অধিরথ তবুও কিছু গা করলেন না। অপত্যহীনা এক রমণী জলের মধ্যে খলবল করে ঘুরে বেড়াচ্ছে, জল টানছে, এটা-সেটা ধরছে–এতে তার সময় কাটছে ভালই–হয়ত এমনটি ভেবেই তিনি বসে ছিলেন। কিন্তু পেটিকাটি হাতের মধ্যে পাওয়ামাত্রই কৌতূহলী রাধা চিৎকার-চেঁচামেচি করে গঙ্গার নিস্তব্ধ তীরভূমি মুখর করে তুললেন। অধিরথ আপন স্তব্ধতা ভেঙে উঠে পড়তে বাধ্য হলেন। তাছাড়া পেটিকার মধ্যে কী আছে, সেটাও তো ভাবনার কথা। যদি বিষদিগ্ধ সর্প থাকে, ধনরত্ন থাকে, যদি সিংহাসনচ্যুত কোনও রাজার গোপন নথি-পত্র থাকে, তবে দুঃশ্চিন্তার কারণ হয়ে উঠবে। অধিরথকে তাই উঠতেই হল।
অধিরথ জল সরিয়ে পেটিকাটি তুলে পেটিকাটি গঙ্গার তীরভূমিতে নিয়ে এলেন। এরপর একটি লৌহশলাকা জোগাড় করে পেটিকার ঢাকনিটি খুলতেই দেখলেন সযত্নে শায়িত রয়েছে একটি জীবন্ত শিশু–যন্ত্রৈরুদঘাটয়ামাস সোপশ্যত্তত্র বালক। অধিরথ অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন শিশুর দিকে। এমন সুন্দর একটি শিশুর ছবি তার কল্পনাতেও ছিল না। উদয়-সূর্যের আভাস শিশুটির গাত্রবর্ণে, বুকে সোনার বর্ম আঁটা, কানে সোনার কুণ্ডল জন্মলগ্ন। অধিরথ এবং তার স্ত্রী বিস্ফারিত চোখে হাঁ করে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকলেন অপূর্ব শিশুটির দিকে–স সূতত ভাৰ্যয়া সার্ধং বিস্ময়োফুল্ললোচনঃ।
অধিরথ এবার আস্তে আস্তে শিশুটিকে কোলে তুলে নিলেন। অনপত্যা দয়িতা পত্নীকে সাদরে বললেন–আমার জন্ম থেকে এমন আশ্চর্য ঘটনা কখনও চোখে দেখিনি–ইদম্ অত্যদ্ভুতং ভীরু যতো জাতোস্মি ভাবিনি। এই দেবশিশু আমাদের কোলে এসেছে, এ শিশু দেবতারা পাঠিয়ে দিয়েছেন আমাদের কাছে। আমাদের কোনও সন্তান নেই, ভগবান তাই নিশ্চয় সদয় হয়ে পুত্র দিয়েছেন আমাদের–অনপত্যস্য পুত্রোয়ং দেবৈদত্তে ধ্রুবং মম।
দৈবপ্রেরিত পুত্র লাভ করে পরম আপ্লুত অধিরথ পুত্রটিকে তুলে দিলেন পুত্রহীনা রাধার কোলে। দিব্যরূপী সেই পুত্রকে রাধা মানুষ করতে লাগলেন আপন পুত্রের মমতায়। সেই অশ্বনদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে যে রমণীর সৌভাগ্যের প্রতি ঈর্ষান্বিত হয়েছিলেন কুন্তী, সেই সৌভাগ্যবতী রমণী হলেন অধিরথ-ভার্যা রাধা। কুন্তীর বেতসী পেটিকা অশ্বনদী দিয়ে ভাসতে ভাসতে চমতী নদীতে এসে পড়েছিল। চমতী সেই পেটিকা বয়ে এনে ফেলেছিল যমুনায়। যমুনা থেকে সেই পেটিকা এসে পড়েছিল গঙ্গায়–চর্মর্থত্যাশ্চ যমুনাং ততো গঙ্গাং জগাম হ। কুন্তীর পুত্রটি এতকাল যে আপন গর্ভে ধারণ করে গঙ্গা তাকে মুক্ত করে দিলেন অনেক দূরে চম্পা নগরীতে, হস্তিনাপুরের এক পূর্ব অধিকৃত স্থানে। এইভাবে, কোনও এক সূত্রে আগেই যেন কুন্তীর যোগাযোগ ঘটে গেল হস্তিনাপুরের সঙ্গে।
সূর্যের ঔরসজাত পুত্রকে জলে ভাসিয়ে দিয়ে কুন্তী তার কন্যাত্ব ফিরে পেলেন বটে, তবে কানীন গর্ভ পরিত্যাগ করার কারণেই হোক, অথবা গোপন মিলনের অপরাধবোধে, কুন্তী খুব ব্রত-ধর্মে মন দিলেন–সত্ত্বরূপগুণেপেতা ধর্মারামা মহাব্রতা। এখন তিনি সম্পূর্ণ যুবতী। তাঁর রূপ এবং গুণের কথা সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে। তবে রূপ–গুণের থেকেও যে বস্তুটি তার সবচেয়ে আকর্ষণীয় ছিল, সেটা এমনই এক মোহ তৈরি করে, যা বলে বোঝানো যায় না। মহাভারতের কবি এই মোহের নামকরণ করেছেন অদ্ভুত একটি শব্দে–অতীব স্ত্রীগুণৈর্যতা– অর্থাৎ অত্যন্ত স্ত্রী-গুণসমন্বিত। তার্কিকরা বলবেন–একটি স্ত্রীর মধ্যে স্ত্রীর গুণ থাকবে না, তো কি পুরুষের গুণ থাকবে? আমরা বলি–শুধু স্ত্রীগুণই হলে শব্দটা অন্তত মহাকাব্যের কবি ব্যবহার করতেন না। তবে সত্যি কথা বলি–এই শব্দের কোনও বাংলা হয় না, বরঞ্চ ইংরেজি ভাল হয়। ইংরেজিতে একে বলে ফেমিনিটি। অর্থাৎ শুধু স্ত্রীত্ব নয়, একটি রমণীর মধ্যে রূপ এবং গুণের সঙ্গে যদি যুগপৎ লজ্জা এবং তেজস্বিতা–দুইই থাকে–তাং তু তেজস্বিনীং কন্যাং রূপযৌবনশালিনীমূ–তবে যে অদ্ভুত মোহ তৈরি হয়, তার নামই ফেমিনিটি, মহাকাব্যের কবির ভাষায়–অতীব-স্ত্রীগুণৈর্যতা।
রাজ–রাজড়ারা যাঁরা কুন্তিরাষ্ট্রে এসেছেন, যাঁরা কুন্তীর সঙ্গে কথা বলেছেন, যাঁরা কেউ কুন্তীকে একবার চোখে দেখেছেন, তারা কেউই কুন্তীকে ভবিষ্যৎ বধূরূপে কল্পনা না করে পারেননি। মহারাজ কুন্তিভোজের কাছে কুন্তীর সর্বাঙ্গীন অধিকার লাভের জন্য তারা প্রার্থনা করেছেন–ব্যাবৃন্ পার্থিবাঃ কেচিদতীব–স্ত্রীগুণৈযুর্তা। রাজাদের এই অনুনয় এবং আগ্রহ দেখে কুন্তিভোজ বুঝলেন–মেয়ের বিয়ে দেবার সময় হয়েছে এবার। সুপাত্রের আধিক্য থাকলে স্বয়ংবর সভার আয়োজনই সবচেয়ে সুবিধেজনক–এই ভেবেই একটি স্বয়ংবর-সভাতে কুন্তীকে স্থাপন করার ইচ্ছে করলেন কুন্তিভোজ। এতে কুন্তী তার নিজের মনোমত পাত্র নির্বাচন করার সুযোগ পাবেন; কুন্তিভোজকে কোনও দোষ দেবার কিছু থাকবে না।
অন্যদিকে জ্যেষ্ঠ ধৃতরাষ্ট্রের বিয়ে হয়ে যাবার পূর্বেই কিন্তু কৌরব-ধুরন্ধর মহামতি ভীষ্ম যদুবংশীয়া কুন্তীর খবর পেয়ে গেছেন। মুনি-ঋষি, ব্রাহ্মণ-সজ্জনের কাছে ভীষ্ম এই কন্যার রূপ-গুণের খবর তত পেয়েছেনই, এমনকি পুত্রলাভের উপায়টি যে তার স্বাধীন, সে কথাও তিনি শুনে থাকবেন। আমরা জানি–শান্তনুর পুত্র চিত্রাঙ্গদ এবং বিচিত্রবীর্যকে নিয়ে তার যা সমস্যা গেছে, তারপর থেকে পুত্রলাভের ব্যাপারে তিনি আর কোনও ঝুঁকি নিতে চান না। গান্ধারী মহাদেবের কাছে শত পুত্ৰ-লাভের বর পেয়েছেন, এটা যেমন ভীষ্মের কাছে একটা প্লাস পয়েন্ট, তেমনি কুন্তীর বর লাভের কথাটাও তার জানা ছিল বলেই মনে হয়। গান্ধারীর বরলাভের কথাটা যে ভীষ্ম জানতেন, সেটা মহাভারতের কবি স্পষ্ট উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু কুন্তীর বরলাভের কথাটাও যে ভীষ্ম জানতেন, সেটা কবি স্বকণ্ঠে বলেননি।
