যাঁরা ভাবেন শকুনি দুরাত্মা এবং দুরাত্মার জন্যই তিনি গান্ধারীর বিবাহের সঙ্গে সঙ্গে হস্তিনায় এসে দৌরাত্ম শুরু করেন, তাদের মনে রাখতে হবে–শকুনি হস্তিনায় এসেছিলেন এবং ফিরেও গিয়েছিলেন স্বদেশে। এর পর কবে এই গান্ধারের রাজপুত্র হস্তিনায় এসে ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভায় আপন দুর্বুদ্ধি চরিতার্থ করতে আরম্ভ করলেন, সে কথা সময়ে আসবে।
০৭৫. চম্পা-নগরী
৭৫.
চম্পা-নগরী। হস্তিনাপুর কিংবা মথুরার মতো এই নগরীর তত সুনাম নেই। ভারতবর্যের যে সব জায়গায় আর্যরা সুপ্রতিষ্ঠিত, সেই রকম কোনও প্রাদেশের মধ্যেও এই নগরীর নাম নেই। যে দেশের মধ্যে এই ছোট্ট নগরীটির অবস্থিতি, আর্য ভূখণ্ডের প্রাজ্ঞ পুরুষেরা সে দেশটিকে রীতিমতো ঘৃণার চোখে দেখেন। দেশটার নাম অঙ্গ। পারহিটার সাহেবের মতে অঙ্গ হল এখনকার মুঙ্গের এবং ভাগলপুর অঞ্চল। উত্তরদিকে এই দেশের সীমানা বড় জোর কোশী নদী পর্যন্ত এবং পূর্ণিয়া জেলার পশ্চিম দিকটাও ছিল অঙ্গ-ভূমির মধ্যে। এই অঙ্গরাজ্যের মধ্যেই একটা ছোট শহর হল চম্পা-নগরী।
জায়গাটা খুব সুন্দর। চম্পা নগরী গড়ে উঠেছে চম্পা নদীকে কেন্দ্র করে। ছোট্ট নদী চম্পা গিয়ে পড়েছে গঙ্গায়। আর গঙ্গার মাহাত্মের জন্যই চম্পা-নগরী আস্তে আস্তে আৰ্যায়িত হচ্ছিল। কানিংহাম সাহেব এখনকার ভাগলপুরের দুটি স্থান চম্পানগর আর চম্পাপুরকে পুরাতন চম্পার বিস্তার–ভূমি বলে মনে করেন এবং তাঁর মতে চম্পা নদীই ছিল অঙ্গ-দেশের সঙ্গে মগধ-দেশের বিভেদ রেখা আমরা যে সময়ের কথা বলছি, ঠিক সেই সময়েই চম্পা নগরীর মালিকানা ছিল হস্তিনাপুরের দখলে, গঙ্গা আর চম্পা নদী যেখানে মিলেছে, ঠিক তার ওপরেই চম্পা-নগরী, যাকে এখনকার লোকেরা বলে চান্দন।
গঙ্গা-চম্পার মিলনের স্থানটি বেশ বড়। লেও এখানে অনেক। আজকে এই মুহূর্তে আমরা প্রৌঢ় বয়সের দুটি পুরু-নারীকে গঙ্গ-চম্পার সঙ্গমস্থলের কাছেই দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি। এঁরা চম্পায় থাকেন, কিন্তু গঙ্গার মাহাত্ম্যর কথা মনে রেখেই বুঝি সঙ্গমে স্নান করতে এসেছেন। এই নারী-পুরুষের মধ্যে পুরুষটি আগে হস্তিনাপুরের রাজবাড়িতে কাজ করতেন। অন্ধ রাজা ধৃতরাষ্ট্রের রথ চালাতেন তিনি তখনকার দিনে যাঁরা ক্ষত্রিয় রাজার সারথি হতেন, তাদের সম্মান ছিল খুব। তারা এমনিতে যুদ্ধবিদ্যায় পারদর্শী হতেন এবং অনেক সময় মন্ত্রিসভাতেও তাদের আসন জুটত।
এই মানুষটি মহারাজ ধৃতরাষ্ট্রের রথ চালনাই শুধু করতেন না, একটি অন্ধ মানুষকে নিরন্তর সাহচর্য দিতে দিতে তিনি ধৃতরাষ্ট্রের পরম বন্ধু হয়ে গিয়েছিলেন–ধৃতরাষ্ট্রস্য বৈ সখা। প্রৌঢ়ত্বের শেষ পর্যায়ে পৌঁছলে ধৃতরাষ্ট্র এই মানুষটিকে ভৃত্যের বন্ধন থেকে মুক্ত করে স্বাধীনভাবে থাকতে দেন চম্পা-নগরীতে। কিছু জমি-জায়গাও দেন অবসর কাটানোর জন্য। এই মানুষটির নাম অধিরথ। তার স্ত্রীর নাম রাধা। তার বয়স অধিরথের চাইতে অনেকটাই কম বলে মনে হয়। কারণ অধিরথের পাশে দাঁড়ালে তাকে দেখতে কমবয়সী লাগে। তাছাড়া তাকে দেখতেও খুব সুন্দর–তস্য ভার্যাভবদ রাজন্ রূপেণাসদৃশী ভুবি।
চম্পানগরীতে সুখাবাস লাভ করেও অধিরথের মনে খুব একটা সুখ নেই। কেন না এই প্রৌঢ় বয়সেও তার কোনও পুত্র সন্তান হয়নি, কন্যা সন্তানও নয়–ন সা পুত্ৰমবিন্দত। অধিরথ আজ তাঁর পরিবারের সঙ্গে গঙ্গা-চম্পার সঙ্গমে এসেছেন, বলা উচিত–গঙ্গায় স্নান করতে এসেছেন–সদাবরী জাহ্নবীং যৌ। হয়ত এই গঙ্গাস্নানও কোনও নবীন পুণ্য-লোভে, যে পুণ্য এই প্রৌঢ় দম্পতির কোলে একটি পুত্র এনে দেবে। অধিরথ–ভার্যা অনেক পূজার্চনা করেছেন, অনেক মন্দিরে অনেক দেবতার কাছে পুত্র চেয়েছেন–অপত্যার্থে পরং যত্নমকবরাচ্চ বিশেষতঃ–কিন্তু এখনও পুত্রের মুখ দেখতে পাননি তিনি। সংসার-কর্মে উদাসীন দম্পতি আজ তাই গঙ্গাস্নানে এসেছিলেন।
অধিরথ গঙ্গার পাড়ে বসেছিলেন, পাশে দয়িতা ভার্যা রাধা। হঠাৎই গঙ্গার স্রোতের মধ্যে লতাজালমণ্ডিত একটি অদ্ভুত বস্তু ভেসে আসছে দেখালেন রাধা–সা দদর্শাথ মজুম্ উহ্যমানাং যদৃচ্ছয়া। স্বামী অধিরথ তত গা করলেন না–কী না কী ভেসে আসছে। উত্তরভারতের অনার্যপুরুষেরা কখনও মৃত-শিশু পেটিকার মধ্যে পুরে জলে ভাসিয়ে দেয়। তার মধ্যে পেটিকাটির ওপরে একটু-আধটু লতা-জাল বিছানো থাকলেও পেটিকার গায়ে অনেক সিঁদুর মাখানো রয়েছে এবং তা দূর থেকেও দেখা যাচ্ছে। অধিরথ জানেন–সিঁদুর জিনিসটা আর্য জনগোষ্ঠীর কাছে তত পরিচিত নয়, সিঁদুরকে তারা খুব মঙ্গলের চিহ্ন বলেও পূর্বে মনে করতেন না। কিন্তু সেই বৈদিক সময় থেকেই আর্য-অনার্যের সাংস্কৃতিক সংমিশ্রণ ঘটে যাবার ফলে অনেক অনার্য আচারও আর্যসংস্কৃতির মধ্যে অনায়াসে ঢুকে গেছে। অধিরথ হয়ত ভাবলেন–নিশ্চয়ই কোনও অনার্যগোষ্ঠীর মানুষ পেটিকার গায়ে সিঁদুর মাখিয়ে কী না কী ভাসিয়ে দিয়েছে গঙ্গায়। তিনি একটুও গা করলেন না, গঙ্গার মন্দ-গতি সমীরণ-মুখর পুলিন ছেড়ে তিনি উঠে দাঁড়ালেন না।
কিন্তু শক্তপোক্ত লতার বাঁধনে বাঁধা সিন্দুরলিপ্ত পেটিকাটি দেখে অধিরথ–ভার্যা রাধার মনে অন্য প্রতিক্রিয়া হল। একে তো কৌতূহল নারীজাতির বিশেষ গুণ, তার মধ্যে পেটিকার গায়ে সিঁদুর-মাখানো দেখে তার মনে হল–কোনও কিছু বিশেষভাবে রক্ষা করার জন্যই এমন শক্ত করে লতার জালে পেটিকাটি বাঁধা রয়েছে। তাছাড়া লোকে যে এমন করে সিঁদুর মাখায়– দত্তরাং প্রতিসরামম্বালম্ভন-শোভিতা–তার কারণ, জলে ভাসিয়ে দিয়েও কোনও মানুষ হয়ত পেটিকাবদ্ধ বস্তুটির সুরক্ষা কামনা করেছে। আর ভারি আশ্চর্য, গঙ্গার গভীর-নীর তরঙ্গ ভঙ্গে পেটিকাটি ভাসতে ভাসতে অধিরথ-ভার্যা রাধার দিকেই আসছে–সমানীতামুপহুরম্। অদম্য কৌতূহলে গঙ্গার কূলে স্বল্প জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে রাধা একটু একটু করে জল টানতে লাগলেন নিজের দিকে। পেটিকাটিও অনুকূল আকর্ষণে আস্তে আস্তে রাধার হাতের মধ্যে এসে পৌঁছল। রাধা সযত্নে পেটিকাটি ধরলেন–সা তাং কৌতূহলাৎ প্রাপ্তাং গ্রাহয়ামাস ভামিনী। এবার ইঙ্গিত করে তিনি অধিরথকে ডাকলেন পেটিকাটি খোলবার জন্য।
