আমাদের জিজ্ঞাসা- ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির ধারক বাহক মহারাজ বিক্রমাদিত্যের এই বুদ্ধি হল কোত্থেকে? আমরা বলব তার সামনে উদাহরণ ছিল অনেক। অর্জুন যে নাগকন্যা উলুপীকে বিবাহ করেছিলেন এই উদাহরণই শুধু নয়। আর্যসভ্যতার প্রথম কল্প থেকে নাগরা যে আর্যদের শত্রু অথবা আর্যদের শত্রুপক্ষকে যে অনেক সময়ই সর্পের কল্পনায় দেখা হত– এ কথা বিক্রমাদিত্য জানতেন। বেদের মধ্যে বৃত্র থেকে আরম্ভ করে অনেক শক্ৰকেই অহি’বা সর্পরূপেই কল্পনা করা হয়েছে। এঁদের সঙ্গে যুঝতে হলে হয় তাদের মারতে হবে, নয়তো তাঁদের সঙ্গে রফায় আসতে হবে। আযায়ণের প্রথম দিকে এই শত্রুতা বেশি ছিল, পরের দিকে মিল মিশ বিবাহ–সবই হয়েছে। অর্থাৎ রফা।
নাগদের মধ্যে দু’রকমের বৃত্তি দেখা যাবে ইতিহাস-পুরাণে। কোথাও তারা ভাল, কোথাও মন্দ। মহাভারতের ক আর বিনতার গল্পে এই ভাল মন্দর খবরটুকু দেওয়া আছে, কিন্তু সেই কাহিনীতে যেতে হলে সমুদ্রমন্থনের কথা এড়িয়ে যাওয়া যাবে না। আমি পরে আসছি সে কথায়। আগে জানাই–কদ্রুর ছেলেরা হলেন সাপ, আর বিনতার ছেলে হলেন গরুড়। এঁদের পিতা কিন্তু একজনই মহর্ষি কাশ্যপ। অর্থাৎ এঁদের বংশমূলে সাপ বা পাখির কোনও গন্ধ নেই। একই মুনির দুই পুত্র- এক পক্ষে সর্পকুল, অন্যপক্ষে পক্ষী সুপর্ণ। হাইনরিখ জিমারের। রূপকের ভাষায় একটা হল –darker aspects of God’s essence, আর অন্য দিকে রয়েছে তার conquering principle –গরুড়, সুপর্ণ।
ব্যাপারটা ইতিহাসেও একই রকম। পণ্ডিতরা বলেন কুরু পাণ্ডবদের রাজনৈতিক ক্রিয়াকলাপের মূল কেন্দ্র, যাকে আমরা হস্তিনাপুর বলি, সেই হস্তিনাপুরে আগে নাগদের বাসা ছিল। হস্তিনাপুরকে আগে নাগ পুরই বলা হত। মহাভারতের মহারাজ পাড়ুর বিশেষণ হল নাগপুর-সিংহ। বলতে পারেন-নাগ-মানে তো হাতিও বটে; বিশেষত হস্তিনাপুর গজসাহবয় –এইসব নাম থেকে হস্তিনাপুরের সঙ্গে হাতির সাযুজ্যটাই আসে বেশি অতএব সর্প নাগ নয়, হস্তিনাগ থেকেই হস্তিনাপুরের উৎপত্তি। আমরা কিন্তু এখানে সৌতির বলা সেই সৰ্পনামগুলি আপনাদের স্মরণ করিয়ে দিতে চাই, যে নামের সঙ্গে হাতির নাম মিশে গেছে। অর্থাৎ সেই ঐরাবত, হস্তিপদ, হস্তিপিন্ড, কুঞ্জর ইত্যাদি। সর্প-নাগদের সঙ্গে হস্তি নাগের ভিন্নতা এইভাবেই নষ্ট হয়ে গেছে। নাগপুর হয়ে গেছে হস্তিনাপুর। পণ্ডিতেরাও এসব কথার উত্তর দিয়েছেন। OST 166109a Later when the distinction between the Naga and serpent clans was forgotten, the elephant was also associated with them. ধরে নিতে পারি– পাণ্ড রাজার নাগপুরে সর্প নাগরাই থাকতেন।
আমি অবশ্য ব্যাপারটা আরও একটু পরিষ্কার করে দিতে চাই। মহাভারত বলেছে যেসব শত্রু আগে কুরুরাষ্ট্র দখল করে রেখেছিল, যার কুরুদের ধন-সম্পদ হরণ করেছিল, মহারাজ পান্ডু সেই সব দেশ পুনরায় অধিকার করে সেগুলিকে করদ রাজ্যে পরিণত করলেন-তে নাগপুর-সিংহেন পাণ্ডুনা করদীকৃতাঃ। যাঁদের রাজ্য পুনরায় দখল করলেন পাণ্ডু, আমাদের ধারণা–তারা সকলেই নাগ-গোষ্ঠীর রাজা। তাদের জয় করেছিলেন বলেই তিনি নাগপুর-সিংহ। পাণ্ডু থেকে আরম্ভ করে একেবারে যুধিষ্ঠিরের সময় পর্যন্ত নাগ রাজারা বেশ স্তিমিত হয়েই ছিলেন খাণ্ডব-বন দহনের সময় স্বয়ং নাগরাজ তক্ষককে নিজের জায়গা ছেড়ে চলে যেতে হয়। যদিও তিনি প্রচন্ড অসন্তুষ্ট হয়ে থাকলেও দুর্যোধন বা যুধিষ্ঠিরের দর্পিত এবং সংযত রাজত্বকালে তিনি মাথা উঁচু করেননি মোটেই। কিন্তু কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের পর পৃথিবী বীরশূন্যা হয়ে গেল। পরীক্ষিত রাজা হয়ে বসলেন বটে, কিন্তু তার দুর্বল রাজত্বের সুযোগ নিয়ে একদিকে যেমন (রূপকাকারে কল্পিত) কলির প্রবেশ ঘটল, তেমনই ঘটল নাগদের অভ্যুত্থান। নাগরাজ তক্ষক সেই অভ্যুত্থানের প্রতীক।
লক্ষণীয় বিষয় হল আমরা যে শেষ নাগ বা বাসুকি নাগের কথা বলেছি, এঁরা কিন্তু আপন নাগ-গোষ্ঠী ত্যাগ করে আর্য গোষ্ঠীতে যোগদান করেছিলেন। শেষ নাগ পরবর্তী সময়ে বিষ্ণুর অনন্তশয্যা। আর্যগোষ্ঠীর কাছে তিনি পরম সম্মানিত। স্বয়ং কৃষ্ণ জ্যেষ্ঠ বলরাম শেষাবতার রূপে চিহ্নিত। আর বাসুকি হলেন সেই অসামান্য ব্যক্তিত্ব, যিনি রাজা হয়ে আর্যগোষ্ঠীর সঙ্গে নাগ গোষ্ঠীর মিলন সেতু রচনা করেছিলেন এবং তিনিই সমস্ত নাগ গোষ্ঠীকে আর্যগোষ্ঠীর প্রকোপ থেকে মুক্ত করে আসন্ন উচ্ছেদ থেকে রক্ষা করেছিলেন। সে কথায় পরে আসছি। আপাতত শমীক পুত্র শৃঙ্গীর অভিশাপ নিজের কানে শুনে মহারাজ পরীক্ষিতের কী অবস্থা হল একটু দেখে নিই।
.
০৮.
শমীক-মুনির সংবাদ নিয়ে তাঁর শিষ্য গৌরমুখ হস্তিনায় এসে পৌঁছলেন পরীক্ষিতের কাছে। পরীক্ষিত শমীককেও চেনেন না, তাঁর পুত্র শৃঙ্গীকেও চেনেন না, গৌরমুখকেও তার চেনার কোনও প্রশ্ন ওঠে না। কিন্তু অপরিচিত ব্যক্তি যখন ভয়ংকর অভিশাপ বাক্যটি শোনাল, তখন অনুতাপে তার হৃদয় জর্জরিত হল। শমীক যে মৌনব্রত নিয়ে বসেছিলেন, সেইজন্য যে তিনি মহারাজ পরীক্ষিতের কথায় উত্তর দিতে পারেননি–এই অসম্ভব ভুলটুকু পরীক্ষিতকে পীড়িত। করে তুলল– ভূয় এবাভবদ্ৰাজা শোকসন্তপ্তমানসঃ।
হাজার হলেও কুরুকুলের অধস্তন পুরুষ। অন্যায় একবার করে ফেলেছেন বটে, কিন্তু সে অন্যায় অনুধাবন করার সঙ্গে সঙ্গে মর্মচ্ছেদ অনুতাপ আঁকে যত দগ্ধ করতে লাগল, তার মৃত্যুর অভিশাপ সেই অনুপাতে তাঁর কাছে অনেক বেশি সহনীয় ছিলন হি মৃত্যুং তথা রাজা শ্ৰুত্ব বৈ সোন্বতপ্যত। শমীক মুনি উপদেশ পাঠিয়েছিলেন রাজা যেন আত্মরক্ষার যথাযথ উপায় অবলম্বন করেন। রাজা পরীক্ষিত সেই উপদেশ মাথায় রেখে মন্ত্রীদের সঙ্গে শলা পরামর্শ করে নিজের জন্য নিচ্ছিদ্র সুরক্ষার ব্যবস্থা নিলেন। একটি মাত্র স্তম্ভের ওপর একটি বাড়ি বানিয়ে চতুর্দিকে সর্প চিকিৎসক নিযুক্ত করে, চারদিকে বিষ-নাশক ওষুধ ছড়িয়ে, সর্পমন্ত্রসিদ্ধ ব্রাহ্মণদের ওপর তদারকির ভার দিয়ে পরীক্ষিত মহারাজ সুরক্ষিত হয়ে রইলেন। কেউ তার সঙ্গে দেখা করতে পারে না, লোক জনের যাতায়াত বন্ধ, সর্বব্যাপ্ত বায়ুরও যেন সে বাড়িতে প্রবেশ নিষেধ। এমনই এক নিচ্ছিদ্র ঘেরাটোপের মাঝখান থেকে পরীক্ষিতের রাজকার্য চলতে থাকল।
