সতীত্বের জন্য কুন্তীর এই হাহাকার এক লহমার মধ্যে এক কৌতুকপ্রিয়া কিশোরীকে পূর্ণা যুবতী করে তুলেছে। সূর্য কুন্তীর মনের অবস্থা বুঝলেন এবং উত্তর দিলেন সমাজ-জীবনের সমস্ত উদারতা সোচ্চারে ঘোষণা করে। সূর্য বললেন–মিষ্টি হাসির সুন্দরী আমার! তোমার পিতা, মাতা বা অন্য কোনও গুরুজন তোমার প্রভু নন কেউ; একটি কুমারী কন্যার ব্যক্তিসত্তা যে একান্তভাবেই স্বতন্ত্র–তস্মাৎ কন্যেহ সুশ্রোণি স্বতন্ত্ৰা বরবৰ্ণিনি। কেন জান? কন্যা শব্দটার মধ্যেই সেই স্বতন্ত্রতার বীজ লুকানো আছে। ক ধাতুর অর্থ কামনা করা, আর কন্যা শব্দটাও আসছে ক ধাতু থেকেই। ধাতুর অর্থ সত্য করে একটি কন্যা যে কোনও পুরুষকেই কামনা করতে পারে–সর্বান্ কাময়তে যস্মাৎ কমেধাতোশ্চ ভাবিনি। তুমি কন্যা, তুমিও তোমার অভীষ্ট পুরুষকে পছন্দ করতে পার, কামনা করতে পার। এখানে তুমি স্বতন্ত্র।
সূর্য একটি কুমারী কন্যার স্বাধীনতার কথা বলছেন এমন ভাষায়, যা এই আধুনিক সমাজেও কাম্য ছিল। আমরা একবিংশ শতাব্দীর দোরগোড়ায় বসেও এতটা আধুনিক হতে পারিনি। আমরা আমাদের কৌলীন্য, আমাদের তথাকথিত মর্যাদাবোধ এবং আমাদের স্বার্থ-প্রণোদিত ধারণা একটি কুমারী কন্যার স্বতন্ত্রতার ওপরে আরোপ করি। একবারও ভাবি না যে আমাদের আদরের কন্যাটি তার একান্ত আপন কুমারী-মনের স্বতন্ত্রতায় একটি পুরুষকে কামনা করতেই পারে। অবশ্য একই সঙ্গে স্বীকার করতে হবে যে, মহাভারতের প্রথম যুগে সমাজের পক্ষে শ্রেয়স্কর বিধি-নিয়মগুলি উপস্থিত থাকলেও একটি কুমারী কন্যার স্বাধীনতা ছিল আধুনিক কালের চেয়েও বেশি। অপিচ এই স্বাধীনতা এসেছে বৈদিক যুগের পরম্পরায়।
সূর্য বলছেন–আমার সঙ্গে মিলিত হলে তোমার কোনও অধর্ম হবে বলে আমি মনে করি না। আর আমিই বা সামান্য লৌকিক সুখের ইচ্ছায় তোমার সঙ্গে মিলিত হব কেন? তাছাড়া স্ত্রী এবং পুরুষ স্বভাবতই একে অপরের মিলনকামী, বরঞ্চ বিবাহ ইত্যাদি নিয়ম মেনে একেকটি স্ত্রী-পুরুষের পারস্পরিকভাবে একত্র বিশ্বস্ত থাকার ঘটনাটাই বিকার বলে মনে করা যায়–স্বভাব এয লোকানাং বিকারোন্য ইতি স্মৃতঃ।
সূর্য যে সমাজের রীতি-নীতির কথা কুন্তীকে শোনাচ্ছেন, সেই সমাজ মহাভারতের সমাজ থেকে অনেক পুরনো। সেখানে স্ত্রী-পুরুষের মিলন-বন্ধনের নিয়ম অনেক শিথিল। বিবাহের মধ্যে দিয়ে স্ত্রী-পুরুষের অবাধ মিলন নিয়ন্ত্রণ করার যে বিধি এবং প্রয়াস, তার সম্বন্ধে কুন্তী অবশ্যই অবহিত। সেই কারণেই তিনি বারবার আত্মীয়-স্বজন, বংশ এবং সমাজের নানা মর্যাদা তথা বৈধতার কথা তুলছেন। অথচ সূর্য সেই সামাজিক ধর্মাধর্মের কথা উড়িয়ে দিয়ে একটি কুমারী কন্যার অনন্ত স্বাধীনতার কথা বলছেন। সমাজে স্ত্রী-পুরুষের মিলন-বন্ধন যখন শিথিল ছিল, এই স্বাধীনতা সেই সময়ের। সূর্য দেবতা-পুরুষ এবং পুরাতন বৈদিক সমাজের প্রতিভূ বলেই তার মুখে এই কথা শোভা পাচ্ছে।
অথচ কুম্ভীর সময়ে আমরা কিন্তু তাকে এক যুগ-সন্ধির লগ্নে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখছি। সতীত্বের জন্য, কুমারীত্ব-হানির জন্য তার হাহাকার আছে, অথচ এক তেজস্বী স্বেচ্ছাচারী পুরুষের মুখে একটি কন্যার স্বেচ্ছানিয়ন্ত্রণের কথাও তিনি শুনতে পাচ্ছেন। একটি পুরুষের সঙ্গে মিলিত হবার ব্যাপারে একটি কন্যার ইচ্ছাই যে সব, তার পিতা, মাতা বা গুরুজনের যে সেখানে কিছুই বলবার থাকতে পারে না–ন তে পিতা ন তে মাতা গুরবো বা শুচিস্মিতে। প্রভবন্তি বরারোহে–এই রকম একটি অনবরুদ্ধ ব্যক্তি-স্বাতন্ত্রের কথা কুন্তী শুনছেন, কিন্তু তা সর্বাংশে অস্বীকার বা আত্মসাৎ করতে পারছেন না। কুমারীত্বহানির সমস্যা তাঁকে যে অত্যন্ত বাস্তবভাবে জর্জরিত করবে, এটা বুঝেই কুন্তী তার হাহাকারটুকু প্রকট করে দিয়েছেন–আমার এই শরীর দিয়েও আমি কিন্তু আমার কুমারীত্ব, সতীত্ব বজায় রাখতে চাই। কুন্তীর এই বাস্তব দুশ্চিন্তা সূর্য বুঝেছেন। সূর্য তাঁকে চিন্তামুক্ত করেছেন দেবতার ঐশ্বর্যে। বলছেন–আমার সঙ্গে মিলিত হবার পরে আবারও তোমার কন্যাভাব ফিরে পাবে–সা ময়া সহ সঙ্গম পুনঃ কন্যা ভবিষ্যসি। সেই সঙ্গে এক মহা-যশস্বী পুত্রেরও জননী হবে তুমি।
এই নিশ্চিত্ততার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের মিলন-প্রস্তাবে সামান্য উৎসাহী দেখতে পাচ্ছি কুন্তীকে। মনস্তত্ত্ববিদেরা বলেন–অধিকাংশ ধর্ষণের ক্ষেত্রে সঙ্গমকারী পুরুষকে প্রাথমিকভাবে যথেষ্ট বাধা দিলেও রমণীও শেষ পর্যন্ত স্বেচ্ছায় আত্মসমর্পণ করে। এসব ক্ষেত্রে পুরুষের শারীরিক বলের কাছেই রমণীর আত্মসমর্পণের তথ্য সবসময় প্রকট হলেও মনস্তত্ত্বের দৃষ্টিতে রমণীর মনকে শেষের দিকে কথঞ্চিৎ দুর্বল হতে দেখা যায়। কুন্তীর ব্যাপারটা আরও বেশি চমকপ্রদ। তিনি নিজেই দেবপুরুষকে ডেকেছিলেন কৌতূহলভরে। সামাজিকতা এবং কুলমর্যাদা শেষ পর্যন্ত তাকে পুরুষ-সংসর্গ থেকে নিবৃত্ত করলেও যে মুহূর্তে তাঁর কুমারীত্বের সংকট মুক্ত হয়ে গেছে, সেই মুহূর্তেই আমরা কুন্তীর মুখে সামান্য উচ্ছ্বাস লক্ষ্য করছি।
কুন্তী বলছেন–তমোনাশী দেবতা আমার! যদি তোমারই ঔরসে একটি পুত্র লাভ করি আমি,–যদি পুত্রো মম ভবের্তৃত্তঃ সর্বর্তমোনুদ–তবে সে যেন হয় ঠিক তোমারই মতো। তোমারই মতো সোনার বর্ম আঁটা গায়ে, তোমারই মতো সোনার কুণ্ডল-পরা। মহাবীর মহাযশস্বী। সূর্য বললেন–হবে হবে, তাই হবে। আমারই মতো কবচ-কুণ্ডলের অলংকার থাকবে তার গায়ে এবং সে দুটি তার মৃত্যু রোধ করবে চিরজীবন। কুন্তী সূর্যের কথা শুনে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ করে বললেন–দেবতা আমার! যেমনটি বললেন, তেমনি যদি হয়, তবে সম্পূর্ণ হোক আমাদের মিলন। যেমনটি আপনি চেয়েছেন, সেই অভীপ্সিত মিলনের মুহূর্ত নেমে আসুক এখনই–অস্তু মে সঙ্গমো দেব যথাক্তং ভগবংস্বয়া।
