আমরা জানি–বসুদেবের পত্নী রোহিণী কুরুবংশের কন্যা। মহারাজ শান্তনুর মেজো দাদা বাহ্লীকের মেয়ে বলে তিনি পরিচিত। কংসের কাকা দেবকের সাত মেয়ের সঙ্গে বিয়ে হবার আগেই পুরু-ভরতবংশের পাঁচটি মেয়ের সঙ্গে বসুদেবের বিয়ে হয়েছিল। রোহিণী এঁদের মধ্যে সবচেয়ে বড় ছিলেন। অলৌকিকতায় বিশ্বাস করলে মানতেই হবে যে, ভগবতী যোগমায়া দেবকীর সপ্তম গর্ভটি আকর্ষণ করে রোহিণীর উদরে সংস্থাপন করলেন এবং রোহিণীর গর্ভে বসুদেবের সপ্তম পুত্রটি বেঁচে বর্তে রইল। কংসের চরেরা কংসকে খবর দিল–দেবকীর গর্ভ নষ্ট হয়ে গেছে। কিন্তু এইখানে আমাদের একটি নিবেদন আছে, কেননা অলৌকিকতার আশ্রয় নিয়েও ঘটনাটা বোধহয় ব্যাখ্যা করা যায়। অবশ্য তার জন্য অন্যান্য পুরাণগুলিকে আমাদের প্রমাণ হিসেবে মানতেই হবে।
আমাদের ধারণা–দেবকীর ছয়টি সন্তান যেভাবে পর পর কংসের হাতে বিনষ্ট হয়, সেই পরম্পরার মধ্যে সরল পৌরাণিকের কিছু অতিশয়োক্তি থাকতে পারে। কেন, তা জানাই। অলৌকিকতায় বিশ্বাস না করলে আপনারা কতগুলি যুক্তি মাথায় রাখুন। প্রথমেই মনে রাখতে হবে যে, বসুদেব কংসেরই রাজভবনে তারই কাকা দেবকের মেয়ে বিয়ে করতে গিয়ে রাজরোষে কারাগারে আবদ্ধ হন। কংসের হাতে দেবকী-বসুদেবের ছয়টি সন্তান নিহত হবার ঘটনাকে আমরা কথঞ্চিৎ অতিশয়িত বিবরণ বলে মনে করি এইজন্য যে, মহাভারতের উত্তরভাগ খিল-হরিবংশে এই ছয়টি ছেলের পূর্বজন্মের একটা কাহিনী বলা আছে। সেখানে দেখা যাচ্ছে দেবকীর এই শিশুপুত্রগুলি পূর্বজন্মে কালনেমির পুত্র ছিলেন। তারা সকলেই দানব। হরিবংশ এই দানবদের একত্রিতভাবে নাম দিয়েছে–ষড়গর্ভ বলে। এঁরা নাকি ব্রহ্মার তপস্যা করে দৈত্যরাজ হিরণ্যকশিপুর মনে ব্যথা দেন এবং হিরণ্যকশিপু এঁদের শাপ দেন যে, তারা তপস্যায় যতই ভগবান ব্রহ্মাকে তুষ্ট করুন না কেন, তারা তাদের পিতার দ্বারাই নিহত হবেন–স এব বো গর্ভগতা পিতা সর্বান হনিষ্যতি। মহাভারত-পুরাণমতে কংস কালনেমির অবতার। এই ষড়গর্ভ নামক দানবেরা তাদের পিতা কংসের হাতেই নিহত হয়েছেন, অতএব হিরণ্যকশিপুর অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে।
আমাদের বক্তব্য কিন্তু এখানে নয়। আমাদের বক্তব্য হল–কালনেমির পুত্রদের একত্রিতভাবে ষড়গর্ভ নাম দেওয়া হয়েছে, কিন্তু তাদের সংখ্যা সত্যি ছয় কিনা, সে বিষয়ে কোনও স্পষ্ট কথা হরিবংশে নেই। দ্বিতীয়ত দেবকীর পুত্রদের সংখ্যা ছয় বলেই পূর্বজন্মে। ষড়গর্ভ নামক দানবকে বহুবচনে ডাকা হয়েছে সর্বত্র। কিন্তু লক্ষ্য করে দেখুন–এই ষড়গর্ভ দানবেরা যখন তপস্যার জোরে ভগবন্নারায়ণের ভবিষ্যৎ গর্ভাবাস দেবকীর জঠরে পুত্র হিসেবে জন্মাচ্ছেন, তখন কিন্তু ষড়গর্ভের ষট-সংখ্যা ভুলে পুরাণকার মুখ ফসকে একবচন ব্যবহার করেছেন। হরিবংশের কথকঠাকুর বললেন–ছয় দানবই তখন দেবকীর গর্ভে জন্ম নিয়ে ষড়গর্ভ হলেন–ষড়েব দেবকীগর্ভে ষড়গর্ভো বৈ মহাসুরাঃ।
আমাদের বিশেষ ধারণা ষড়গর্ভ–এই নামটার মধ্যে ষড় অর্থাৎ ছয়-সংখ্যার অর্থ থাকার ফলেই দেবকীর গর্ভজাত সন্তানদের সংখ্যা ছয় হয়েছে। এতে পৌরাণিকের সুবিধে এই যে, পর পর ছয়টি শিশুকে পাথরে আছড়ে মারার ফলে একদিকে যেমন কংসের নৃশংসতা বেশি করে দেখানো গেছে, অন্যদিকে তেমনি বসুদেবের করুণ অবস্থাও এতে বেশি প্রকট হয়ে উঠেছে। আরও একটা ব্যাপার-বিশাল কোনও ব্যক্তিত্বের জন্ম হবার আগে তাঁর পূর্বজন্মাদের আকালিক এবং কষ্টকর মরণ দেখানোটা অনেকটাই মহাকাব্যের অঙ্গের মধ্যে পড়ে। এতে ক্ষণজন্মা বিরাট পুরুষের একটা heroic isolation তৈরি হয়। দেবব্রত ভীষ্ম জন্মানোর আগেও এইরকম অকালমৃত্যু আমরা দেখেছি–অষ্ট বসুর সাত বসুকেই জন্ম মাত্রেই জলে ডুবিয়ে মেরেছেন গঙ্গা। আপন মায়ের হাতের সেই মৃত্যুর মতোই এখানে কালনেমি-রূপী পিতা কংসের হাতে ষড়গর্ভের মৃত্যু হয়েছে।
পুত্রের এই সংখ্যাধিক্য অবশ্যই এক অতিশয়োক্তি ঘটনা এবং এখানে তো বড়গর্ভের মতো একটি অসাধারণ শব্দ মিলে যাওয়ায় দেবকীর পুত্র-সংখ্যা ছয় হাতে দেরি হয়নি। বাস্তবে আমরা বিশ্বাস করি যে, যড়গর্ভ আসলে একটিমাত্র দানবের নাম এবং দেবকীর একটি মাত্র সন্তানই হয়ত কংসের হাতে নিহত হয়েছে, যার নাম হয়ত যড়গর্ভ। এই যড়গর্ভের পর সপ্তম গর্ভাক আর রোহিণীর উদরে অলৌকিকভাবে সংস্থাপন করার প্রয়োজন পড়ে না। বসুদেব কংসের কারাগারে আবদ্ধ হবার অন্তত এক-দুই বছর আগেই রোহিণীর গর্ভাধান করে থাকবেন। এদিকে দেবকীর ষড়গর্ভ কংসের হাতে মৃত্যু বরণ করেছেন, ওদিকে বৃন্দাবনে রোহিণীর গর্ভে সংকর্ষণ বলরাম জন্মগ্রহণ করেছেন স্বাভাবিক ময্যের নিয়মেই আর সংকর্ষণ নামটির জন্য দেবকীর গর্ভ আকর্যণ না করলেও চলে। পুরাতত্ত্ববিদ মিথলজিস্টরা বলরামের সংকর্ণ নামের মধ্যে পুরাতন কৃষি-সভ্যতার সংযোগ দেখেছেন। তার অস্ত্র হল বা লাঙলও কর্ষণের প্রতীক।
আমরা জানি–বসুদেব কংসের প্রতিপয় নেতা ছিলেন। কংসের অত্যাচার যখন বসুদেবের ঘর পর্যন্ত এসে পৌঁছর, তখনই তিনি তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধ নন্দ-গোপের বাড়িতে রোহিণীকে রেখে এসেছিলেন তার নিরাপত্তার কারণে এবং হয়ত তিনি তখনই গর্ভবতী ছিলেন। বসুদেবের অন্য চার পৌরবী পত্নীর নাম কিন্তু এখানে শোনা যাচ্ছে না। একমাত্র পৌরবী রোহিণীই তাঁর বন্ধুর বাড়িতে আছেন বলেই আমরা মনে করি–তিনি তখনই গর্ভবতী ছিলেন এবং গর্ভবতী বলেই এমাত্র তারই নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছেন বসুদেব।
