তবে আমাদের ধারণা ভীষ্ম জানতেন। ধৃতরাষ্ট্র-পাণ্ডুর বিবাহের বিষয়ে বিদুরের সঙ্গে যখন আলোচনা হল, তখন যাদবী কন্যা কুন্তী এবং গান্ধাররাজ সুবলের কন্যা গান্ধারীর কথা প্রস্তাব করেই তিনি নিজের মত জানিয়ে বলেছিলেন–আমার মনে হয় এঁদেরই বরণ করে নিয়ে আসা উচিত এবং তা উচিত কুরুবংশের সন্তানলাভের জন্য–সন্তানার্থং কুলস্যাস্য য বা বিদুর মন্যসে। শান্তনুর করুণ দৃষ্টান্তে একটি-দুটি সন্তানের জন্মে আর তুষ্ট হল না ভীষ্ম। তাই তিনি চেয়েছিলেন–শান্তনুর বংশের বৃদ্ধি হোক সাগরের মতো–তস্যৈত বর্ধতে ভূয়ঃ কুলং সাগর যথা।
আপন বংশের সাগরবৎ বৃদ্ধি কামনা করেই ভীষ্ম যখন কুন্তী এবং গান্ধারীকে কুরুবাড়ির পুত্রবধূ হিসেবে বরণ করার কথা ভেবেছেন, তখন এই ধারণাই প্রবল হয়ে ওঠে যে, গান্ধারীর মতো কুন্তীর মন্ত্রলাভের কথাও তিনি জানতেন। আর জানবেনই বা না কেন, দুর্বাসার কাছে কুন্তী পুত্রলাভের সিদ্ধমন্ত্র পেয়েছেন, একথা কি কুন্তিভোজ জানতেন না? তাছাড়া কেউই যদি জেনে থাকেন, তবে দুর্বাসাই সবাইকে জানাবেন। দুর্বাসার চরিত্রই সেইরকম। পুরাণ-ইতিহাসে দুর্বাসার চরিত্র সূক্ষ্মভাবে লক্ষ্য করে চৈতন্য-পার্ষদ রূপ গোস্বামী তার একটি নাটকের মধ্যে তাঁর এক নায়িকার মুখ দিয়ে বলিয়েছেন–দুর্বাসা কি কখনও নিজের-করা উপকার না জানিয়ে থাকতে পারেন–কিং দুর্বাসা নিজোপকার অনাবেদ্য তিষ্ঠতি?
দুর্বাসার এই চারিত্রিক গঠনের নিরিখেই আমাদের মনে হয়–ঘটনাটা ভীষ্মেরও জানা ছিল। যে কারণে কন্যাদের বিবরণ দেবার সময় গান্ধারীর নাম করার আগেই তিনি কুন্তীর নাম করে বিদুরকে বলেছেন–যাদবদের মেয়ে কুন্তীর কথা আমরা শুনেছি, সে আমাদের বংশের উপযুক্ত হবে–শ্রয়তে যাদবী কন্যা স্বানুরূপা কুলস্য নঃ। অর্থাৎ এ কন্যাটি যে তার বংশের সাগরবদ-বৃদ্ধির সহায় হবে, সেটা ভীষ্মের জানা ছিল। হয়ত জানা ছিল আরও একটি কথাও। মহাভারতে পাণ্ডু এক মুনির শাপে প্রজনন ক্ষমতা হারান। কিন্তু এখানে অভিশাপের অলৌকিকতা ছেটে ফেললে দাঁড়ায়–পাণ্ডুর প্রজনন ক্ষমতা ছিল না। ভীষ্ম কি পাণ্ডুর এই অসামর্থ্যের কথাও জানতেন? আমাদের ধারণা জানতেন বলেই তিনি এমন একটি রমণীকে পুত্রবধূ করে ঘরে নিয়ে আসতে চেয়েছেন, পুত্রলাভের ক্ষমতা যাঁর নিজের অধীন–তিনি স্বাধীনোপায়া।
এবারে রাজনৈতিক তাৎপর্যের কথাতেও আসি। বেচারা কুন্তিভোজ! তিনি এত আড়ম্বর করে এত স্নেহে কুন্তীকে মানুষ করলেন, কিন্তু তার দেওয়া নামটি ছাড়া লোকে তাকে যাদবী কন্যা বলেই জানে। ঠিক সেই সময়ে উত্তর-পশ্চিম ভারতে রাজনীতির যে পালা বদল চলছিল, তাতে এই বিবাহের মধ্যে কোনও রাজনৈতিক তাৎপর্য থাকবে না, তা আমরা মনে করি না। মথুরায় তখন কংসের অত্যাচার চলছে। মহারাজ আর্যক শূরের প্রথম পুত্র বসুদেব তখনও কংসের কারাগারে বন্দি না হলেও তার ওপরে রাজরোষ দিনে দিনে বাড়ছিল। হস্তিনাপুরের কুরুরাজ্য তখন উদীয়মান শক্তি। মহামতি ভীষ্মের প্রত্যক্ষ শাসনে পূর্বেই হস্তিনাপুরের উন্নতি ঘটেছে। এখন নতুন রাজা পাণ্ডুর পরিচালনায় হস্তিনাপুরের আরও শ্রীবৃদ্ধি ঘটবে বলে বোঝা যাচ্ছিল।
সবচেয়ে বড় কথা, হস্তিনাপুর মোটামুটি মহারাজ জরাসন্ধের পার্শ্বরাজ্য। জরাসন্ধের অসাধারণ প্রতিপত্তি থাকা সত্ত্বেও এই রাজ্য তিনি আক্রমণ করেননি অথবা আক্রমণ করে দমিত করার সাহস পাননি। অথচ জরাসন্ধের জামাতা কংস তখন মথুরায় তাণ্ডব চালাচ্ছেন। আর্যক শূরের প্রথম পুত্র বসুদেব প্রায় ঘরছাড়া এবং তিনি কংসের বিরোধী গোষ্ঠীর নেতা। কোনও সন্দেহ নেই–হস্তিনাপুরের উদীয়মান রাজশক্তির সঙ্গে প্রথমে গাঁটছড়া বাঁধবার চেষ্টা করেন বসুদেবই। মহারাজ শান্তনুর ভাই বাহ্লীকের পাঁচ মেয়েকে তিনি বিয়ে করলেন এবং হরিবংশ তাদের পরিচয় দিয়েছে পুরুবংশের মেয়ে পৌরবী বলে, যদিও বাহক কিন্তু হস্তিনাপুরে থাকতেন না। পুরু-কুরু-ভরতবংশের সুনাম জড়িত থাকায় পৌরবী কন্যা রোহিণীর নাম যেমন তাৎপর্যপূর্ণ, একইভাবে কুন্তিভোজের ঘরে মানুষ হওয়া সত্ত্বেও ভীষ্মের কাছে কুন্তীর যাদবী কন্যার পরিচয়টিও ভীষণ গুরুত্বপূর্ণ। আমাদের ব্যক্তিগত ধারণা–এই যাদবী কন্যার খবর মথুরার বিরোধী নায়ক বসুদেবের মাধ্যমেও ভীষ্মের কাছে এসে থাকতে পারে।
সে যাই হোক, মহারাজ কুন্তিভোজ কৃতীর বিবাহের জন্য স্বয়ংবর-সভার আয়োজন করলেন। তবে মনে রাখতে হবে–এই স্বয়ম্বরের আয়োজনের মধ্যেও কিছু রাজনীতি থাকে, অনেক রাষ্ট্রের রাজা যখন একটি মেয়ের পেগুণে মোহিত হয়ে সকলেই তাঁকে একযোগে প্রার্থনা করতে থাকেন, তখন রাজনৈতিক কারণেই স্বয়ংবরের আয়োজন করতে হয়। পার্শ্ববর্তী বা ক্ষমতাশালী রাষ্ট্রের রাজাদের কেউই এতে ক্ষুণ্ণ বোধ করবেন না, কারণ মেয়ে নিজে একজনকে স্বামী হিসেবে মনোনীত করেছে। আমরা দেখেছি, কুন্তিভোজের এই সমস্যা হচ্ছিল এবং সেইজন্যেই তিনি স্বয়ম্বরের আয়োজন করেছেন–পিত্রা স্বয়ংবরে দত্তা দুহিতা রাজসত্তম।
কিন্তু এই স্বয়ংবরের নিয়মের মধ্যেই আবার একটি অলিখিত অনিয়মও থাকে। ধরুন, কন্যার পিতা, মাতা, অথবা স্বয়ং কন্যাই কোনও রাজপুত্রকে স্বামিত্বে বরণ করতে চান, অথচ অন্যান্য রাজা বা রাজপুত্র একই কন্যার পাণিপ্রার্থী, সেক্ষেত্রে রাজনৈতিক সমস্যা মেটানোর জন্য স্বয়ংবরের আয়োজন হয় ঠিকই, কিন্তু কাজটি হয়ে যায় অন্য চালে। অর্থাৎ কন্যার পিতা-মাতা অথবা স্বয়ং কন্যার পছন্দসই সেই যুবক স্বয়ংবরের নিয়মে স্বয়ংবরসভায় উপস্থিত হন–সবার সঙ্গে একই পংক্তিতে। কিন্তু সময়মতো কন্যা পরমশোভিতা হয়ে, হাতে ফুলের মালাটি নিয়ে এ রাজা, সে রাজপুত্রকে খানিক দেখে, খানিক ঘুরে নিজের অভীতি পুরুষটির গলায় মালা দিয়ে দেন। এতে অন্য রাজাদেরও কিছু বলবার থাকে না, আবার অভীষ্ট কাজটিও হয়ে যায়।
