গান্ধারী এক ক্ষত্রিয়ের মেয়ে হিসেবে বুঝেছেন যে, তাঁর পিতা মহামতি ভীষ্মের যাচনায় যেমন মুগ্ধ হয়েছেন, তেমনি মুগ্ধ হয়েছেন কুরুবংশের মর্যাদায়। এই কারণে ভাবী জামাতাকে অন্ধ জেনেও তাঁর পিতা এই মহান বিবাহ-সম্বন্ধ অস্বীকার করতে পারছেন না। গান্ধারী পিতার দুঃখের কথাও জানেন এবং পিতার নিরুপায়তার কথাও জানেন। আর জানেন বলেই তার দুঃখের ওপরে মহান এক আবরণ বিছিয়ে দেন অভিনব এক উপায়ে। ভাবী স্বামীর অন্ধতা জেনে তিনি নিজের আয়ত দুটি চোখের ওপর বেঁধে নিলেন একটি পট্টবস্ত্র–ততঃ সা পট্টমাদায় কৃত্বা বহুগুণং শুভা। গান্ধারী বোঝাতে চাইলেন–যাঁর স্বামী জন্মান্ধ, তার অর্ধাঙ্গিনী স্ত্রী হিসেবে তার চক্ষু চেয়ে থাকা মানায় না। বস্তুত এই আচরণে এক দিকে তিনি যেমন পিতার দুঃখ ঢেকে দিলেন, তেমনি একটি অসহায় জন্মান্ধ পুরুষকে নিজের জীবনে স্বাগত জানালেন অসীম মায়ায়।
গান্ধারী মনে মনে কল্পনা করেছিলেন–কোনও দোষই তার স্বামীর নেই। তিনি শুধু দেখতে পান না। যে চোখ দিয়ে এই সুন্দর পৃথিবীকে দেখবার কথা ছিল তাঁর, যে চোখ দিয়ে এক যৌবনবতী রমণীর উদ্ভিন্ন যৌবন উপলব্ধি করবার কথা ছিল, সে চোখ তার নেই। গান্ধারী জানেন–দৃষ্টি যার থাকে না, সে জগতের রূপ-রস আস্বাদন করে আপন অনুভবে। অনুভবশক্তি এবং সংবেদনশীলতাই তাঁর ইন্দ্রিয়ের অক্ষমতাকে নিরস্ত করে। গান্ধারী বুঝেছিলেন–তিনি নিজে যদি চক্ষু থাকা সত্ত্বেও চক্ষু দুটি পট্টাবৃত করে রাখেন, তবেই তার প্রতিষ্ঠা ঘটবে ভাবী স্বামীর সম-অনুভবের ভূমিতে। স্বামীকে তিনি বুঝতে পারবেন, অনুভব করতে পারবেন সহমর্মিতায়।
স্বামীর জন্য এই সহমর্মিতাই গান্ধারীর ধর্মশীলতা। একজন অন্ধ স্বামীর স্ত্রী যদি চক্ষুষ্মতী হন, তবে বাস্তবে যে সুবিধা হয়, সে সুবিধা গান্ধারী চান না। তিনি চান না–স্বামী যা দেখতে পান না, তা দেখতে অথবা স্বামী যে রূপ-রসে বঞ্চিত, তার অংশভাগিনী হতে। নিজের চক্ষুদুটি পট্টবস্ত্রে বেঁধে গান্ধারী বললেন–আমি স্বামীকে কোনওভাবে অতিক্রম করব না–নাতিশিষ্যে পতিমহম্ ইত্যেবং কৃতনিশ্চয়। আমরা জানি–এই অনতিক্রমের মধ্যে তৎকালীন সমাজের সাধারণ পাতিব্রত্যের চেয়েও আরও গভীর এক মর্ম আছে, যে মর্ম বোঝা যায় শুধু অনুভবে, উপলব্ধিতে। ধৃতরাষ্ট্র বিবাহ করতে এসে নিজের চোখে যেমন তার একান্ত পরিণীতা স্ত্রীকে চোখে দেখতে পেলেন না, তেমনি গান্ধারীও তাকে দেখতে পেলেন না। অথবা বলা উচিত–দেখলেন না এক স্বেচ্ছাপ্রযুক্ত অন্ধতায়। দুই যুবক-যুবতীর প্রথম শুভদৃষ্টি হল মর্মে মর্মে, হৃদয়ে হৃদয়ে–যদস্তু হৃদয়ং তব তদস্তু হৃদয়ং মম।
ধৃতরাষ্ট্র গান্ধারীকে বিবাহ করার জন্য গান্ধার রাজ্যে যাননি। প্রথাগত বিবাহ যাকে বলে, সেটাও বোধহয় সেখানে হয়নি। হস্তিনাপুরের দূত গান্ধারীকে হস্তিনাপুরীতে নিয়ে যাবার জন্যই গান্ধার রাজ্যে এসেছিলেন। নির্দিষ্ট দিনে গান্ধারী রওনা দিলেন হস্তিনাপুরের উদ্দেশে।
গান্ধার রাজ্যটা এখনকার ভারতবর্ষের উত্তরেরও উত্তরে একটি ছোট রাজ্য। এখানকার পথঘাট উচ্চাবচ, বন্ধুর সমস্ত জায়গাটাই প্রায় পার্বত্যভূমি। এইরকম একটা রাজ্য থেকে পার্বত্য পথ বেয়ে এক যৌবনবতী রমণীকে নিয়ে যাবার ঝুঁকি ছিল অনেক। তাছাড়া মূল বিবাহ পর্বের অনুষ্ঠান হবে হস্তিনাপুরে। গান্ধাররাজ সুবল কুরুবংশীয় জামাতার অনুরূপ যৌতুকও তো দেবেন। সেগুলিও বয়ে নিয়ে যেতে হবে হস্তিনায়। গান্ধাররাজ সুবল কিছু বৃদ্ধ হয়েছেন। তিনি এই পার্বত্য পথে যৌবনবতী কন্যাকে সঙ্গে নিয়ে রওনা দিতে কিছু দ্বিধা করে থাকবেন হয়ত। তাছাড়া আরও একটা ব্যাপার আছে। গান্ধার দেশটা যতই ছোট হোক, তিনি তার রাজা। এইরকম একজন রাজা হস্তিনাপুরীর বিশাল রাজ্য খণ্ডে উপস্থিত হয়ে উপযুক্ত মর্যাদা এবং উপযুক্ত সৎকার লাভ করবেন কিনা, সে বিষয়েও হয়ত সন্দেহ ছিল। মহারাজ সুবল তাই তার পুত্র শকুনিকে মেয়েকে নিয়ে হস্তিনার পথে রওনা হতে বললেন।
শকুনি গান্ধার রাজ্যের সবচেয়ে বলিষ্ঠ সৈন্য-সামন্তদের নিয়ে, কতগুলি ঘোড়া ও রথে হস্তিনাপুরের মর্যাদানুরূপ বসন-ভূষণ-যৌতুক সাজিয়ে রওনা হলেন কুরুদেশের দিকে। সঙ্গে গান্ধারী, বিবাহের মহার্ঘ্য বসন–ভূষণে সজ্জিতা, পুরু করে চোখ বাঁধা। গান্ধারী হস্তিনায় পৌঁছতেই বিবাহের উদ্যোগ আরম্ভ হল। নির্দিষ্ট দিনে শকুনি ধৃতরাষ্ট্রের হাতে তুলে দিলেন ভগিনী গান্ধারীকে–তাং ততো ধৃতরাষ্ট্রায় দদৗ পরমসকৃতাম্। চক্ষুষ্মতী গান্ধারী স্বামীর অনুগামিতায় স্বেচ্ছান্ধত্ব স্বীকার করায় মনে মনে বড়ই খুশি হয়েছিলেন সকলে। কুরুবংশের জ্যেষ্ঠা রাজবধূকে তারা পরম সমাদরে ঘরে তুলেছিলেন। সমস্ত বিবাহ অনুষ্ঠানটি তদারকি করলেন ভীষ্ম। যেখানে যা প্রয়োজন, বরপক্ষ-কন্যাপক্ষের যে সমস্ত জায়গায় দ্বিমত উপস্থিত হয় সেই সমস্ত জায়গায় শকুনি ভীষ্মের সঙ্গে একমত হয়ে বিবাহ কার্য সম্পন্ন করলেন– ভীষ্মস্যামুমতে চৈব বিবাহং সমকারয়ৎ। গান্ধার রাজ্যের সমস্ত যৌতুক তুলে দেওয়া হল ধৃতরাষ্ট্রের হাতে।
বিবাহকার্য সমাধা হয়ে যাবার পর মহামতি ভীষ্ম গান্ধারের রাজপুত্রকে কুটুম্বের মর্যাদায় আদর–যত্ন করলেন। যে কারণে, যে দ্বিধায় মহারাজ সুবল হস্তিনাপুরে আসেননি, গান্ধারের রাজপুত্র শকুনিকে পরমাত্মীয়ের সম্মান দিয়ে ভীষ্ম বুঝিয়ে দিলেন–বিবাহের ক্ষেত্রে যে সম্বন্ধ ঘটে, তা ছোট রাজ্য বা বড় রাজ্যের তুলনা–প্রতি তুলনার বস্তু নয়, সে সম্বন্ধ আত্মীয়তার, সে সম্বন্ধ কুটুম্বিতার। শকুনি পরম সম্মানিত বোধ করে ফিরে গেলেন গান্ধারে–পুনরায়াৎ স্বনগরং ভীষ্মেণ প্রতিপূজিতঃ।
