রাজা রাজার মতো সুরক্ষায় ঘেরা থাকলেন, ওদিকে নাগ-রাজ তক্ষকও তার সময় সুযোগ খুঁজতে লাগলেন। শৃঙ্গী-মুনির চরম ঘোষণার দিনটি, অর্থাৎ ছ দিন পেরিয়ে সপ্তম দিনটি এসে গেল। বিষ-বৈদ্য অথবা সাপের ওঝা –এগুলির মধ্যে সত্যতা যতটুকু আছে, তা রূপকথার রসিকদের আনন্দ দিতে থাকুক, কিন্তু পরীক্ষিতের মৃত্যু যেভাবে ঘটল, তার মধ্যে ইতিহাসের রসটুকুও রীতিমতো ব্যাখ্যাযযাগ্য। নাগরাজ তক্ষক পরীক্ষিতের আত্মগুপ্তির সমস্ত উপায় এবং সম্ভাবনাগুলি পূর্বাহ্নেই জেনে গিয়েছিলেন। আমাদের অনুমান-সপ্তম দিন পর্যন্ত তিনি নিবিষ্ট মনে লক্ষ্য করে দেখেছেন-কারা পরীক্ষিতের কাছাকাছি ঘেঁষতে পারছেন, আর কারা পারছেন না। এই নিবিষ্ট পরীক্ষণ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সিদ্ধান্তে এসেছেন যে, সোজা পথে পরীক্ষিতকে মারা যাবে না, চোরাগোপ্তা বাঁকা পথে পরীক্ষিতকে শেষ করে দেবেন তিনি। মহাভারতের কবি লিখেছেন–তক্ষক লোম্মুখে শুনেছেন যে অনেক লোক বিষহর মন্ত্রে পরীক্ষিতকে রক্ষা করে চলেছেন অর্থাৎ জোরদার পাহারা চলছে সেখানে। অবস্থা বুঝে তক্ষক ঠিক করলেন–ছল করেই ঠকাতে হবে পরীক্ষিতকে, তাকে মারতেও হবে ছল করেই–ময়া বঞ্চয়িতব্যো’সৌ…. মায়াযোগেন পার্থিবঃ।
মনে রাখতে হবে–নাগ জনজাতির মানুষেরা কৌরব-পাণ্ডব বংশের হাতে নানাভাবে পর্যস্ত হয়ে পালাতে বাধ্য হলেও তাদের শত্রুতার মধ্যে অসুর-রাক্ষসদের শক্তিমত্তা ছিল না। তাদের সামরিক ক্ষমতা সীমাবদ্ধ হওয়ায় সম্মুখযুদ্ধে তারা সব সময়েই খুব সহজভাবে আর্যগোষ্ঠীর নায়কদের কাছে পরাজয় স্বীকার করতে বাধ্য হয়েছেন। কিন্তু নিজেদের জায়গা জমি ছেড়ে চলে যাওয়ার অপমান এবং পরাজয়ের গ্লানিটুকু তাদের মনের মধ্যে এতই দৃঢ়–নিবদ্ধ ছিল যে, শত্রুতার সুযোগ পেলেই তার শত্রুতা করতেন। কিন্তু সেই শত্রুতার মাধ্যম ছিল চোরাগোপ্তা আক্রমণ, পণ্ডিতদের ভাষায়– Yet they were very acute in accomplishing the wargild and often stabbed their enemy in the back.
পরীক্ষিতের মৃত্যুর ক্ষেত্রেও এই ব্যাক-স্ট্যাবিং বা ছলনাটাই হয়েছে। মহাভারতে পরীক্ষিতের মৃত্যুকালীন অথবা মৃত্যুর অব্যবহিত পূর্বের সময়টুকু যদি বিচার করে দেখেন, তাহলে লক্ষ্য করে দেখবেন, শেষের দিনে পরীক্ষিত অনেক ভারমুক্ত। তার নিচ্ছিদ্র সুরক্ষা–ব্যবস্থার মধ্যে খানিকটা শিথিলতাও এসেছে বলে মনে হচ্ছে। দিনের পর দিন লক্ষ্য করে নাগরাজ তক্ষক বুঝেছেন যে, একমাত্র তপস্বী মুনি-ঋষিরাই পরীক্ষিতের দরবারে প্রবেশের অনুমতি পাচ্ছেন। কারণটা খুব পরিষ্কার। পরীক্ষিতের আয়ুঃশেষ নিধারিত হয়ে গেছে, অতএব তিনি যতটা পারেন মোক্ষ-সাধন সম্পন্ন পুণ্যশ্লোক ঋষি-মুনিদের সৎসঙ্গে ভগবৎ কথা শ্রবণ করে পুণ্যলাভের চেষ্টা করছেন। পুরাণ থেকে জানা যায় যে, ব্যাস-পুত্র শুকদেব শ্রীমদ্ভাগবতের মতো কৃষ্ণ-কথাশ্রয়ী মহাপুরাণ ওই সাতদিনের মধ্যেই পরীক্ষিতের কাছে কীর্তন করেন। ভাগবতের আপন বর্ণনা অনুযায়ী পরীক্ষিতের ভাগবত-সভায় ব্রহ্মর্ষি-মহর্ষির অভাব ছিল না।
সে যাই হোক, নাগরাজ তক্ষক যখন দেখলেন যে, পরীক্ষিতের সামনে পৌঁছনোর সবচেয়ে সোজা উপায় সাধুর বেশ ধারণ করা, তখন তিনি তার সাঙ্গোপাঙ্গ নাগ- অনুচরদের তপস্বীর ছদ্মবেশে ফুল-ফল, কুশ এবং জল উপহার নিয়ে পরীক্ষিতের কাছে যেতে বললেন। তারা আদেশ পালন করল এবং মহাভারতের লোকাত্তর বর্ণনা অনুযায়ী তক্ষক এই সময় একটি কৃমি কীটের আকার গ্রহণ করে লুকিয়ে রইলেন সুমিষ্ট ফলের অন্তর্দেশে। পরীক্ষিত বিচার করলেন না একটুও। সাধু-সজ্জনের উপহার দেওয়া আপাত নিদোষ সেই ফলটিতে কামড় লাগাতেই একটি সামান্য কীটমাত্র দেখা গেল। কীটের চেহারা মহাকাব্যের বর্ণনার খাতিরে ছোট এবং রোগা–অণুঃ হ্রস্বকঃ। কিন্তু এই বর্ণনায় আরও দুটো শব্দ আছে। ছোট হলেও তার গায়ের রঙ তামাটে আর তার চোখ দুটি ঘন কালো। আর্যগোষ্ঠীর সঙ্গে নাগ-জনজাতির শত্রুতা, সৌহাদ্য এবং বৈবাহিক মিশ্রণ দুই-ই এত বেশি গাঢ় ছিল, যে, এই চেহারায় ইঙ্গিতটুকু নৃতত্ত্বের সরসতায় ব্যাখ্যা করা মোটেই অসম্ভব নয়।
পরীক্ষিত কিন্তু বেশ রিলাক্সড়মুডে’ বসে আছেন। অভিশাপের শেষ সপ্তম দিনের সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে। পরীক্ষিতের মৃত্যুভয় অনেকটাই কেটে গেছে, তার বিষাদ অনেকটাই মন্দীভূত– অস্তমভ্যেতি সবিতা বিষাদশ্চ ন মে ভয়। বেশ লঘু চপল ভঙ্গিতে তিনি ফলের ভিতরে থাকা কীটটাকে হাত দিয়ে ধরলেন এবং সেটিকে গলার ওপর রেখে বলতে লাগলেন- আমি শমীক মুনির কাছে অপরাধ করেছি, সেই অপরাধের স্বালন হোক এবার। এই কীট তক্ষক হয়ে দংশন করুক আমাকে।
এই কথার মধ্যে অপরাধ স্বালনের অনুতাপ যত ছিল, তার চেয়ে লঘুতা ছিল অনেক বেশি। পরীক্ষিত হাসছিলেন, নিজের গলার ওপরে কৃমি-কীট এদিক ওদিক করে ফেলে তিনি হাসছিলেন। মহাভারত মন্তব্য করেছে–রাজার বোধ-বুদ্ধি, কর্তব্য–অকর্তব্যের অনুতাপ তত ক্রিয়া করছিল না। মরণোম্মুখ ব্যক্তির এই বোধ থাকে না, রাজারও এই সময় তা নেই। তাই তিনি হাসছিলেন- কৃমিকং প্ৰাহসক্তৃর্ণং মুমূর্য নষ্টচেতনঃ। মহাভারতে দেখা যাচ্ছে তক্ষক রাজার ওই হাস্যরত অবস্থাতেই স্বমূর্তি ধারণ করে দংশন করে এবং রাজা মারা যান।
