ঠিক এই রকমটি না হলে–বসুদে সাত বছর বারে কংসের কারাগারে আবদ্ধ আছেন আর ওদিকে রোহিণীর গর্ভে তার পুত্র মোচ্ছে–এই কাহিনীর মধ্যে অলৌকিকতার আমদানী করতেই হবে। কিন্তু দেবকীর প্রথম পুত্রটির নামই যদি গর্ভ বলে বিশ্বাস করে। হরিবংশের প্রমাণে যা বিশ্বাস করাই উচিত, তাহলেই দেবকীর তথাকথিত সপ্তম গর্ভের সমান হয়ে যায়। সঙ্কর্ষণ বলরামকে তাহলে আর রোহিণীর উদরে প্রতিস্থাপন করতে হয় না। তার জন্ম স্বাভাবিকভাবেই ব্যাখ্যা করা যায়।
সময়ের দিক থেকে যদি হিসেব করা যায়, তবে বলতে হবে, সঙ্কৰ্ষণ বলরাম ছিলেন কৃষ্ণের ঠিক এক বছরের বড় আর কৃষ্ণকে আমরা অর্জুনের সমবয়সী বলে জানি। ঠিক এইভাবে বিচার করলে দেখা যাবে–এই একটু আগে যে শিশু পুত্রটিকে আমরা এক বেতসী পেটির মাধ্যে শায়িত অবস্থায় দেখলাম, অশ্বনদীর শান্ত তরঙ্গ–ভঙ্গর মধ্যে যাকে একটু একটু করে চর্মর্ধতী নদীর দিকে ভেসে যেতে দেখলাম–এই শিশু-পুত্রটি মাথুর বসুদেবের প্রথম ভাগিনেয়। তার নিজের পুত্র বলরাম এবং কৃষ্ণের থেকে ইনি অন্তত চার-পাঁচ বছরের বড়।
কংসের অত্যাচার তখন এমন অবস্থায় পৌঁছেছে যে, যাদবরা তখন একেকজন একেক জায়গায় লুকিয়ে বেড়াচ্ছেন। ভাগবত পুরাণের প্রমাণ দিয়ে আমরা আগেই জানিয়েছি যাদবরা তখন কুরু, পাঞ্চাল, কেকয়, শা, বিদর্ভ, নিষধ, বিদেহ কোশল–এইসব অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছেন–তে পীড়িত নির্বিবিশু কুরু-পাঞ্চাল-কেকয়া। কংসের কিছু জ্ঞাতিগোষ্ঠী, তবুও মথুরাতেই কেউ কেউ বাস করছিলেন। তাদের মধ্যে অর তো একজন বটেই, বসুদেবও একজন। বসুদেব ক্রমাগত কংসের প্রতিপক্ষতা করে সাময়িকভাবে বেশ বিপন্ন বোধ করতে থাকেন এবং হয়ত এই সময়েই তিনি রোহিণীকে রেখে আসেন বন্ধুর বাড়িতে বৃন্দাবনে। এরই মধ্যে কংসের সঙ্গে বসুদেবের সম্পর্কের কিছু উন্নতির সম্ভাবনা ঘটে, কারণ কংসের কাকা দেবক কোনও অজ্ঞাত কারণে–অথবা বলা যায় কংসের প্রতি প্রতিপক্ষতা করেই তার সাতটি মেয়ের সঙ্গে বসুদেবের বিয়ে ঠিক করে বসেন। কংস তার ছোট বোন দেবকীকে খুবই ভালবাসতেন। কিন্তু বিবাহের আসরেই এক দৈববাণী অথবা জনবাণীর ফলে বসুদেব রাজরোষে পড়ে যান। তিনি কারাগারে আবদ্ধ হন।
বসুদেব কারাগারে বন্দী হবার বেশ কিছু আগেই কিন্তু কুন্তীর কানীন পুত্র লাভের ঘটনাটি ঘটে যায়। বসুদেবের সঙ্গে তখনও দেবকীর বিয়ে হয়নি। ওদিকে, কুরুরাজ্যে বিচিত্রবীর্যের জ্যেষ্ঠ পুত্র ধৃতরাষ্ট্র তখন সবে বিবাহ করতে চলেছেন গান্ধার রাজ্যে। গান্ধাররাজ সুবলের মনে সামান্য একটু দুঃখ ছিল। জামাইটি জন্মান্ধ, বয়োজ্যষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও রাজ্য পাননি, সেই রকম একটি পুরুষের হাতে মেয়ে তুলে দিতে হবে। সুর্বলের একটু খারাপই লাগছিল। শেষে কুবংশের মর্যাদা এবং পাণ্ডুর রাজা হওয়া সত্ত্বেও কুরুরাজ্যে ধৃতরাষ্ট্রের সম্মান মাথায় রেখে গান্ধার সুবল শেষ পর্যন্ত রাজি হয়ে গেলেন।
খবরটা গান্ধারীর কানে যথাসময়ে আগেই চলে গেল। তিনি পরস্পর জানতে পারলেন–যাঁর সঙ্গে তার সারা জীবনের বন্ধন ঘটবে, তিনি চক্ষুহীন, জন্মান্ধ-গান্ধারী ত্বথ শুশ্রাব ধৃতরাষ্ট্রম অক্ষয়! গান্ধারীর সহচরী-পরিচারিকারা বলাবলি, কানাকানি করতে লাগল–ছেলে কানা, জন্ম থেকেই চক্ষুহীন। গান্ধারী সব শুনছেন। তিনি এও শুনেছেন–ভাবী জামাইকে জন্মান্ধ জোনেও তাঁর পিতা-মাতা দুজনেই রাজি হয়েছেন এই বিবাহে–আত্মানং দিৎসিতঞ্চাস্মৈ পিত্রা মাত্রা চ ভারত।
গান্ধারী এই মুহূর্তে কী করতে পারতেন। আমরা যে সময় এবং সমাজের কথা বলছি, সেখানে স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা যথেষ্টই ছিল। অর্থাৎ গান্ধারী ইচ্ছা করলে পিতার প্রস্তাব নস্যাৎ করে বলতে পারতেন–না, আমি এক জন্মান্ধ পুরুষের সঙ্গে নিজের জীবন এবং ভবিষ্যৎ জড়াব না। কিন্তু গান্ধারী তা বলেননি এবং এই না বলার মুহূর্ত থেকেই আমাদের গান্ধারীর চরিত্র খেয়াল রাখতে হবে। প্রথমেই জানাই–এটা মনে করার কোনও কারণ নেই যে গান্ধারীর কোনও ব্যক্তিত্ব ছিল না। তার ব্যক্তিত্বের প্রমাণ আমরা সারা মহাভারত জুড়ে পাব। কিন্তু তারও আগে মহাভারতের কবির প্রতিজ্ঞাটি আমাদের জানাতে হবে। মহাভারতের আরম্ভেই ব্যাস বলেছিলেন–আমি কুরুবংশের বিস্তারিত বর্ণনার সঙ্গে সঙ্গে গান্ধারীর ধর্মশীলতার কথাও বলব–বিস্তরং কুরুবংশস্য গান্ধাৰ্য্যা ধর্মশালতাম্।
মহাভারতের কবি আরও কিছু প্রতিজ্ঞা করেছিলেন। বলেছিলেন–আমি বিদুরের প্রজ্ঞার কথা বলব, কুন্তীর ধৈর্যের কথা বলব। বলব বাসুদেব কৃষ্ণের মহনীয়তার কথা, পাণ্ডবদের সত্যে প্রতিষ্ঠিত থাবার কথাও বলব–বাসুদেব মাহাত্মং পাণ্ডবানাঞ্চ সত্যতা। যে তালিকার মধ্যে কৃঃ বাসুদেবের মতো ব্যক্তিত্ব রয়েছেন, তার কথা আগে না বলে প্রথমে গান্ধারীর ধর্মশীলতা সম্বন্ধে প্রতিজ্ঞার একটা আলাদা তাৎপর্য আছে।
আসলে এই ধর্মশীলতার মর্মও কিন্তু কখনই ফুল-নৈবেদ্য-বেলপাতা নয়। ধর্ম এখানে ন্যায়-নীতির বিশদ মাত্রায় ব্যবহৃত! গান্ধারী স্ত্রীলোক। সে যুগে স্ত্রীলোকেরও একটা বিশেষ ধর্ম ছিল, তবে এই ধর্ম যে পতির অনুগামিতায় সব কিছু মেনে নেবার ধর্ম নয়, তার প্রমাণ পাব মহাভারতের বিভিন্ন পর্যায়ে, কিন্তু এই মুহূর্তে একটি জন্মান্ধ পুরুষকেও যে স্বামী হিসেবে মেনে নিচ্ছেন, তার কারণ একটাই। কন্যাদায়গ্রস্ত এক পিতা-মাতার সন্তান হিসেবে তিনি বোঝেন যে, তাঁর জন্য পিতা-মাতার চিন্তা কিছু কম নেই। তিনি জানেন যে, পিতা-মাতা যথাসাধ্য ভাল পাত্রের হাতেই তাকে ন্যস্ত করতে চান। কিন্তু নিতান্ত নিরুপায় হয়েই তারা এই অন্ধ পুরুষটিকে জামাতা হিসেবে মেনে নিচ্ছেন। এই নিরুপায়তার কারণ এই নয় যে, সেকালে সুপাত্রের অভাব ছিল, অথবা সেকালে স্ত্রীলোকের স্বাধীনতা ছিল না। এই নিরুপায়তার একমাত্র কারণ পুরু-ভরত-বংশের মর্যাদা, যা গান্ধারের মতো একটি ছোট রাজ্যের রাজাকে মোহিত করার পক্ষে যথেষ্ট ছিল–কুলং খ্যাতিঞ্চ বৃত্তঞ্চ বুদ্ধ্যা তু প্রসমীক্ষ্য সঃ। তার মধ্যে কুরুবংশের প্রধান পুরুষ শান্তনুর পুত্র ভীষ্ম যেখানে নিজের পুত্রপ্রতিম ধৃতরাষ্ট্রের বিবাহের জন্য গান্ধাররাজ সুবলের কাছে কন্যা যাচনা করে দূত পাঠিয়েছেন, সেখানে তার পক্ষে এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করা খুব কঠিন ছিল।
