অশ্বনদীর ধারে এসে পরিচারিকা দীপবর্তিকা হাতে দাঁড়াল। কুন্তী পেটিকাটি চেপে ধরলেন বুকে। এবার ভাসিয়ে দিতে হবে পরাণ-পুতলি শিশুটিকে। জীবনে প্রথম পুত্রজন্মের পর যে পরম আনন্দ লাভ করে জননী, কুন্তী সেই আনন্দের ভাগী হতে পারলেন না। সমাজের ক্রুরতায় আজ এক অসহায় শিশুকে ভাসিয়ে দিতে হবে জলে। কুন্তী অনেক কাদলেন। শিশুপুত্রকে কোলের মধ্যে চেপে ধরে কুত্তী অনেক কাঁদলেন–পুত্রস্নেহেন রাজেন্দ্র করুণং পৰ্য্যদেবয়ৎ। তারপর আবার তাকে শুইয়ে দিলেন পেটিকার মধ্যে। পেটিকার মুখখানি এঁটে দিলেন শক্ত করে।
আর দেরি করা যায় না। কুন্তী অশ্বনদীর জলে ওপরে পেটিকাটি অনেকক্ষণ স্থির রেখে আস্তে আস্তে ভাসিয়ে দিলেন জলেশ্লায়াং সুপিধানায়ামশ্বনদ্যামবাসৃজৎ।
.
৭৪.
সামান্য নির্মমতার মুহূর্তে যখনি বেতের পেটিকাটি অশ্বনদীর জলের ওপর ঠেলে দিলেন কুন্তী, সেই মুহূর্তেই কুন্তীর মাতৃহৃদয় একেবারে উথাল-পাতাল হয়ে উঠল। যে সন্তান তাকে প্রথম মা বলে ডাকত, যার কপালে তিনি প্রথম স্নেহের চুম্বনটি এঁকে দিয়েছিলেন, যার জন্য আপনিই তার স্তনদুগ্ধ ক্ষরিত হচ্ছিল, সেই সন্তানকে অশ্বনদী যখন তার শান্ত-তরঙ্গ ভঙ্গে দূর থেকে আরও দূরে নিয়ে যেতে লাগল, তখনই কুন্তী কান্নায় একেবারে ভেঙে পড়লেন। প্রাণপ্রিয় পুত্রটি যাতে শুধু জীবনে বেঁচে থাকে তার জন্য অন্তরীক্ষ লোকের সমস্ত দেবতাকে তিনি মুহূর্তের মধ্যে বিচলিত করে তুললেন।
অশ্বনদীর পারে দাঁড়িয়ে সমাজ-সংসারের ভয়ভীত এক অভাগা জননী কাঁদতে কাঁদতে বললেন–বাছা আমার। জলের রাজা বরুণদেব এই অখণ্ড জলরাশির মধ্যে যেন বাঁচিয়ে রাখেন তোকে। তোর পিতা, যিনি অলৌকিকভাবে তোকে দিয়েছিলেন আমার কোলে, তিনি যেন বাঁচিয়ে রাখেন তোকে–পিতা ত্বাং পাতু সর্বত্র তপনস্তপতাং বরঃ সর্বত্রগামী পবনদেব যেন তোকে নিঃশ্বাস দেন সব সময়। বিপদে আপদে, সম্পদে তোকে বাঁচিয়ে রাখুন অন্তরীক্ষ লোকের সমস্ত দেবতারা, সিদ্ধ-সাধ্য, আদিত্য-বসুরা। বাছা আমার! ভয় নেই কোনও, তুই যেখানে থাকিস, তোর এই গায়ে আঁটা বর্ম দেখে আমি ঠিক চিনে নেব তোকে–বেৎস্যামি ত্বং বিদেশে পি কবচেনাভিসূচিতম্।
কুন্তী আশা রাখেন–তার এই প্রথম জন্ম পুত্রের সঙ্গে আবার দেখা হবে কোনওদিন। কিন্তু এই মুহূর্তে এক সদ্য-জননীর হৃদয় ছিঁড়ে যাকে জলে ভাসিয়ে দিলেন তিনি, সে নিশ্চয়ই মানুষ হতে থাকবে কারও সুগভীর অপত্য-স্নেহে। এমন দৈবপ্রেরিত কবচ-কুণ্ডল পরা একটি পুত্র লাভ করলে কোনও মানুষ তাকে ত্যাগ করবে না। কুন্তী বললেন–ভাগ্য বটে তোর পিতার, যিনি আকাশ থেকে সহস্র কিরণ-কর-সম্পাতে স্পর্শ করবেন তোকে। ধন্যি মানি সেই জননীকে, যিনি তোকে পুত্রের মতো মানুষ করবেন, যিনি তোর তৃষিত ওষ্ঠাধরে প্রথম স্তন্য দান করবেন–যস্যাজ্জ্বং তৃষিতঃ পুত্র স্তনং পাস্যতি দেবজ। কেমন মধুর স্বপ্ন দেখেছিলেন সেই জননী, যিনি তোর মতো এমন সুন্দর একটি ছেলে কোনও শুভ স্বপ্নেও ছিল কি তার? এমন সুন্দর চেহারা, এমন পদ্মকলির মতো গায়ের রঙ, পদ্মের পাপড়ির মতো এমন চোখ, এমন ললাট, এমন চুল–এমন একটি পুত্রের মধুর স্বপ্ন কখনও কি সেই জননী দেখেছিলেন কো নু স্বপ্নস্তয়া দৃষ্টো যা ত্বমাদিত্যর্বচসম্?
কুন্তীর জননী-হৃদয় পেটিকার মধ্যে থাকা সেই শিশু পুত্রটির একটু একটু করে বেড়ে ওঠার কল্পনায় আপ্লুত হয়ে পড়ল বারেবারে। ভাসমান পেটিকাটির দিকে তাকিয়ে নিজে নিজেই তিনি বলে ওঠেন–তুই যখন ধুলোমাটির মধ্যে লুটোপুটি করে হামাগুড়ি দিবি, আধো-আধো কথা বলবি–তখন যারা তোক দেখবে, তাদের পুণ্যের কথা আর কী বলব–অব্যক্তকলবাক্যানি বদন্তং রেণুগুণ্ঠিত। তারপর যখন তোর শরীরে যৌবন আসবে, লোহার মতো হয়ে উঠবে তোর শরীর, তখন মনে হবে যেন হিমালয়ের বন থেকে দৃপ্ত সিংহটি বেরিয়ে এসেছে। ডুয়ে-হিমব বনসঙুতং সিংহং কেশরিণং যথা। কারা দেখবে তোর সেই চেহারা?
এইভাবে একটি শিশু পুত্রকে ছোট থেকে বড় হতে দেখার যে সুখ, সে সুখ কুন্তী জননী হওয়া সত্ত্বেও পেলেন না। তাই অনেক কাঁদলেন কুন্তী। মেক কাদলেন–এবং বহুবিধং রাজ বিলপ্য করুণং পৃথা। রাত্রি গভীর ঘন হয়ে এল (সমস্ত আশা নির্মূল হয়ে গেলেও কুন্তীর জননী-হৃদয় বার বার শুধু এক কথা উচ্চারণ করল–বাছা! ঠিক তোর দেখা পাব একদিন, তোর ওই জন্মলগ্ন কবচ-কুণ্ডল দেখে ঠিক তোকে চিনে নেব বাছা। অনেক কেঁদে, অনেক বাষ্প মোক্ষণ করে প্রায় অর্ধেক রাত্রে পরিচারিকার কাঁধে ভর দিয়ে নিশ্রুপে নিজ ভবনে ফিরে এলেন কুন্তী-ধাত্রা সহ পৃথা রাজ পুত্ৰদৰ্শন-লালসা। অশ্বনদীর জলে বেতসী পেটিকা একটু একটু করে ভাসতে ভাসতে এগিয়ে চলল চর্মগ্বতীর দিকে।
মথুরা নগরী ছাড়িয়ে বেশ খানিকটা দূরে কুন্তি রাষ্ট্রের কন্যান্তঃপুরে আজ যে ঘটনা ঘটে গেল, সে ঘটনা কেউ জানল না। রাজা কুন্তিভোজ আগের দিনের মতোই সভায় গেলেন। রাত্রিশেষে একই সূর্য উঠল পূর্ব দিবধূর মিলন-রক্তিম আভাসে। শুধু এক রাত্রির মধ্যেই কন্যান্তঃপুরের সেই যুবতীটি এক পরিণতা ধীরা রমণীতে পরিণত হলেন।
মহারাজ আর্যক শূরের পুত্র-কন্যার ভাগ্যটাই বুঝি এইরকম। তার প্রথমা কন্যাটি কন্যা অবস্থায় অলৌকিকভাবে একটি পুত্র লাভ করেও তার একান্ত আপন পালক পিতার ভয়ে–সম্বোধনভয়াৎ পিতুঃ–তাকে জলে ভাসিয়ে দিতে বাধ্য হলেন। ওদিকে খোদ মথুরায় আর্যক শূরের প্রথম পুত্র বসুদেব সস্ত্রীক আবদ্ধ হয়ে আছেন কংসের কারাগারে। মথুরার সর্বাধিনায়ক মহারাজ কংস একে একে তাঁর ছয়টি পুত্রকে মাতৃক্রোড় থেকে টেনে এনে নৃশংসভাবে মেরে ফেলেছেন। দেবকীর সপ্তম পুত্র জন্মানোর আগেই পৌরাণিকেরা চরম অলৌকিকতার আশ্রয় নিলেন। অঘটনঘটনপটীয়সী যযাগমায়া দেবকীর সপ্তম গর্ভ আকর্ষণ করে স্থাপন করলেন বসুদেবের অন্য পত্নী রোহিণীর উদরে। পৌরজনেরা জানল দেবকীর গর্ভ নষ্ট হয়ে গেছে–অহহা বিংসিততা গর্ভ ইতি পৌরা বিচুকুসুঃ।
