আমায় কিছু দিন–কথাটা শুনতে আমাদের যেমন লাগছে, ভীষ্মেরও তেমনি লাগার কথা। আসলে আমরা সকলেই বর-পণে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছি, কিন্তু কন্যাপণের কথা বেশি শোনা যায় না। বিবাহের সময় বরপক্ষ যৌতুক নিচ্ছে, এটা তত অশ্রুতপূর্ব কথা নয়, কিন্তু কন্যার বাপ-ভাইকে টাকা-পয়সা যৌতুক দিয়ে মেয়ে নিয়ে আসার ঘটনা তত প্রচলিত নয়। কন্যাপণের ঘটনাটা আর্যপুরুষদের মধ্যে খুব একটা প্রশংসনীয় দৃষ্টিতে দেখা হত না। তথাকথিত অবরজ জনজাতির মধ্যে এই প্রথা চালু ছিল এবং এখনও তা কোথাও কোথাও আছে। আধুনিক শিষ্ট সমাজের কোনও কোনও বাড়িতে কন্যাকে সাত পাক ঘোরানোর জন্য বিয়ের পিড়িতে ওঠানোর সময় দেখেছি–কন্যার পিতা সলজ্জে বলেন–একটি রৌপ্যমুদ্রা দিতে হবে, তবেই কন্যাকে নিয়ে যাওয়া যাবে বিবাহ-বাসরে। টাকার অঙ্ক বেশি নয় বলে বরপক্ষ বিনাবাক্যে এই প্রথা মেনে নেন বটে। কিন্তু মনে রাখতে হবে–এই প্রথা কন্যাপণের স্মারক।
আমাদের স্মৃতিশাস্ত্রমতে যে আটরকমের বিবাহ প্রচলিত আছে, তার মধ্যে আর্যবিবাহের মধ্যেও এই রকম একটা রীতি আছে। তাতে বরের কাছ থেকে একটি গোরু এবং একটি বৃষ অথবা দুই জোড়া যাঁড় নিয়ে কন্যার পিতা কন্যা-সম্প্রদান করতেন–একং গোমিথুনং দ্বে বা বরাদাদায় ধর্মতঃ। কিন্তু সেখানে প্রধান বিবেচ্য বিষয় ছিল–যুগ-যজ্ঞের সুবিধের জন্যই কন্যার পিতা গোরু-ষাঁড়গুলি নিচ্ছেন। অন্যদিকে কন্যার পিতা বা ভাইকে টাকা-পয়সা দিয়ে কন্যাগ্রহণ করাটা ছিল রীতিমতো আসুর বিবাহ। আসুর বিবাহের রীতি ব্রাহ্মণ এবং ক্ষত্রিয় এই দুই উচ্চবর্ণের মধ্যেই যথেষ্ট প্রচলিত ছিল–ষড়ানুপূৰ্য্যা বিপ্রস্য ক্ষত্রস্য চতুরোবরা। কিন্তু প্রচলন বা অধিকার যতই থাকুক এই বিবাহের মধ্যে নিন্দাও ছিল যথেষ্ট। শাস্ত্রকারেরা বলেছেন–যতই তোমার অধিকার থাকুক–আসুর বিবাহ এবং পৈশাচ বিবাহের মধ্যে খবরদার যেও না বাপু, বড় খারাপ জিনিস–পৈশাচশ্চাসুরশ্চৈব ন কর্তব্যৌ কদাচন।
মদ্ৰাধিপতির সংকোচও এই কারণেই। তিনি সসঙ্কোচেই ভীষ্মকে বলেছেন–কী করি? আমাদের বংশে এই প্রথা চালু আছে। কুলাচার বলে কথা। আমাকেও তাই মানতে হবে কুলধর্মঃ স নো বীর প্রমাণং পরমঞ্চ যৎ। এমন কথা শুনলে আধুনিককালেও আমরা যা করি, অর্থাৎ আরে মশাই, নিয়ম আছে কী করা যাবে–এই নিন আপনার রৌপ্যমুদ্রা, মেয়েকে নিয়ে আসুন, আর দেরি নয়–ঠিক সেই রকম একটা মেজাজেই সম্পূর্ণ ব্যাপারটা লঘু করে দিয়ে ভীষ্ম বললেন–আরে মশাই। কুলধর্ম যে সবচেয়ে বড় ধর্ম সে কথা যে পিতামহ ব্রহ্মই বলে দিয়েছেন–ধর্ম এষ পরো রাজন্ স্বয়মুক্তঃ স্বয়ম্ভুবা–এতে আপনার কোনও দোষই নেই। আপনার পূর্বপুরুষেরা একটা নিয়ম করে গেছেন, সেটা না মানলে চলে নাকি–নাত্র কশ্চন দোষোস্তি পূর্বৈ–বিধিরয়ং কৃতঃ। আপনাদের এই নিয়ম আমরা জানিও বটে, আর নিয়মটা অপ্রচলিতও কিছু নয়–মর্যাদা সাধুসম্মতা। আপনি কোনও সংকোচ করবেন না।
ভীষ্ম আর বেশি কথা না বলে–সোনা দানা, মহার্ঘ বস্ত্র, অলংকার, মণিমাণিক্য– এসব তো দিলেনই, কারণ এগুলো দিয়েই মেয়ে সাজানো হবে, অন্যদিকে আপন ক্ষত্রোচিত মর্যাদায় হাতি, ঘোড়া, রথও অনেক তুলে দিলেন শল্যের হাতে–শল্যায়াদাৎ সহস্রশঃ। শল্য সব কিছু সানন্দে নিলেন, তারপর সালংকারা মাদ্রীকে তুলে দিলেন তার শ্বশুরকল্প ভীষ্মের হাতে দদৌ তাং সমলংকৃত্য স্বসারং কৌরবর্ষভে। ভীষ্ম মাদ্রীকে নিয়ে সাড়ম্বরে রওনা দিলেন হস্তিনায়। তারপর শুভদিন দেখে যথাবিধানে পাণ্ডুর সঙ্গে বিবাহ করালেন মাদ্রীর।
কুন্তীর জন্যও যেমন ঘর ঠিক ছিল, তেমনি মাদ্রীর জন্যও একটি নতুন ভবন নির্মিত হল। দুই রূপবতী ভার্যার সঙ্গে শৃঙ্গার-সুখে দিন কাটাতে লাগলেন পাণ্ডু–কু্যা মাদ্র্যা চ রাজেন্দ্র যথাকামং যথাসুখম্।
ভারি আশ্চর্যের ব্যাপার হল–নূতন বিবাহের পর পাণ্ডুর এই রতিসুখ মাত্র একমাসের–ততঃ স কৌরবো রাজা বিহৃত্য ত্রিদশা নিশাঃ। তিরিশ নি যাবার পরেই মহারাজ পাণ্ডু দিগবিজয়-যাত্রার ঘোষণা করেছেন। কোনও সন্দেহ নেই যে, হস্তিনাপুরের মতো এক উদীয়মান রাজশক্তির দিগ্বিজয়-যাত্রা রাজনৈতিক কারণেই অত্যন্ত জরুরী। মহারাজ শান্তনুর পর হস্তিনাপুরের রাজসিংহাসনে এমন মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ এখনও আসেননি যিনি সমগ্র ভারতবর্ষের কাছে হস্তিনাপুরের মর্যাদা সঠিকভাবে উপস্থাপন করতে পারেন। পাণ্ডু রাজা হয়েছেন, তাঁর বিবাহাদিও সম্পন্ন হয়েছে। অতএব রাজা হিসেবে এখন তাঁর প্রয়োজন–হস্তিনাপুরের রাজনৈতিক মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করা এবং তার একমাত্র উপায় দিগবিজয় যাত্রা।
ঠিকই আছে। পাণ্ডু দিগবিজয়ে বেরচ্ছেন–সেটা যুক্তির দিক দিয়ে ঠিকই আছে। কিন্তু সেই মহাভারতের কবি–পাণ্ডু বিবাহের পরে মাত্র তিরিশটা রাত্রি রতিবিহারে কাটিয়েছেন–বিহৃত্য ত্রিদশা নিশাঃ–এই কথাটা এমন অঙ্গুলিসংকেত করে তিনি জানালেন, তাতে আমাদের মতো মানুষের মনে কিছু সন্দেহ জাগে। সন্দেহ জাগে–রতিবিহারের কালে এমন কোনও ঘটনা ঘটেনি তো যাতে দুই স্ত্রীর কাছে তার কোনও অসামর্থ্য ধরা পড়ে? মহাভারতের কবি পাণ্ডুকে দিবিজয়ে পাঠিয়ে ফিরিয়েও এনেছেন একসময়ে। কিন্তু তার পরেই পাণ্ডু যুদ্ধ-শ্রমের কারণেই বন্যাত্রা করবেন এবং সেইখানেই কিমিন্দম মুনির অভিশাপ নেমে আসবে পাণ্ডুর ওপর। তিনি প্রজনন-ক্ষমতা হারাবেন।
