্ত্রীর সামনে। এই বিলাপের মধ্যে হাহাকার যা ছিল, তা নিয়ে আমাদের বক্তব্য নেই এবং তা বোঝারও কোনও অসুবিধে নেই। পাণ্ডু বলেছিলেন– আমার মতো অসংযতচিত্ত এবং কামমুগ্ধ ব্যক্তির দশা এমনই হয়–প্রাপুবন্ত্যকৃতাত্মানঃ কামজালবিমোহিতাঃ। আশ্চর্য কথা। মৈথুনরত মৃগমিথুনকে হত্যা করে তিনি অসংযমের পরিচয় দিয়েছেন নিশ্চয়ই, কিন্তু এখানে তার কামমুগ্ধতা কী ছিল? এ প্রশ্নের জবাব দেওয়া শক্ত। কিন্তু পরোক্ষ বিচার করলে ব্যাপারটা ঠিক বোঝা যাবে।
আসলে তির্যক প্রাণীর মৈথুন-দর্শনে অনেক ক্ষেত্রে মানুষের কামনা উদ্ৰিক্ত হয়। পাণ্ডুরও তাই হয়েছে। কিন্তু শত-সম্ভোগেও পাণ্ডু কামনার ইষ্ট ফল-লাভ করেননি। তার ভ্রষ্ট প্রতিহত কামনা তাই ক্রোধের রূপ ধারণ করেছে। ভাবটা এই-শত সম্ভোগেও আমি যে ফল পাইনি, তুই নির্বোধ পশু হয়ে সেই ফল পাবি? তা হবে না। অতএব অস্ত্রাঘাতে নির্বোধ পশুকে তিনি শাস্তি দিয়েছেন।
এটা যদি ও–দেশ হত তাহলে ফ্রয়েড সাহেবের অনুগামী হয়ে পাণ্ডুর মৃগ-মিথুন-বধের মনস্তত্ত্ব অথবা পাণ্ডুর ক্রোধ ব্যাখ্যা করা মোটেই অসহজ হত না। কিন্তু ভারতীয় দার্শনিকের দৃষ্টিতেও পাণ্ডুর এই অসংযত নির্বিচার মৃগবধ যে পরোক্ষত কামমুগ্ধতারই–এই তত্ত্ব আমরা ফ্রয়েড সাহেবের চেয়েও অনেক কঠিনভাবে জানি।
যাই হোক, পাণ্ডু তার বিলাপের সময় আরও একটি দামী কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন আমার পিতা বিচিত্রবীর্য চিরধার্মিক শান্তনুর পুত্র হয়েও অতিরিক্ত কাম-সেবা করে অকালে যক্ষ্মায় মারা গেলেন–জীবিতান্তমনুপ্রাপ্তঃ কামাত্মৈবেতি নঃ শ্রুতম্। এখানে যে ভাষায়, অথবা অন্তঃকরণের যে দুঃখে পাণ্ডু পিতার কামুকতা বর্ণনা করেছেন, তাতে তার নিজের কামুকতার কথাই প্রকট হয়ে ওঠে। মহারাজ শান্তনুর ধার্মিকতা যাই থাকুক, তিনিও যে খানিকটা কামনার দাস ছিলেন তাতে কোনও সন্দেহ নেই। যেভাবে তিনি গাঙ্গেয় ভীষ্মের মতো পুত্রকে রাজ্যের উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করেছিলেন, তাতে সেই মুহূর্তে তার অভীষ্টতমা সত্যবতীর জন্য তার উদগ্র কামনাই প্রকট হয়ে ওঠে।
