দেবমাতা অদিতির কানের অমৃতময় কুও ছিল সূর্যদেবের কানে, দেব-দানবের অভেদ্য বর্ম ছিল সূর্যদেবের গায়ে। সূর্য প্রতিজ্ঞা করলেন–এই দুটিই তোমার গর্ভজাত সন্তানকে দিয়ে যাব–তস্মৈ দাস্যামি বামোরু। কুন্তী বোধহয় অনেকটা নিশ্চিন্ত হলেন। সমাজের নীতিবিরুদ্ধভাবে যে ছেলের জন্ম দিতে হবে তাকে ত্যাগ করার ব্যাপারে বুঝি পূর্বাহ্নেই প্রস্তুত ছিলেন কুন্তী। কিন্তু সেই ছেলের গায়ে যদি মৃত্যুর প্রতিষেধক বর্ম আঁটা থাকে, তবে সেই কারণে তার সম্বন্ধে অনেকটাই নিশ্চিন্ত থাকবেন তিনি। অতএব সূর্যের সমস্ত যুক্তি মেনে নিয়ে কুন্তী স্বীকৃত হলেন সুমধুর সঙ্গমেপরমং ভগবম্নেবং সঙ্গমিষ্যে ত্বয়া সহ।
দেবতার অলৌকিকতায় যিনি মানুষের দেহ ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন কুন্তীর সামনে, যিনি সমলিঙ্গু হয়ে কুন্তীর হাত ধরে দাঁড়িয়ে ছিলেন এতক্ষণ, কুন্তীর সাগ্রহ অনুমতি পেয়ে সেই জ্যোতির্ময় পুরুষ এবার কুন্তীর নাভিদেশ স্পর্শ করলেন–নাভ্যাং স্পর্শ চৈব তাম্। নাভিস্পর্শের ইঙ্গিত ব্যঞ্জনার মধ্যে অন্তরিত রেখেছেন মহাভারতের কবি। টীকাকার সেই ইঙ্গিত স্পষ্ট করে দিয়েছেন মর্তের অভিধায়-বসন-মোচনায় ইত্যর্থ। চিন্ময় দেবপুরুষ প্রবেশ করলেন মৃন্ময়ী কুন্তীর শরীরে–তথেত্যুত্ত্বা তু তাং কুন্তীমাবিবেশ বিহঙ্গমঃ। দীপ্তিমান সূর্যের পৌরুযে অভিভূত হল কুন্তীর চেতনা। যৌবনের প্রথম উন্মাদনায়, ভয়ে, সমীহায় এবং অবশ্যই এক নষ্টচেতন আনন্দে কুন্তী বিলাস-ভবনের মহার্ঘ শয্যায় সম্পূর্ণ মিলিত হলেন সূর্যপুরুষের সঙ্গে–পপাত চাথ সা দেবী শয়নে মূঢ়চেতনা।
আপন তেজে কুন্তীকে অভিভূত করে সালিঙ্গনে কুন্তীর গর্ভাধান সম্পূর্ণ করলেন সূর্যদেব–তিগ্নাংশুস্তাং তেজসা মোহয়িত্বা/যোগেন বিশাত্মসংস্থাং চকার। আধো চেতনের মধ্যে কুন্তী সূর্যের সঙ্গম-শেষের সানন্দ আশীর্বাদ শুনতে পেলেন–চললাম সুন্দরী সাধয়িষ্যামি সুশ্রোণি, সমস্ত ধনুর্ধরদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ এক বীর পুত্র লাভ করবে তুমি। আর ঠিক তার পরেই তুমি তোমার কুমারীত্ব ফিরে পাবে–সর্বশস্ত্রভৃং শ্রেষ্ঠং কন্যা চৈব ভবিষ্যসি। এতক্ষণে কুন্তী লজ্জা পেলেন। নব-সঙ্গমের মধুর আবেশ তখনও তার শরীরে। মিলন-স্নিগ্ধ রমণীয় সূর্য চলে গেছেন তার অন্তরীক্ষলোকের ঠিকানায়। মধুর কোনও মোহে আবিষ্ট হয়ে কুন্তী তখনও শুয়ে আছেন দুগ্ধশুভ্র মহার্ঘ শয্যায়–মোহাবিষ্টা ভজামানা লবে।
কুন্তী গর্ভধারণ করলেন, যে কোনও গর্ভবতী রমণীর মতোই। তিনি যেখানে থাকতেন সেটা কুন্তিভোজের কন্যান্তঃপুর। রাজার অন্তঃপুরের অন্য এক ভাগ। সেকালে রাজার স্ত্রীরা যেখানে থাকতেন, তারই একটেরে অথবা অন্য একটি পৃথক ভবনে থাকতেন রাজার যুবতী কন্যারা। তাঁদের স্বাধীনতা ছিল! আপন সখী এবং পরিচারিকাদের নিয়ে তাঁদের পৃথক একটি জগৎ তৈরি হত। কুন্তিভোজের যেহেতু কোনও সন্তান ছিল না, তাই আপন ভবনে কুন্তী ছিলেন একাকিনী। এটা তার সুবিধে। তিনি যে কখনও বাইরে যেতেন না বা পিতা কুন্তিভোজের সঙ্গে দেখা করতেন না, তা মোটেই নয়। তবে গর্ভলক্ষণ প্রকট হবার পর, বিশেষত সেই গর্ভ শুক্লপক্ষের প্রতিপদচন্দ্রের আকার ধারণ করার পর তিনি একটু সাবধান হলেন।
সাধারণ ঘরে বিবাহিতা রমণীর গর্ভলক্ষণ প্রকাশ পেলে তার মনের মধ্যে আনন্দের অন্তঃস্রোত যেমন করে তাকে লজ্জিত করে, মথিত এবং উদ্ভাসিত করে, এবং একসময় এই লজ্জামথিত উদ্ভাসই যেমন তার অন্তর্বর্তী প্রাণের সঞ্চারকে অন্যের সামনে প্রকাশিত করে দেয়, ঠিক তেমন করেই কুন্তী নিজেকে প্রকাশিত করতে পারতেন। কিন্তু সমাজের কঠিন সংস্কার এবং অবশ্যই লোকাঁচার তার এই নবতম প্রাণের উচ্ছ্বাসকে যদি স্তব্ধ করে দেয়, সেই ভয়ে কুত্তী কাউকে তার গর্ভসঞ্চারের কথা বললেন না।
কুন্তী এখন আর বাইরে বেশি যান না; যদি বা যেতে হয়, যদি বা কুন্তিভোজের সঙ্গে কখনও কথা বলতে হয়, তবে গর্ভালক্ষণাক্রান্তা রমণী যেমন ঢিলেঢালা পোশাক পরে নানা বিভঙ্গে নিজেকে লুক্কায়িত করে, কুন্তীও সেইভাবে নিজের প্রকট গৰ্ভলক্ষণ লুকিয়ে রাখলেন–সা বান্ধবভয়া বালা গর্ভং তং বিনিগৃহতী। তার এই আকালিক গর্ভসঞ্চারের কথা কুন্তিরাষ্ট্রের একটি রমণীও জানতে পেল না। শুধু এক পরিচারিকা যে সেই ছোটবেলা থেকে কুন্তীর বড়ো কাছের মানুষ, সেই শুধু দিন-রাত কুন্তীকে দেখাশোনা করে গেল। যাতে কুন্তীর উদগত গর্ভলক্ষণ কুত্রাপি প্রকাশ না পায়, সেইজন্য সে তাকে অন্যরকমভাবে সাজিয়ে দিত, অন ভাবে জামা-কাপড় পরিয়ে দিত এবং সব সময় তাকে বাঁচিয়ে চলত–কন্যাপুরগতাং বালাং নিপুণা পরিরক্ষণে।
অবশেষে হরিষে–বিষাদমিশ্রিত সেই দিনটি এসে গেল। সূর্যের প্রসাদে সূর্যেরই মতো দেবতার তুল্য এক পুত্রের জন্ম দিলেন কুন্তী। ঠিক সেই রকম সোনার বর্ম আঁটা তার গায়ে, কানে আদিত্য কুণ্ডল। জন্মকালেই সিংহের মতো উজ্জ্বল তার চোখ, স্কন্ধদেশ দৃঢ় বৃষল। তার মুখের আদল ঠিক তার পিতার মতোই–হৰ্য্যক্ষং বৃষভস্কন্ধং যথাস্য পিতরং তথা।
রাজার বাড়িতে দেবতার দেবপ্রতিম পুত্র জন্মাল। অথচ বাজল না কোনও ভেরী, বেজে উঠল না বিশাল কোনও গোমুখ শঙ্খ। বৈদিকরা মঙ্গল-মন্ত্র উচ্চারণ করলেন না, চতুষ্পথে ভেসে আসল না রমণীকন্ঠের তীক্ষ্ণ জয়কার। অকূল স্তব্ধতার মধ্যে এই শিশুপুত্রকে কীভাবে অপ্রমাণ করা যায়, সেই আলোচনায় চিন্তিত হলেন দুটি নারী-কুন্তী এবং তার একান্ত পরিচারিকা–জামাত্রঞ্চ তং গর্ভং ধাত্রা সংম ভাবিনী। ঠিক হল–একটি বেতের পেটরার মধ্যে শিশুটিকে শায়িত করে অশ্বনদীর জলে ভাসিয়ে দেবেন কুন্তী।
