এই অবস্থায় পাণ্ডু তীক্ষ্ণ শরাঘাতে মৃগমিথুনকে ধরাশায়ী করলে মৃগরূপী কিমিন্দম মনুষ্যের ভাষায় বললেন–দেখুন, কামার্ত, ক্রুদ্ধ এবং অতি পাপী লোকও এমন নৃশংস আচরণ করে না, যেমনটি আপনি করেছেন। আপনি যে বংশে জন্মেছেন, সে বংশে বড় বড় ধার্মিক পুরুষেরাই জন্মেছেন–শশদ্ধর্মাত্মনাং মুখ্যে কুলে জাতস্য ভারত[অথচ সেই বংশে জন্মে আপনার মন এমন মৃগমাংসের লোভে অভিভূত হল কেন, তা জাধগম্য হল না। কেনই বা আপনার বুদ্ধি ভদ্রজনের ঈঙ্গিত পথে চালিত হল না, তাও ভাল করে বুঝলাম না–কামলোভাভিভূতস্য কথং তে চলিতা মতিঃ।
পাণ্ড হস্তিনাপুরের রাজা। মুনি ভাল তর্ক-যুক্তি দিলেন, ভাল কথা। কিন্তু একজন রাজা অত শীঘ্র বিচলিত হন না। তারও কিছু তর্কযুক্তি আছে। কিমিন্দমের তার্কিক আক্রমণ প্রতিহত করে পাণ্ডু বললেন–আমরা রাজারা যে বুদ্ধিতে শত্রু নিধন করি, সেই বুদ্ধিতেই মৃগয়া করি। তাছাড়া রাজারা তো একটু-আধটু মৃগয়া করেই থাকেন, তাতে দোষ ধরার কী আছে–রাজ্ঞাঞ্চ মৃগয়াং মোহান্ন ত্বং গর্হিতুমহসি?
পাণ্ডু নিজেকে সমর্থন করার জন্য মুনিবর অগস্ত্যের উদাহরণ দিয়ে বললেন যে, তিনি যজ্ঞ করতে গিয়ে সমস্ত বন্য পশুকে মৃগয়া করেছিলেন এবং যজ্ঞকার্যে তাদের বধও করেছিলেন। পাণ্ডু কিমিন্দমকে বুঝিয়ে বললেন—তাহলেই বুঝতে পারছেন মৃগবধ করাটা কোনও অশাস্ত্রীয় ব্যাপার নয়। তাছাড়া মৃগবধ করার সময় আমরা কোনও কপট আচরণও করি না, কোনও মায়ারও আশ্রয় নিই না। শাস্ত্রকারেরা মৃগবধের এই নিয়ম যেখানে অনুমোদন করেছেন, সেখানে আপনিই বা আমার দোষ ধরছেন কেন–প্রমাণদৃষ্টধর্মের্ণ কথমস্মন্ বিগর্হসে?
যিনি অস্ত্ৰক্ষেপ করছেন, তার দিক থেকে কোনও কপটতা নেই, মায়া নেই– অছদ্মনামায়য়া চ মৃগাণাং বধ ইষ্যতে–এই বক্তব্যের মাধ্যমে পাণ্ডু বুঝিয়ে দিলেন যে, কপটাচরণ বা ছদ্ম-ব্যবহার মুনির দিক থেকেই করা হয়েছে। রাজা যখন ধনুক-বাণ হাতে বন্য মৃগের প্রতি শর সন্ধান করেন, তখন তার কোনও ছদ্ম-ব্যবহার থাকে না বলেই হরিণ তার। জীবন-রক্ষার ব্যবস্থা নেয়। হয় সে পালায়, নয় অন্য কোনওভাবে সে আত্মরক্ষার চেষ্টা করে। কিন্তু মুনি কিমিন্দম নিজে হরিণের রূপ ধারণ করেও কেন, কোন ভরসায় তিনি ধনুর্ধারী রাজার সামনে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে রইলেন, সে কথা পাণ্ডু বুঝতে পারছেন না।
কিমিন্দম চিরকালের রণনীতি স্মরণ করিয়ে রাজাকে বললেন–ফাঁক পেলেই কি শত্রুর প্রতি অস্ত্র নিক্ষেপ করা যায়? শত্রুর হাতে যদি অস্ত্র না থাকে, সে যদি বিলাস–ব্যসনে লিপ্ত থাকে, সে যদি এমনিই যুদ্ধক্ষেত্রে দাঁড়িয়ে থাকে, তবে তাকে তো আর অস্ত্রাঘাতে হত্যা করা যায় না, সেটা আদর্শ রণনীতি নয়।
পাণ্ডু বললেন–একটি হরিণ আগে পালাবার জন্য প্রস্তুত হবে, তারপর তাকে পালানোর সুযোগ দিয়ে আমি তাকে মারব, এই কি আদর্শ রণনীতি? হরিণ নিজে সাবধান হবে কি না–এটা তার ব্যাপার। সে সাবধানই থাকুক অথবা অসাবধানই থাকুক, তাকে দেখামাত্রই রাজারা সুযোগ নেবেন, এটাই তো স্বাভাবিক–প্রমত্তমপ্রমত্তং বা বিবৃতং ঘুন্তি চৌজসা।
কিমিন্দম বললেন–নিশ্চয়ই। তাতে আমার কিছু বলারও নেই। আপনি আমাকে মৃগ ভেবে শরসন্ধান করেছেন, অতএব সেই মৃগের জীবনের জন্য আমি আপনাকে কিছু বলছি না। কিন্তু একটি প্রাণী মৈথুনকর্মে লিপ্ত হয়েছে, তার মৈথুন সমাপ্তির অপেক্ষাটুকু তো করবেন? সমস্ত প্রাণীরই অভীষ্ট এই মৈথুনকালে কোন শিষ্ট জন তাকে হত্যা করে? এমন নৃশংস মানুষ পৃথিবীতে কমই আছে যে সঙ্গমলিপ্ত প্রাণীকে হত্যা করে–কো হি বিদ্বান্ মৃগং হন্যাচ্চরন্তং মৈথুনং বনে। এই আমার অসহায় হরিণীটি যার সঙ্গে সহর্ষে সহবাসে লিপ্ত হয়েছিলাম আমি। আপনি বিখ্যাত পৌরবদের বংশে জন্মে সামান্য মৃগ-মাংসের লোভে এমন নৃশংস কাজ করবেন, আমি ভাবতে পারি না–বংশে জাতস্য কৌরব মানুরূপপমিদং তব।
মুনি কিমিন্দম বোঝাতে চাইলেন–শুধুমাত্র কামনাই নয়, স্ত্রীসহবাসের মধ্যে যেমন রতিসুখের অভিসন্ধি থাকে, তেমনি থাকে পুত্রজন্মের সম্ভাবনা। কিমিন্দম বললেন–এই সহবাসের মধ্যে আমার প্রথম পুরুষার্থের ফল নিহিত ছিল, আপনি তা বিনষ্ট করে দিয়েছেন। আমি একটি পুত্র লাভ করতে পারতাম, আপনি তার সম্ভাবনা সমূলে বিনষ্ট করে দিলেন–পুরুষার্থ ফলং কর্তৃং তত্তয়া বিফলীকৃত। কিমিন্দম মুনি এবার পাণ্ডুকে ভর্ৎসনা করলেন মৈথুনধর্মের সাধারণ সাযুজ্যের যুক্তি দেখিয়ে। তিনি বললেন–স্ত্রীসম্ভোগের সুখ কি আপনি জানেন না মহারাজ? ভালই জানেন। শাস্ত্রযুক্তি, ধর্মাধর্ম, সেও আপনি ভালই জানেন–স্ত্রীতোগানাং বিশেযজ্ঞঃ শাস্ত্রধর্মাক্তৃতত্ত্ববিৎ। সব জেনেশুনে এমন নৃশংস কাজ আপনি করলেন কী করে?
দুটি নবযৌবনবতী স্ত্রীর সঙ্গে রাজা পাণ্ডুর বন্য-বিহার এই অঞ্চলে কারও অজানা ছিল না। মুনিও তা জানতেন। রাজা নিজে যেখানে নির্জন অরণ্যবাসে রতিসুখ ভোগ করার জন্যই হস্তিনাপুর ছেড়ে এসেছেন, সেখানে তিনি এক রতিলিঙ্গু মৃগমিথুনকে অতর্কিতে হত্যা করবেন–এই অপরাধ কিমিন্দম ক্ষমা করবেন না। তিনি অভিশাপ উচ্চারণ করলেন মহারাজ! আপনি নিজে কামমুগ্ধ এবং অসংযত-চিত্ত এবং আপনি আমাদের দুজনকেই মেরেছেন। অতএব আপনিও এই কাজের ফল পাবেন। আপনিও কামমুগ্ধ হয়ে যখন প্রিয়তমা পত্নীর সঙ্গে রমণে প্রবৃত্ত হবেন–প্রিয়য়া সহ সংবাসং প্রাপ্য কামবিমোহিতঃ–তখন আপনিও আমারই মতো মৃত্যুমুখে পতিত হবেন। আমি সুখভোগ করছিলাম–এই অবস্থায় আপনি আমায় যেমন দুঃখভোগ করালেন, তেমনি সুখভোগ করার সময়েই আপনারও চরম দুঃখ এসে পৌঁছবে–তথা ত্বাঞ্চ সুখং প্রাপ্তং দুঃখমভ্যাগমিষ্যতি।
