আমরা জানি–ভবিষ্যতে কুন্তীর এই ক্রুর ব্যবহারের জন্য তাকে অনেক তিরস্কার শুনতে হবে। যে শিশুপুত্রকে তিনি চরম নিষ্ঠুরতায় ভাসিয়ে দিচ্ছেন আজ–আমরা জানি–তার জন্য কুন্তী নিজেই ভবিষ্যতে অনুতাপগ্রস্ত হবেন। কিন্তু যারা সমালোচকের মঞ্চে বসে সমাজমুখ্যের সম্মার্জনী হাতে নিয়ে কুন্তীকে তিরস্কার করবেন এবং সাহিত্যরসের প্রচুরতর কারুণ্যে কুন্তীর শিশুপুত্রের ভাগ্যের জন্য যারা অধিক রবিষ্ট হবেন, তাঁরা কি কুন্তীর মনস্তত্ত্ব কখনও ভেবে দেখেছেন? জন্মলগ্নে জন্মদাতা পিতা-মাতার স্নেহ পেয়েও যাঁকে বালিকা বয়সেই পিতার বন্ধুর বাড়িতে চলে যেতে হয়েছে, এবং পালক পিতা যাঁকে সম্পূর্ণ আত্মসাৎ করতে পারেননি, তাঁর মনের অবস্থাটা কি খুব স্বাভাবিক ছিল?
দুর্বাসা মুনির সেবায় নিয়োগ করার সময় কুন্তিভোজ বারবার তাকে বৃষ্ণিবংশের মর্যাদা স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। তার কথাবার্তা থেকে পরিষ্কার বোঝা গেছে যে, কুন্তীর দিক থেকে কোনও অন্যায়-অনাচার ঘটলে তার সমস্ত কলঙ্কের দায় বৃষ্ণিবংশকেই স্পর্শ করবে, রাজা কুন্তিভোজ তার কলঙ্কের দায় বহন করবেন না। জীবনের মৌলিক ক্ষেত্রগুলিতে কুন্তিভোজের এই অনাত্মীকরণ কুন্তীর মনে যে জটিল আবর্ত তৈরি করেছিল, তার মধ্যে এই সমাজ-বহির্ভূত প্রথায় পুত্রজন্ম কী ধরনের জটিলতা তৈরি করতে পারে, তা অনুমানযোগ্য।
দ্বিতীয়ত, বিংশ শতাব্দীর পরিণত কাব্যরসে–যে ফিরাল মাতৃস্নেহপাশ–এই তির্যকবাক্যটি কুন্তীকে শুনতে হবে তাঁরই পুত্রের কাছে। আমাদের জিজ্ঞাসা-জীবনের প্রান্তভূমিতে পৌঁছে যিনি পুত্রের কাছে এই তিরস্কার লাভ করবেন, তিনি কতটুকু মাতৃস্নেহের স্বাদ পেয়েছেন? কুন্তিভোজের গৃহে কুন্তীকে যেমন সর্বেসর্বা এক কত্রীর ভূমিকায় দেখেছি আমরা, তাতে এই গৃহে কোনও জননীর স্নেহ তিনি পেয়েছেন কিনা সন্দেহ আছে। কুন্তিভোজের গৃহে এসে পালক পিতার আদর তিনি যথেষ্টই পেয়েছেন, কিন্তু এই গৃহে কোনও স্নেহময়ী জননীকে আমরা দেখিনি কুন্তীকে সর্বক্ষণ আগলে রাখতে। সূর্যের সঙ্গে কথোপকথনের সময় কুন্তী যে দু-একবার বলেছেন–আমার পিতা, আমার মাতা কী ভাববেন, অথবা সূর্যও যে বলেছেন–তোমার পিতা কিংবা মাতা তোমার প্রভু নন–সেখানে এই কথাগুলি সাধারণ কথার মাত্রা হিসেবেই ব্যবহৃত হয়েছে। বাস্তবে মাতা শব্দের কোনও অর্থ এখানে যদি থেকেও থাকে, তবে সে মাতা বৃষ্ণিকুলে আর্যক শূরের গৃহিণী, কুন্তীর গর্ভধারিণী মাতা।
আর্যক শূরের ঘরে কুন্তী কদিনই বা ছিলেন! কিন্তু যতদিন ছিলেন, ততদিনে জননীর বাৎসল্য-পরিপাক যথেষ্ট ঘটে যাবার কথা। জননীর সেই পরিপক্ক বাৎসল্য-রসে জলাঞ্জলি দিয়ে কুন্তীকে যখন কুন্তিভোজের বাড়িতে চলে আসতে হয়েছিল, তখন মুকুলিকা-বালিকার হৃদয়ে জননী শব্দটি কতটা নিষ্ঠুর হয়ে উঠেছিল, তা কুন্তী যেমন জানেন, তেমনটি কে আর জানে? সেই বালিকা-বয়স থেকেই বাৎসল্যের স্নেহ-রসে বঞ্চিত এক দত্তক-কন্যার জীবনে যখন তাই অকাল-মাতৃত্ব নেমে এল, তখন সেখানে মাতৃত্বের মর্ম খুব বড় হয়ে উঠল না, বরঞ্চ পুত্রজন্মের আকালিকতাই সেখানে আরও এক জটিলতর আবর্ত তৈরি করল। এই আবর্ত থেকে সাময়িক মুক্তির একমাত্র উপায় ছিল শিশু পুত্রকে পরিত্যাগ করা।
গৃহস্থের ঘরে কোনও সন্তান যদি জন্মমাত্রেই মারা যায়, তাতে যা দুঃখ হয়, তার চেয়ে অনেক বেশি দুঃখ যদি সে সন্তান খানিকটা বড় হয়ে মারা যায়। শৈশব থেকে কৈশোরে পৌঁছনোর মধ্যে যতটা সময় যায়, সেই সময়ের ক্রমপর্যায়ে একটি শিশুর যে আঙ্গিক, বাঁচিক এবং ভাবের পরিবর্তন ঘটে, তাতে পিতা-মাতার হৃদয়ে আরও গভীর থেকে গভীরতর মায়া তৈরি হয়। এই মায়া তৈরি হবার পর যদি পুত্র-কন্যাকে ছেড়ে দিতে হয় অথবা সে মারা যায়, তবে পিতা-মাতা জীবিত অবস্থাতেও জীবিত থাকেন না। তাই আরও কোনও গভীরতর মায়া তৈরি হবার আগেই কুন্তী তাঁর পরিচারিকার সঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত নিলেন–পুত্রটিকে পরিত্যাগ করতে হবে। এতে যেমন সারা জীবন সামাজিক গঞ্জনা থেকে মুক্তি পাবেন কুন্তী, তেমনি মায়া তৈরির আগেই হঠাৎ করে মায়া কাটিয়ে দিয়ে খানিকটা যদি শান্তি পাওয়া যায়, আপাতত সেই ভাবনাতেই পুত্রকে পরিত্যাগ করে অতি-অযৌক্তিক এক মুক্তির স্বাদ পেতে চাইলেন কুন্তী।
কুন্তীর পরিচারিকা একটি পেটিকা নিয়ে এসে রাখল কুন্তীর সামনে। পেটিকাটি বেতের তৈরি। কুন্তী জানেন সূর্যের-অক্ষয় কবচ-কুণ্ডল যতক্ষণ এই শিশুর অঙ্গলগ্ন হয়ে থাকবে, ততক্ষণ এই শিশুর মৃত্যু নেই। অতএব বেতের পেটিকার মধ্যে শিশুটিকে রেখে, সেই পেটিকাটি নদীর জলে ভাসিয়ে দিলে কোনও না কোনওভাবে শিশুটির জীবনরক্ষা হবে হয়ত।
বেতের পেটিকাটির চারদিকে মোম লেপে দিল কুন্তীর পরিচারিকা। যাতে বেনির্মিত পেটিকাটির ভিতর জল না ঢোকে। কোমলতা এবং উষ্ণতা বজায় রাখার জন্য পেটিকার ভিতর পেতে দেওয়া হল নরম নরম কতগুলি কাপড়–মধূচ্ছিষ্ঠস্থিতায়াং সা..স্বাস্তীৰ্ণায়াং সমন্ততঃ। সুরক্ষিত এই পেটিকাটির মধ্যে শিশুপুত্রটিকে সযত্নে শুইয়ে দিলেন কুন্তী।
দেব দিবাকর অনেকক্ষণ অস্তাচলে চলে গেছেন। রাত্রির আঁধার ঘনিয়ে আসছে একটু একটু করে। লোকের গতাগতি স্তব্ধ হয়ে এল রাজপথে। কুন্তীর প্রকোষ্ঠ থেকে পরিষ্কার দেখা গেল অশ্বনদীর উচ্চাবচ পথরেখা। এমনিতেই রাজার কন্যান্তঃপুরের আশেপাশে মানুষের গতাগতি কম। তার ওপর রাত ঘনিয়ে এসেছে। কুন্তীর বিশ্বস্ত পরিচারিকা একটি অস্পষ্ট দীপবর্তিকা হাতে নিয়ে কুন্তীকে তার পিছন পিছন যেতে বলল। বৈতসী-বেত্রময়ী পেটিকাটি সযত্নে ধারণ করে ত্ৰ-শঙ্কিত পদে অস্পষ্ট দীপালোকে অনুসরণ করে অশ্বনদীর পথে চললেন কুন্তী। গ্রহ-নক্ষত্রমালিনী রাত্রিতে কুন্তী দুঃখ-বিপদের সাক্ষী হয়ে রইল শুধু আকাশের চাঁদ!
