মদ্র জায়গাটাকে কখনই যেন এখনকার ম্যাড্রাস বলে ভুল করবেন না। মাদ্রীর জন্মভূমি এই মদ্রদেশকে চিনতে হলে এখন আমাদের পাকিস্তানের মানচিত্র খেয়াল করতে হবে। পাকিস্তানে শিয়ালকোট বলে যে বিখ্যাত স্থানটি আছে, সেই শিয়ালকোটই ছিল তখনকার মদ্রদেশের রাজধানী। শিয়ালকোটের প্রাচীন নাম শকল! বৈয়াকরণ পাণিনি শকল-দেশের কথা উল্লেখ করেছেন সাঙ্কল বলে। কিন্তু খোদ মহাভারতেই শকল-দেশকে মদ্রদেশের কেন্দ্রীয় ভূমি বলে চিহ্নিত করা হয়েছে–ততঃ শাকলমভ্যেত্য মদ্রাণাং পুটভেদন। মদ্রদেশের রাজধানীই যে শকল তার আরও একটা বড় প্রমাণ হল বৌদ্ধগ্রন্থ মিলিদপহ। গ্রীকো-ব্যাকট্রিয় রাজা মিনান্দার ছিলেন এই মদ্রদেশের (মদ্দদেশের) রাজা এবং তার রাজধানীর নাম সাগল। অর্থাৎ সেই শকল।
যা দাঁড়াল, তাতে মদ্রদেশ হল চিনাব এবং রাভি নদীর জল-ধোয়া দোয়াব অঞ্চল এবং সেটাই পাঞ্জাবের মধ্যভূমি। মহামতি ভীষ্ম তার সাঙ্গোপাঙ্গ নিয়ে হস্তিনাপুর থেকে এসে পৌঁছলেন এই মদ্রদেশে, সেখানকার রাজা হলেন শল্য। তিনি মাদ্রীর বড় ভাই। কৌরবশ্রেষ্ঠ ভীষ্মের আগমনবার্তা শুনেই শল্য খানিক দূর এগিয়ে এসে তাকে আমন্ত্রণ অভিনন্দন জানালেন। পাদ্য-অর্ঘ্য, আসন, মধুপর্ক দিয়ে মদ্রদেশে বরণ করে নিলেন তাঁকে। ভীষ্ম জানালেন–আমি এসেছি তোমার বোনটিকে আমাদের ঘরের বধূর সম্মান জানাতে। তার কথা আমি অনেক শুনেছি। তার চরিত্র এবং অসামান্য রূপের কথাও আমার যথেষ্ট কানে। এসেছে–য়তে ভবতঃ সাধ্বী স্বসা মাদ্রী যশস্বিনী। আমি আমার পুত্ৰকল্প পাণ্ডুর জন্য তাকে বরণ করতে চাই।
একটি রাজবাড়ির সঙ্গে আরেকটি রাজবাড়ির পুত্র-কন্যার বিবাহে দুই রাজবংশের মান্যতা এবং সমতা নিয়ে কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। ভীষ্ম যখন পাণ্ডুর বিবাহ-সম্বন্ধ নিয়ে মদ্রদেশে গেছেন, তখন মদ্রদেশের রাজনৈতিক মান্যতা ক্ষীণ হয়ে এসেছে। ইংরেজিতে যাকে ইমপেরিয়াল ইউনিটি বলে তার সূত্রপাত তখনও ভারতবর্ষে ঘটেনি। কিন্তু আর্যরা কাশ্মীর-পাঞ্জাব ছেড়ে হস্তিনাপুর, মথুরা, এমনকি মগধেও তাদের শক্তি কেন্দ্রীভূত করবার সঙ্গে সঙ্গেই অতি-উত্তরের এক প্রান্তিক দেশগুলির সাংস্কৃতিক মর্যাদা কমতে থাকে। মদ্রদেশ একসময়ে বৈদিক সংস্কৃতি এবং আচার-নিষ্ঠার অন্যতম কেন্দ্র ছিল। কিন্তু পরবর্তী সময়ে, বিশেষত মহাভারতের সময়েই মদ্রদেশের এই মর্যাদা নষ্ট হয়ে গেছে।
লক্ষণীয় বিষয় হল, মহাভারতের সময়েই মদ্রদেশের রাজনৈতিক স্থিতি আর্যভূখণ্ডের মতো রাজনির্ভর নয়। মদ্ররা একটি পৃথক জনজাতি, একটি গোষ্ঠী, যাঁদের মহাভারতীয় মতে গণ বলাই ভাল–যৌধেয়ান্ মালবান্ রাজ মদ্ৰকানাং গণা যুধি। মনে রাখতে হবে, হস্তিনাপুরের রাজজ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্রের বিয়ে হল গান্ধারে। এই গান্ধার দেশের সংস্কৃতিও পুরাতন ঐতিহ্যবাহী এবং গান্ধারও আর্যদের প্রাচীন ভদ্রাসন। অন্যদিকে কুন্তী যে বংশের মেয়ে, সেই বংশ রাজনির্ভর নয়, সেটাও একটা বিশেষ জনগোষ্ঠী এবং তারাও গণ-শাসনে চলেন। অর্থাৎ পাণ্ডুর বিয়ে হল দুটি গণ-শাসিত রাজ্যের মেয়েদের সঙ্গে। মদ্র-জনজাতির দ্বারা অধ্যুষিত মদ্রদেশ কিন্তু পাঞ্জাব অঞ্চলের সামান্য অংশমাত্র। গোটা পাঞ্জাব অঞ্চলে অন্তত বেশ কয়েকটি জন-জাতির বাস ছিল–যেগুলির মধ্যে মদ্র জনগোষ্ঠী একটি এবং এদের সকলকে একসঙ্গে বাহ্লীক বলা হত–পঞ্চানাং সিন্ধুসংস্থানাং নদীনাং যেরাশ্রিতাঃ/… বাহীকান্ পরিবর্জয়েৎ। বাহ্লীকদের সম্বন্ধে মহাভারতে অজস্র গালাগালি আছে এবং সে গালাগালি বাহীকদেশের অন্তরাশ্রিত মদ্রদেশের গায়েও লাগে। আমরা সে কথায় পরে সময়মতো আসব। ভায় যখন মদ্রদেশে গেছেন, তখন কিন্তু তিনি তাদের পূর্বতন আর্য ঐতিহ্যের কথা মনে রেখেই গেছেন। অপিচ এই ঐতিহ্যের কথা মনে রেখেই ভীষ্ম বলেছেন–বিবাহ-সম্বন্ধ করার পক্ষে আপনি যেমন আমাদের যোগ্য, তেমনি আমরাও আপনার যোগ্য–যুক্তরূপো হি সম্বন্ধে ত্বং নৌ রাজ বয়ং তব। এই কথা মনে রেখেই আপনি আমাদের অভিলাষ সফল করুন। আপনার ভগিনীকে তুলে দিন মহারাজ পাণ্ডুর হাতে।
মদ্ৰাধিপতি শল্য ভীষ্মের কথা শুনে সাদরে বললেন–আপনার বংশের একটি পাত্রের সঙ্গে আমার ভগিনীর বিবাহ হবে, এর চেয়ে ভাল সম্বন্ধ আর আমি কোথায় পাবন হি মেনন্যা বরঃ ত্বত্তঃ শ্রেয়ানিতি মতির্মম? মদ্ৰাধিপতি শল্য হস্তিনাপুরের রাজবাড়ির সঙ্গে বিবাহ-সম্বন্ধ ঘটানোয় যথেষ্ট আগ্রহী, কিন্তু মদ্র রাজবাড়িতে বিবাহের ক্ষেত্রে এমন একটি কুলাচার প্রচলিত আছে, যাতে তিনি যথেষ্ট সংকোচ বোধ করছেন। এমনকি মদ্ৰাধিপতি সেই কুলাচারের কথা ভাষায় প্রকাশ করতেও সংকোচ বোধ করছেন। মদ্ররাজ বললেন–এমন ভাল বিবাহ-সম্বন্ধ, সত্যিই আমার কিছুই বলবার নেই। কিন্তু আমাদের বংশে বাপ-ঠাকুরদারা একটা নিয়ম চালু করে গিয়েছিলেন,–পূর্বং প্রবর্তিতং কিঞ্চিৎ কুলে স্মিন্ নৃপসত্তমৈঃ–সে নিয়ম ভাল হোক বা মন্দ হোক, আমি তাদের অধস্তন হয়ে সে নিয়ম অতিক্রম করি কী করে? তা ছাড়া সে নিয়মের কথা আপনিও ভালভাবে জানেন। আপনি জ্ঞানী ব্যক্তি, আপনি জানেন না, তা তো হতে পারে না–ব্যক্তং তদ্ভবতশ্চাপি বিদিতং নাত্র সংশয়ঃ। কাজেই এবার আমি যদি বলি–আমায় কিছু দিন–সেটা নিতান্তই অভদ্র শোনায়ন চ যুক্তস্তথা বক্তুং ভবান্ দেহীতি সত্তম।
