এই অরণ্য-চারণার মধ্যে যুদ্ধশ্রমের অপনোদনের অজুহাত যতই থাকুক, এর মধ্যে পাণ্ডুর লুকিয়ে বেড়ানোর অজুহাতও ছিল বোধহয়, কিন্তু মহাভারতের কবি তা স্বকণ্ঠে উচ্চারণ করেননি। কেন না পাণ্ডুর প্রজননের অক্ষমতা প্রকট করার জন্য তিনি তখন মহাকাব্যিক রীতিতেই নতুন এক অভিসন্ধি খুঁজে পেয়েছেন। নিজের অসামর্থ্য যাতে প্রকট না হয়ে ওঠে, তার জন্য পাণ্ডু যেই বনে গেছেন, ওমনি মহাকাব্যের কবি এক মুনিকুমারকে হরিণের রূপে উপস্থাপন করেছেন সেই বনেই।
লক্ষণীয়, অরণ্যের ফুল-ফল আর মদির হাওয়ার মধ্যে পাণ্ডু যে খুব রতিসুখে মত্ত ছিলেন, তা মোটেই নয়, কবি তার ক্রান্তদৃষ্টিতে লক্ষ্য করেছেন–পাণ্ডু বনে গিয়েও সব সময়েই প্রায় মৃগয়া করে বেড়াচ্ছিলেন–অরণ্যনিত্যঃ সততং বভূব মৃগয়াপরঃ।
.
৭৭.
হিমালয়ের দক্ষিণদিকে জায়গাটা এমনিতে খুব সুন্দর–স চর দক্ষিণং পার্শ্বং রম্যং হিমবতা গিরেঃ। পর্বতের পাদদেশে স্নিগ্ধ সবুজ বনভূমি! বিশাল বিশাল শাল গাছ আর পিয়াল গাছে পার্বত্য শোভা এমনি এক রমণীয় উদ্দীপন তৈরি করেছে যে, পাণ্ডুর মতো নবযুবক তার দুই সুন্দরী স্ত্রীকে নিয়ে এইখানে ছাড়া অন্য কোথাও থাকার কথা ভাবতেও পারলেন না–উবাস গিরিপৃষ্ঠেযু মহাশালবনেষু চ। বনে গিয়েও পাণ্ডু যে সদাসর্বদা মৃগয়ায় লিপ্ত হলেন, এটা তার অভ্যাস হতে পারে, ব্যসনও হতে পারে। রাজধর্মজ্ঞ পণ্ডিতেরা মৃগয়া ব্যাপারটাকে ভাল চোখে দেখেননি। রাজার ইতিকর্তব্য বাদ দিয়ে মৃগয়ার মতো অনর্থক পশুহিংসার মধ্যে শরীরের মেদচ্ছেদী ব্যায়ামের অজুহাত যতই থাকুক, প্রাচীন পণ্ডিতেরা এটাকে গভীর অন্যায় বলেই মনে করেছেন। বিশেষত মহাভারতের কবি যে শব্দরাশিতে পাণ্ডুকে বিশেষিত করেছেন–সততং বভূব মৃগয়াপরঃ–তাতে খারাপ কথা না বলেও পাণ্ডুকে তিনি এই দোযে চিহ্নিত করেছেন।
আমাদের ব্যক্তিগত ধারণার কথা অবশ্য আলাদা। আমরা বলেছি, পাণ্ডুর প্রজনন-ক্ষমতা ছিল না বলে দুই স্ত্রীর কাছে তিনি তার নিজের অসামর্থ্য চেপে রাখবার জন্যই এতটা মৃগয়াব্যসনী হয়ে উঠেছিলেন। তার দুই স্ত্রী অবশ্য পাণ্ডুর এই অসামর্থ্যের কথা জেনে থাকলেও বাইরে সে ভাব প্রকাশ করতেন না। এমনও হতে পারে–তার যৌবনবতী দুই স্ত্রী এখনও তাদের স্বামীর অক্ষমতা সম্বন্ধে ততটা অবহিত নন। মৃগয়ার কাল ছাড়া অন্যসময়ে পাণ্ডুর সঙ্গে তারা ঘুরে বেড়াতেন শৃঙ্গার-রসের সমস্ত পরিচর্যা বহন করেই। মহাভারতের কবি উপমাটিও দিয়েছেন চমৎকার। বলেছেন–দুই যৌবনবতী স্ত্রীর মাঝখানে পাণ্ডুকে দেখে মনে হত যেন দুটি হস্তিনীর মাঝখানে ইন্দ্রের ঐরাবত করেথোরিব মধ্যস্থঃ শ্রীমান্ পৌরন্দরো গজঃ।
আরণ্যক হস্তী এবং হস্তিনী প্রাচীন কবিদের কাছে গভীর শৃঙ্গারের সরসতায় চিহ্নিত। কুন্তী এবং মাদ্রীকে দুটি হস্তিনীর সঙ্গে তুলনা করে মহাকবি বুঝিয়ে দিলেন–তাদের দিক থেকে সরসতায় কোনও অভাব ছিল না। ঐরাবতের স্বাধিকার লাভ করার জন্য এই দুই যৌবনবতী রমণীর চেষ্টার ত্রুটি ছিল না কোনও। বনচারী মানুষ এই দুই রাজরানীর সঙ্গে অস্ত্রে-শস্ত্রে সদাবৃত পাণ্ডুকে দেখে মনে করত–স্বর্গের দেবতা বুঝি নেমে এসেছে ভয়ে দেবোয়মিতমন্যন্ত চরন্তং বনবাসিনঃ।
ওদিকে পাণ্ডুর বনগমনের পর মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রই তার কনিষ্ঠের রাজ্যভার বহন করে চলেছিলেন। জন্মান্ধ হওয়ার ফলে তিনি রাজ্য পাননি বটে, কিন্তু পাণ্ডুর অনুপস্থিতির কারণে হস্তিনাপুরের অমাত্য-সচিবরা তাঁরই আনুগত্যে রাজ্যশাসন চালাচ্ছিল। কনিষ্ঠ ভাই পাণ্ডু বনবিহার করছেন, তার যাতে কোনও কষ্ট না হয়, সেজন্য জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্রের সদিচ্ছার অন্ত ছিল না। তিনি শক্তিশালী এবং উৎসাহী লোকেদের দিয়ে পাণ্ডুর বিলাসদ্রব্য এবং রাজকীয় খাদ্যবস্তু বনে পাঠিয়ে দিতেন–উপাজহ্বর্নান্তে ধৃতরাষ্ট্রেণ চোদিতাঃ। অবশ্য পাণ্ডুর অনুপস্থিতিতে হস্তিনাপুরের রাজ্যশাসন মনে মনে তিনি আস্বাদন করছিলেন কি না অথবা আস্বাদন করছিলেন বলেই রাজকীয় বিলাসসম্ভার তিনি বনে পাঠিয়ে দিচ্ছিলেন কি না–সে কথা মহাভারতের কবি স্বকণ্ঠে উচ্চারণ করেননি। তবে আমাদের এই সন্দেহ আছে।
পাণ্ডু যখন বনে এবং ধৃতরাষ্ট্র যখন রাজ্য চালাচ্ছেন, তখন একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটে গেল। মহাভারতের বিশাল মহাকাব্যিক গঠনের মধ্যে মহাভারতের বিচিত্র ঘটনার মধ্যে এই সামান্য ঘটনার কোনও মূল্যই নেই। তবু মহাভারতের কবি ঘটনাটাকে উপেক্ষা করেননি। ব্যাপারটা কিছুই নয়, মহামতি বিদুরের বিবাহ হয়ে গেল।
আপনাদের মনে আছে হয়ত যে, বিদুর হলেন জাতিতে পারশব। ব্রাহ্মণের ঔরসে শূদ্রার গর্ভজাত সন্তানের পারিভাষিক নাম পারশব। বিচিত্রবীর্যের শূদ্রা দাসীর গর্ভে ব্যাসের ঔরস সন্তান হলেন বিদুর। ভীষ্ম তার জন্য একটি পারশবী কন্যা ঘরে নিয়ে আসার কথাই ভাবলেন। স্মার্তরা বলেন–সদৃশীং ভার্যাং বিন্দেত–নিজের অনুরূপ ভার্যা সংগ্রহ করো। এই অনুরূপ সেকালের দিনে অবশ্যই খানিকটা জাতিগত; একালের দিনেও তা জাতিগতই বটে, তবে সে জাত পুরোপুরি অর্থনৈতিক। মহাভারতের কালে চাতুর্বর্ণের জাতি-ব্যবস্থায় কড়াকড়ি যেমন ছিল, তেমনি শিথিলতাও কিছু ছিল। এই শিথিলতার জন্যই একজন ব্রাহ্মণের শূদ্রা পত্নীও সামাজিক সম্মান পেতেন। তাদের পুত্রকন্যারাও সমাজে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারতেন।
