হস্তিনাপুরের নতুন রাজা পাণ্ডুর বিবাহও এইভাবেই হল বলে মনে হয়। ভীষ্ম পূর্বাহ্নেই যাদবী কন্যা কুন্তীর খবর পেয়েছেন এবং যথাসময়ে স্বয়ংবর-সভার দিনে পাণ্ডু উপস্থিত হলেন কুন্তিরাষ্ট্রে কুন্তিভোজের সভায়। স্বয়ংবর-সভায় সারি সারি বসে আছেন রাজারা। পাণ্ডুও বসে আছেন তাদের সঙ্গে। মহাভারতের কবি প্রাপুর রাজমাহাত্ম্য ব্যক্ত করার জন্য এই মুহূর্তে পাণ্ডুর ঈষৎ রূপ বর্ণনা করেছেন। সিংহের ঐর্তে তার তেজ, বিশাল বক্ষঃস্থল–ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু হঠাৎ এই উপমাটি কেন? কবি বললেন–সূর্য যেমন আপন প্রভায় সমস্ত গ্রহতারার দ্যুতি তিরোহিত করেন, পাণ্ডুও তেমনই আপন রাজমহিমায় সমস্ত রাজার কান্তি আচ্ছাদন করলেন বেন–আদিত্যমিব সর্বের্যাং রাজাং প্রচ্ছদ্য বৈ প্রভাঃ।
কুন্তীর পূর্বজন্মের স্মৃতির মতো এ কোন এক অবিস্মরণীয় শব্দ ব্যবহার করলেন মহাভারতের কবি-সূর্যের মতো, আদিত্যমিব সর্বের্যা। কুন্তীর প্রথম প্রেম, কৈশোর যৌবনের সন্ধিলগ্না সেই অবিস্মৃত ছায়া। সমস্ত রাজকুলের মধ্যে পাণ্ডুকে যখন দেখতে পেলেন কুন্তী–দদর্শ রঙ্গমধ্যস্থং তেযাং রাজ্ঞাং মনস্বিনী–তখন এই অপূর্বদেহী রাজপুত্রের মধ্যে তাঁর প্রথম প্রেমের ছায়া দেখতে পেলেন নাকি কুন্তী? সূর্যের দেওয়া কানীন পুত্রটিকে নিয়ে যে সমস্যায় তিনি আহত হয়েছিলেন, তারই প্রতিক্রিয়ায় যখন আচার-ব্রতপরায়ণা হয়ে উঠেছিলেন কুন্তী, সেই কুন্তী যে পাণ্ডুকে দেখে এমন আকুল হয়ে উঠলেন, তার একমাত্র কারণ এই সিংহদর্প পুরুষটির মধ্যে তাঁর প্রথম প্রেমের ছায়া দেখতে পেলেন কুন্তী। তাঁর মন চলে গেল সেই কন্যান্তঃপুরের হপ্রকোষ্ঠে, গবাক্ষপথে রক্তিম সূর্যের সন্নিধানে।
পাণ্ডুকে দেখামাত্রই কুন্তীকে দেখছি–তিনি কামনায় আকুল, তার মন চঞ্চল হচ্ছে কুমারীর প্রথম পুরুষ-দর্শনের বিহ্বলতায়–ততঃ কামপরীতাঙ্গী সকৃৎপ্রচলমান। সংস্কৃত শ্লোকে সকৃৎ শব্দটির অর্থ একবার। তারপরে আছে প্রচল-মানসা। এর অর্থ পণ্ডিতেরা করেছেন চঞ্চলচিত্তা। আমাদের তা মনে হয় না। আমাদের ধারণা–একবারের জন্য অন্তত তার মন চলে গেল অন্য কোনওখানে–সকৃৎপ্রচলমানসা। অন্য কোনওখানে? যেখানে বিশাল গবাক্ষপথে রক্তিম সূর্য এসে তার হস্ত ধারণ করেছিলেন, তার শরীর ভিক্ষা করেছিলেন? আর এইসব কথা মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই পাণ্ডুর জন্য তার হৃদয়ে কামনা জেগেছে, লজ্জায় অধোমুখী হয়ে কোনওমতে তিনি স্বয়ংবরের মালা জড়িয়ে দিয়েছেন রাজশ্রেষ্ঠ পাণ্ডুর গলায়–ব্রীড়মানা স্ৰজং কুন্তী রাজ্ঞঃ স্কন্ধে সমাসৃজৎ।
আমাদের আরও ধারণা–পাণ্ডুর কথা আগে সবিস্তারে শুনেছেন কুন্তী এবং আগে থেকে যেন ঠিক করাই ছিল–তিনি পাণ্ডুর গলায় মালা দেবেন। সেইজন্যই তার এত লজ্জাও বটে, হৃদয়ের এত আকুলতাও বটে। আপনারা মানবেন কিনা জানি না–একজন অপরিচিত যুবতী যদি বিবাহবাসরে অপরিচিত পুরুষের সঙ্গে শুভদৃষ্টি করে, তবে সে যত লজ্জা বোধ করে, তার চেয়ে অনেক বেশি লজ্জা বোধ করে সেই যুবতী যে পূর্বাহ্নেই যুবকের পরিচিতা। কোনো আয়োজিত বিবাহ-বাসরে অপরিচিত যুবক-যুবতীরা এটা বুঝবেন না। আমাদের তাই ধারণা–ভীষ্ম যেভাবে যাদবী কন্যার কথা শুনে এই বিবাহে অগ্রসর হয়েছেন, তাতে এই যাদবী কন্যাটিও হস্তিনাপুরের এই নবযুবকের কথা পূর্বাহ্নেই শুনে থাকবেন এবং বিবাহ-বাসরে তাই তার এই আকুল মনের শোভা দেখছি আমরা–পাণ্ডুং নববরং রঙ্গে হৃদয়েনাকুলাভবৎ। পাণ্ডুর গলায় মালা দেবার সঙ্গে সঙ্গে সমবেত রাজারা যেমন সুড়সুড় করে চলে গেলেন, তাতে আমাদের এই ধারণা আরও দৃঢ় হয়–যথাগতং সমাজগুগজৈরশ্বৈ রথৈস্তথা।
.
৭৬.
কুন্তী পাণ্ডুর গলায় বরমাল্য পরিয়ে দেবার পরেই সাড়ম্বরে বিবাহের আয়োজন করলেন মহারাজ কুন্তিভোজ। অনুষ্ঠানের কোনও ত্রুটি রইল না। জামাতা পাণ্ডুকে হীরা-মণি-মাণিক্যের অলঙ্কার যৌতুক দিয়ে সালংকারা বধূকে তিনি পাঠিয়ে দিলেন হস্তিনাপুর–স্বপুরং প্রেষয়ামাস স রাজা কুরুসত্তমম্। হাতি-ঘোড়া-পদাতিকের বিশাল সৈন্যবাহিনীর হাতে যুদ্ধাস্ত্রের বদলে ধ্বজ-পতাকার বাহার দেখা গেল। ব্রাহ্মণ-ঋষিরা পাণ্ডুকে দেখে মঙ্গল-মন্ত্র উচ্চারণ করলেন। পাণ্ডু সাদরে প্রথমা কুলবধূকে নিজভবনে প্রবেশ করালেন–ন্যবেষয়ত তাং ভার্যাং কুন্তীং স্বভবনে প্রভুঃ।
এই স্বয়ংবর বিবাহের রেশ কাটতে না কাটতেই পাণ্ডুর দ্বিতীয় বিবাহের জন্য প্রস্তুতি নিলেন মহামতি ভীষ্ম। মদ্ররাজকন্যা মাদ্রীর সঙ্গে পাণ্ডুর বিবাহ দেবার জন্য তিনি নিজে উপস্থিত হলেন মদ্ররাজ্যে। আপাতত পাণ্ডুর এই দ্বিতীয় বিবাহের কারণ কিছু বোঝা না গেলেও, এর পিছনে ভীষ্মের কিছু তর্কও কাজ করেছে। আমরা আগেই বলেছি–পাণ্ডুর শারীরিক সমস্যা অথবা পুত্রোৎপাদনে তার অসামর্থ্যের কথা ভীষ্ম হয়ত কিছুটা জানতেন। কিন্তু এ বিষয়ে বিস্তারিত কোনও খবর তার পক্ষে জোগাড় করা সম্ভব ছিল না। এই কথঞ্চিৎ জানা থাকা এবং সম্পূর্ণ না-জানার মাঝখানে দাঁড়িয়ে ভীষ্ম পাণ্ডুর দ্বিতীয় বিবাহের পাত্রী ঠিক করতে গেলেন।
এখানে তার ঈপ্সিত সাধ্য দুটি। দুটি বিবাহিতা স্ত্রী থাকলে পুত্র-সন্তান লাভের সম্ভাবনা থাকে দ্বিগুণ। দ্বিতীয়ত স্বয়ংবরলব্ধা স্ত্রী পুরাতনীতে পরিণত হলে তার ব্যক্তিত্বে দ্বিতীয় বিবাহের সম্ভাবনা কথঞ্চিৎ যদি ক্ষীণ হয়ে যায়, তাই পাণ্ডু কুন্তীকে নিয়ে রাজভবনে আসার সঙ্গে সঙ্গেই তার দ্বিতীয় বিবাহের আড়ম্বর শুরু করেছেন স্বয়ং ভীষ্ম–বিবাহস্যাপরস্যার্থে চকার মতিমান মতি। ব্রাহ্মণ-পুরোহিত আর হস্তিনাপুরের কিছু মন্ত্রীকে সঙ্গে নিয়ে ভীষ্ম উপস্থিত হলেন মদ্রদেশে।
