আমাদের সন্দেহ–মাত্র তিরিশ দিন নববিবাহিতা দুই অতি-সুন্দরী রমণীর সঙ্গে যথাকামে যথাসুখে বিহার করার পর পাণ্ডু যে দিবিজয়ে বেরিয়েছেন–এই দিগবিজয়ী রাজার প্রতিষ্ঠা-বাসনার অন্তরালে এমনই এক সূক্ষ্ম অক্ষমতার বিষয় কাজ করছিল না তো, যা তিনি আপাতত তাঁর পত্নীদের কাছে প্রচ্ছন্ন রাখতে চেয়েছেন। যাই হোক, পাণ্ডু ভীষ্ম প্রমুখ গুরুজনের অনুমতি নিয়ে ধৃতরাষ্ট্রকে প্রণাম করে দিগবিজয়ে বেরলেন।
পাণ্ডুর দিগবিজয়-যাত্রার কাহিনী এবং বর্ণনা খুব বড় কিছু নয়। লক্ষণীয় বিষয় হল, পাণ্ডু দিগবিজয়ে বেরিয়ে যে সব দেশ জয় করেছিলেন, তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য বড় বড় রাজ্য কিছু নেই। দশার্ণদেশ নাকি পূর্ব থেকে হস্তিনাপুরের বিরাগভাজন হয়েছিল, অতএব দশার্ণদেশকে তিনি বিধ্বস্ত করলেন সবার প্রথমে–পূর্বামাগস্কৃততা গত্বা দশার্ণা সমরে জিতাঃ। এর পরেই দেখছি পাণ্ডুর দিগবিজয়-যাত্রার গতি কিন্তু ভারতবর্ষের পূর্বদিকে। তিনি মগধে গেছেন হস্তিনাপুরের বিজয়কেতন উড়িয়ে। কিন্তু মগধের রাজা জরাসন্ধের সঙ্গে তার কোনও অস্ত্র-বিনিময় হতে দেখছি না। ঐতিহাসিক বিচারে পাণ্ডুর সময়েই জরাসন্ধ শুধুই মগধের রাজা নন, সমস্ত পূর্ব ভারতে তখন তাঁর একচ্ছত্র আধিপত্য শুরু হয়ে গেছে এবং পশ্চিম এবং উত্তর ভারতও মগধরাজ জরাসন্ধেরই অনুশাসন মেনে চলে।
আমরা দেখছি–পাণ্ডু মগধে গেছেন এবং জনৈক মগধরাজ দার্বকে তিনি বাড়ির মধ্যেই মেরে ফেলেন–গোপ্তা মগধরাষ্ট্রস্য দার্বো রাজা গৃহে হতঃ। এটা খুবই বীরত্বের কথা, কিন্তু মগধের রাজা হিসেবে দাৰ্ব খুব প্রতিষ্ঠিত ব্যক্তি নন। জরাসন্ধের আগে মগধরাজ্যের কর্ণধার হিসেবে তার নাম আমরা ইতিহাস-পুরাণে খুব একটা পাই না। হয়ত দার্ব মগধরাষ্ট্রের কোনও সামন্ত নৃপতি হবেন অথবা মগধের কোনও প্রান্তিক রাজ্যের ছোট্ট কোনও রাজা হবেন তিনি। মগধের নৈকট্যে মগধরাষ্ট্রের নায়কের অনুষঙ্গ জুটেছে দার্ব বলে অনামী এক রাজার ওপর। দিগবিজয়ের প্রথাগত বর্ণনায় মহারাজ পাণ্ডু মগধ থেকে প্রচুর ধন-রত্ন, হাতি-ঘোড়া নিয়ে বিদেহ, মিথিলা এবং আরও পূর্বে সুহ্ম, পুণ্ড্রবর্ধন জয় করে এসেছেন।
দেখা যাচ্ছে, এই দিগবিজয়ের ভৌগোলিক পথরেখা মোটামুটি পূর্ব দিকে, অবশ্য কাশী–রাজ্যের কথাও এখানে এসেছে। আমাদের ধারণা, মহারাজ শান্তনুর পরে হস্তিনাপুরে যে ধরনের অরাজকতা চলেছিল, তাতে ভারতের পূর্ব দেশের রাজারাই হস্তিনাপুরের কিছু ক্ষতিসাধন করে থাকবেন। এই দিবিজয়ের শেষের দিকে মহাভারতের কবি উল্লেখ করেছেন–যারাই আগে কুরুরাষ্ট্রের ক্ষতি করেছিল, কুরুরাষ্ট্রের ধন অপহরণ করেছিল, মহারাজ পাণ্ড তাদের সবাইকে হস্তিনাপুরের করদ রাজ্যে পরিণত করলেন–
যে পুরা কুরুরাষ্ট্রাণি জহুঃ কুরুধনানি চ।
তে নাগপুরসিংহেন পাণ্ডুনা করদীকৃতাঃ।
এতে বোঝা যায় শান্তনুর পর থেকে পাণ্ডুর সময় পর্যন্ত কুরুরাষ্ট্রে যে অরাজকতা চলেছে, তাতে অনেক ছোট ছোট রাজারাও কুরুরাষ্ট্রের প্রান্তিক দেশগুলির ওপর ছোটখাট আক্রমণ চালিয়েছিলেন এবং জমিজায়গাও কিছু বেদখল করে নিয়েছিলেন। পাণ্ডু দিগবিজয়ে যাত্রা করে বিশাল এক সাম্রাজ্য তৈরি করতে পারেননি নিশ্চয়ই। কিন্তু হৃতসম্পত্তি পুনরুদ্ধার করে তিনি মহারাজ শান্তনুর সুযোগ্য উত্তরাধিকারীতে পরিণত হয়েছেন মাত্র। মহাভারতের কবিও সেই মর্মে তার সমর্থন জানিয়ে বলেছেন যে,–রাজশ্রেষ্ঠ শান্তনু এবং মহারাজ ভরতের কীর্তিকাহিনী প্রায় লুপ্ত হতে বসেছিল–শান্তনোঃ রাজসিংহস্য ভরতস্য চ ধীমতঃ–মহারাজ পাণ্ডু সেই কীর্তি পুনরুদ্ধার করেছেন–প্রণষ্টঃ কীর্তিজঃ শব্দঃ পাণ্ডুনা পুনরাহৃতঃ।
কতগুলি রাজ্য জয় করে প্রভূত ধন-রত্নের সঞ্চয় সঙ্গে নিয়ে পাণ্ডু হস্তিনাপুরে ফিরলেন। তুরী-ভেরী বেজে উঠল। দেশের রাজা ঘরে ফিরেছেন, পুরবাসী জনপদবাসীরা অনেক দূর এগিয়ে গিয়ে পাণ্ডুকে সাভিবাদনে রাজধানীতে ফিরিয়ে আনলেন। পাণ্ডুর কৃতিত্বে ভীষ্মের বুঝি পিতা শান্তনুর কথা স্মরণ হল। তিনি আনন্দে অশ্রুমোচন করতে করতে জড়িয়ে ধরলেন পাণ্ডুকে–পুত্রমাশ্লিষ্য গাঙ্গেয়ো হর্ষাদণ্যবৰ্ষয়ৎ।
ঠিক এই রকম একটা প্রসন্ন মুহূর্তে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রের কী মানসিক অবসাদ ঘটতে পারে, তা পাণ্ডু জানেন। শুধুমাত্র চক্ষুহীনতার জন্য যিনি রাজা হতে পারেননি, আজ এই বিজয়-মুহূর্তে পাণ্ডু তার বিজয়লব্ধ ধনসম্পত্তি ভাগ-বাঁটোয়ারা করার জন্য প্রথমে ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি চেয়েছেন। এমনকি ভীষ্ম, সত্যবতী এবং দুই মাতা অম্বিকা এবং অম্বালিকাকে পাণ্ডু যা দিতে চান, তা তার একান্ত স্বোপার্জিত হলেও, তা দেবার জন্য পাণ্ড ধৃতরাষ্ট্রের অনুমতি চেয়েছেন ধৃতরাষ্ট্রাভ্যনুজ্ঞাতঃ স্ববাহুবিজিতং ধনম্।
পাণ্ডুর বিজয়লব্ধ ধনসম্পত্তির ভাগ পেলেন সবাই। ভীষ্ম, সত্যবতী এবং দুই মা ছাড়াও পাণ্ডুর কাছ থেকে উপহার লাভ করলেন মহামতি বিদুর। আর ধৃতরাষ্ট্র তো ছোট ভাইয়ের আদরমাখা সম্পত্তি পেয়ে প্রায় অশ্বমেধযজ্ঞের মতো বিশাল বিশাল কতগুলি যজ্ঞকার্যই আরম্ভ করে দিলেন। দান-ধ্যান করলেন প্রচুর–অশ্বমেধশতৈরীজে ধৃতরাষ্ট্রো মহামখৈঃ।
পাণ্ডুর বিজয়-পর্ব এবং এত দানাদানের মধ্যে আমরা এখনও পর্যন্ত একবারও কুন্তী-মাদ্রীর নাম শুনিনি। মহাভারতের কবি যে মুহূর্তে তাদের নাম উচ্চারণ করছেন, তখনি দেখছি তিনি দুই ভার্যার সঙ্গে বনে চলে গেছেন–বভূব বনগোচরঃ। বনে যাবার পিছনে যুদ্ধের পরিশ্রম নিশ্চয়ই আছে, কিন্তু আরও কোনও গভীর কারণও থাকতে পারে। তিরিশ রাত্রি ধরে যে স্ত্রীদের সঙ্গে তার যথাকামে যথাসুখে কেটেছে, সম্পূর্ণ দিগবিজয়ের সময় অতিবাহিত হবার পরেও সেই কাম-সুখের কোনও ফললাভ ঘটেনি। পাণ্ডু এর পরেই স্ত্রীদের নিয়ে বনে চলে গেছেন।
