আজকের দিনে পুত্র-কন্যার বিবাহ দেবার সময় অনেকে ব্যক্তিগত কথায় বলেন আমাদের কোনও জাত-বিচারের ব্যাপার নেই, কাস্টের কোনও প্রেজুডিস্ নেই, সব চলবে। আমি একজন ব্রাহ্মণ সুপাত্রীর জন্য একটি শূদ্র সুপাত্রের ব্যবস্থা করেছিলাম। সঙ্গে সঙ্গে কন্যাকর্তার মত পালটে গিয়েছিল। বলেছিলেন–ঠিক এতটা নয়, এই কায়স্থ-টায়স্থ একজন ভাল পাত্র পেলেই আর কোনও আপত্তি হয় না। আমি তাকে বলেছি এবং এটা অন্যত্রও বলে থাকি যে,–যদি ভালবাসার ঘটনা ঘটে, সেখানে জাতি–বিচারের ভাবনা ভাবার দরকার নেই একটুও। কিন্তু যদি নিজে সম্বন্ধ করে বিয়ে দেন, তাহলে যথাসম্ভব জাত মিলিয়েই দেবেন। কেন না আমাদের সমাজের সংস্কার এবং কুসংস্কার এতটাই বদ্ধমূল যে আপনা থেকেই জাত ভেঙে বিয়ে দিলে পরবর্তীকালে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে এমন অসহ্য সব কথার আদান-প্রদান ঘটে, সামান্য ব্যবহারিক বিচ্যুতিতেই আত্মীয়-স্বজনেরা এমন কঠিন টিপ্পনী কাটেন, যা অনেক সময় ভালবাসাটাই উলটে দেয়। আমরা চাতুর্বর্ণের কোনও মাহাত্মে বিশ্বাস করি না। কিন্তু যা আছে, তা শোধরাতে হলে একটু একটু করেই এগোতে হবে।
মহামতি ভীষ্মও তাই পারশব বিদুরের সঙ্গে একটি পারশবী কন্যার বিবাহ ঠিক করলেন। এই পারশবী কন্যার খোঁজ পাওয়া গেল মহারাজ দেবকের বাড়িতে–অথ পারশবীং কন্যাং দেবকস্য মহীপতেঃ। এই দেবক কৃষ্ণপিতা বসুদেবের শ্বশুর হলেও হতে পারেন। এমনটি হতেই পারে যে,–এই কন্যাটি তার শূদ্রা পত্নীর গর্ভে জন্মগ্রহণ করলেও কন্যাটি তার ঔরসজাতা নয় বলে পৌরাণিকেরা দেবকের মেয়েদের মধ্যে এই মেয়েটির গণনা করেননি। দেবকের শূদ্রা পত্নীর গর্ভে এটি এক অজানা অচেনা ব্রাহ্মণের কন্যা।
সেকালের দিনে এমন হতই। রাজার স্বীকৃত ক্ষত্রিয়া পত্নী ছাড়াও রাজরানীদের দাসীরাও রাজাদের ভোগ্যা হতেন। যেমন শর্মিষ্ঠা হয়েছিলেন যযাতির কিংবা বিচিত্রবীর্যের পত্নী অম্বিকার দাসীও বিচিত্রবীর্যের ভোগ্যা ছিলেন। দেবকের এই দাসী-পত্নীটি হয়ত কোনও এক ব্রাহ্মণ অথবা ঋষির শুশ্রূষাকার্যে লিপ্ত হয়ে একটি কন্যা সন্তান লাভ করেছিলেন। কিন্তু এই শূদ্রা দাসী যেহেতু দেবকের ভোগ্যা ছিলেন, অতএব দাসী কন্যাটি তারই মেয়ে বলে পরিচিত, ঠিক যেমন দ্বৈপায়ন ব্যাসের সন্তান হওয়া সত্ত্বেও বিদুর বিচিত্রবীর্যের পুত্র বলেই পরিচিত।
আরও একটা কথা। এই পারশবী কন্যার পিতা যদি বসুদেবের শ্বশুর হন, তাহলে মথুরার যাদবদের সঙ্গে হস্তিনাপুরের আরও একটা বিবাহ-সম্বন্ধ ঘটল। মহাভারতের জটিল রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে এই বৈবাহিক সম্বন্ধের অন্য তাৎপর্য আছে বলেই আমাদের মনে হয়। যাই হোক, দেবকের এই পারশবী কন্যাটি সুন্দরী এবং যৌবনবতী। ভীষ্ম তাকে তার আবাসস্থল থেকে আনিয়ে–রূপযৌবন-সম্পন্নাম… আনায্য পুরুষ–তাঁর সঙ্গে বিদুরের বিয়ে দিলেন।
এই পারশবীর সঙ্গে কেমন সুখের সংসার রচনা করেছিলেন বিদুর, কোন মধুর আবেশে তার নববিবাহিত বাসরগুলি কাটত–মহাভারতের কবি সেকথা লেখেননি, লেখার প্রয়োজনও বোধ করেননি। এই পারশবী রমণীটি কাব্যে উপেক্ষিতা বলব কি না জানি না, তবে সারা মহাভারতের মধ্যে এই পারশবী রমণীর যৌবন, জীবন এবং মাতৃত্ব নিয়ে কোনও বিস্তার চোখে পড়ে না। কুন্তী এবং গান্ধারীর পুত্রজন্মের মধ্যে যে বৈচিত্র্য আছে, পারশবী বিদুর-পত্নীর পুত্রজন্মেও কোনও বৈচিত্র্য নেই, জীবনেও কোনও বৈচিত্র্য নেই। মহাভারতের কবি তার বিবাহ দিয়ে শুধু একটিবার বলে দিলেন বিদুরের কতগুলি গুণবান পুত্র হয়েছিল–পুত্ৰান্ বিনয়সম্পন্না আত্মনঃ সদৃশান্ গুণৈঃ। কেমন সে পুত্রগুলি, কী তাদের গুণ কিছুই আমরা জানি না। দ্বৈপায়ন ব্যাস নিজে ঋষি। তাই বুঝি তার এই প্রসন্নতালব্ধ পুত্র বিদুরের সাংসারিক বৈচিত্র্য কিছু নেই। এক গৃহস্থের ঘরে বাস করে, তিনি সন্ন্যাসীর মতোই থাকবেন। আর তার পারশবী স্ত্রীটি মহাভারতের বিশাল বিচিত্র চরিত্রের অন্তরালে একেবারেই হারিয়ে যাবেন।
অথচ এই পারশবীর প্রতিতুলনায় কুন্তীকে দেখুন, আর বিদুরের প্রতিতুলনায় দেখুন পাণ্ডুকে। তার স্বল্পস্থায়ী জীবনেও বৈচিত্র্য কত আর ততোধিক বৈচিত্র্য তার স্ত্রী কুন্তীর জীবনে। আমরা দেখেছি–অবসর সময়ে পাণ্ডু দেবতার মতো ঘুরে বেড়ান তার দুই স্ত্রীর সঙ্গে আর তার দিন কাটে মৃগয়া-ব্যসনে। এই রকম মৃগয়া করতে করতেই একদিন এক শ্বাপদসঙ্কুল অরণ্যের মধ্যে একটি বড় হরিণ দেখতে পেলেন। হরিণটি এক হরিণীর সঙ্গে মৈথুনে প্রবৃত্ত হয়েছিল–চরন্ মৈথুনধর্মস্থং দদর্শ মৃগযূথপ। পাণ্ডু একবারও দ্বিধা না করে হরিণ এবং হরিণীটিকে শরের আঘাতে মেরে ফেললেন।
শরাহত হরিণ এবার মনুষ্যের ভাষায় কথা বলে উঠল–মানুষীমীয় গির। আসলে এই হরিণটি ছিল এক ঋষিকুমার–স চ রাজন্ মহাতেজা ঋষিপুত্র-স্তপোধন। তার নাম কিমিন্দম। তিনি তপস্যা করেন, বন্য ফল-মূল আহার করেন, বৈরাগ্য সাধন করেন। কিন্তু তপস্বী হলেও তার রক্তমাংসের শরীর। এক সময় তার হৃদয়ে মৈথুনেচ্ছা জাগ্রত হল। কিন্তু যেখানে তিনি বাস করতেন, তার পাশেই লোকালয় আছে। ক্কচিৎ কখনও বন্য ফল-মূল আহরণের জন্য মানুষ-জন এসে পড়ে মুনির বসতি-স্থলে। স্ত্রীসংসর্গের সময় কোনও মানুষ তাকে দেখে ফেলবে এই লজ্জায় কিমিন্দম মুনি হরিণের রূপ ধারণ করেছিলেন এবং তার আপন স্ত্রীকেও তিনি এক হরিণীতে রূপান্তরিত করেছিলেন। পশুজগতের মৈথুনকর্মে কোনও লজ্জার স্থান নেই, মানুষ তাদের মৈথুনকর্মে লিপ্ত দেখলেও বাধা দেয় না–কিমিন্দম মুনি এই বুদ্ধিতেই আপন হরিণী পত্নীর সঙ্গে সঙ্গমে লিপ্ত হয়েছিলেন–এপমাণো মনুষ্যানাং মৃগ্যাং মৈথুনমাচরম্।
