কৌতুকপ্রবণ কুমারী কুন্তী সূর্যের উপরোধে এক মুহূর্তে যেন অতিশয় বুদ্ধিমতী এবং সচেতন হয়ে গেলেন। কুন্তী বললেন–আমার পিতা, মাতা এবং অন্যান্য গুরুজনেরা আছেন–তাদের অনীতি কাজ আমি করতে পারি না। পিতা-মাতা আমাকে এই শরীর দিয়েছেন, আমি নিজে এই শরীর তৈরি করতে পারি না। আমি হাজার চেষ্টা করলেও আমার দ্বিতীয় কুমারী–শরীর তৈরি করতে পারব না। অতএব যে পিতা-মাতা আমাকে শরীর দিয়েছেন–দেহস্যাস্য প্রভবন্তি প্রদানে–আমার এই শরীরের ওপর সমস্ত অধিকার তাদেরই। আমার মতো এক রমণী কী করতে পারে এখানে? আমার কাজ এবং কর্তব্য হল–তাদের দেওয়া এই কুমারী শরীরটি যাতে কোনও মতে রক্ষা করতে পারি–স্ত্রীণাং বৃত্তং পূজ্যতে দেহরক্ষা। আপনি ক্ষমা করুন আমাকে।
কুন্তী নিজের অক্ষমতা জানিয়ে সূর্যের কাছে সানুনয়ে আবার সেই পুরনো কথা বললেন। বললেন–আমি বালিকা বয়সে চপলতায় ঋষি-দত্ত মন্ত্রের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য আপনাকে কাছে ডেকেছি–ময়া মন্ত্রবলং জ্ঞাতুমাহূতত্ত্বং বিভাবসো। আমার অন্যায় হয়েছে আমি জানি। কিন্তু শুধু এক বালিকার চপলতা বলেই আপনি আমার এই দোষটুকু ক্ষমা করে দিতে পারেন–বাল্যালেতি তৎ কৃত্বা ক্ষমহসি মে বিভো।
সূর্য ঝটিতি প্রত্যুত্তর দিয়ে বললেন–বালিকা বলেই আমি এতক্ষণ ধরে তোমাকে অনেক সাধ সেধেছি–বালেতি কৃত্বানুনয়ং তবাহং–অন্য কেউ হলে তাকে কি এতক্ষণ ধরে আমি অনুনয় করে মিলন–প্রার্থনা করতাম–দদানি নান্যানুনয়ং লভেত? আমি আবারও তোমাকে বলছি–তুমি ছেড়ে দাও নিজেকে আমার হাতে। এতেই তোমার নিশ্চিন্ত, এতেই তোমার শান্তি। তুমি আমাকে সমন্ত্রে আহ্বান করেছ, অতএব তোমার সঙ্গে মিলন সম্পূর্ণ না করে আমি যাব না–অসমেত ত্বয়া ভীরু মাহুতেন ভাবিনি। সূর্য আবার ব্যক্তিগত সম্মানের প্রশ্ন তুললেন–তুমি তো তোমার বালিকার বয়স দেখিয়ে, বালিকার চপলতা দেখিয়ে অপরাধ ক্ষমা চাইলে। তুমি কি আমার কথা এতটুকু ভেবেছ। দেবতা-পুরুষ হয়েও, তোমার কাছে প্রত্যাখ্যানের সোপহাস বাক্য শুনেও আমি এতক্ষণ তোমাকে অনুনয় করে চলেছি। এরপরেও মিলনের বিফলতা নিয়ে আমি যদি এখান থেকে চলে যাই, তবে আমি যে সবার কাছে উপহাস্পদ হব। তুমি আমার এই করুণ অবস্থার কথা একটুও কি ভেবেছ? কাজেই যা বলছিলাম, তাই করো–সমস্ত ভয় অতিক্রম করে আমার সঙ্গে তুমি মিলিত হও। তাতে একদিকে যেমন তুমি আমারই মতো এক বীর পুত্র লাভ করবে, তেমনি অন্যদিকে, সমস্ত স্ত্রীলোকের মধ্যে অসাধারণী বলে পরিচিত হবে–বিশিষ্টা সর্বলোকে ভবিষ্যসি ন সংশয়ঃ। কেননা, মনুষ্য রমণীর গর্ভে কোনও দেবতা এমন সানুনয়ে পুত্র প্রদান করে?
.
৭৩.
দেবতা-পুরুষের অনুরোধ এবং উপরোধ এমন একটা চরম বিন্দুতে পৌঁছল যে, সহস্র বিনয় দেখিয়েও কুন্তী সূর্যকে বোঝাতে পারলেন না–অনুনেতুং সহস্রাশুং ন শোক মনস্বিনী। এদিকে রয়েছে অভিশাপের ভয়। সে শাপে যদি কুন্তী নিজে দগ্ধ হতেন, তাতেও দুঃখ ছিল না। সূর্য বলছেন–তার পিতা কুন্তিভোজ এবং সেই মুনি তার শাপের ফল ভোগ করবেন। নিজের ব্যক্তিগত অপরাধের জন্য তাঁর নিরপরাধ পিতা এবং তাঁর শুভদায়ী মন্ত্রদাতা মুনি–দুজনেই অভিশাপগ্রস্ত হবেন, এমনটি কুন্তী চান না। অন্যদিকে তার নিজের ভয়ও কিছু কম নয়। যে দেবতা-পুরুষকে তিনি কৌতুকের বশে কাছে ডেকেছিলেন, তিনি এখনও তার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন–সাহমদ্য ভৃশং ভীতা গৃহীতা চ করে ভূশম্। সঙ্গমলিন্দু এক দীপ্তিমান পুরুষের কাছে নিজেকে সম্পূর্ণ ছেড়ে দিতে হবে–এ কথা ভাবতে কুন্তীর কৌলীন্যবোধ, সামাজিকতা এবং আত্মমর্যাদা সব একত্র পুঞ্জীভূত হল। তিনি কেবলই ভাবতে লাগলেন–এক মুহূর্তের এক কৌতুক এবং ভ্রমের কাছে কী করে এক কুমারী-শরীরকে আহুতি দেওয়া যায়–কথং ত্বকাৰ্যং কুৰ্যাং বৈ প্রদানং হ্যাত্মনঃ স্বয়ম্।
একদিকে আত্মীয়স্বজন অন্যদিকে অভিশাপের ভয়–দুইই মাথায় রেখে কুন্তী তার এই সঙ্কট-মোচনের চেষ্টা করলেন প্রখর বাস্তব-বুদ্ধিতে, সূর্যের উপরোধে এতক্ষণে তিনি বুঝেছেন–দুর্বাসার মন্ত্র শুধু দেবসঙ্গমের মাধ্যমে তাকে কতগুলি অভীষ্ট পুত্র দান করতে পারে; কিন্তু মানব-জীবনের পরম অভীষ্ট একটি সংসার যদি তাকে লাভ করতে হয়, তবে কুমারীত্বই সবচেয়ে জরুরী এবং তার চেয়ে জরুরী তার ভবিষ্যৎ স্বামীর কাছে বিশ্বস্ত থাকা। হয়ত তাকেই সতীত্ব বলে।
কিন্তু তাঁর হাত ধরে দাঁড়িয়ে থাকা সূর্য-পুরুষের শুভবুদ্ধির কাছে আরও একবার নিজের অক্ষমতা নিবেদন করে বললেন–আমার আত্মীয়স্বজন, কুলজনেরা থাকতে আমার এই কাজে সমস্ত কুলাচার লঙ্ঘিত হবে–বিধিলোপো ভবেদয়। সমস্ত বিধি অতিক্রম করেও যদি বা এই অবৈধ মিলন ঘটেই যায়, তবে শুধু আমার জন্যই আমার পিতৃবংশের সমস্ত কীর্তি ধুলোয় মিশে যাবে–মন্নিমিত্তং কুলস্যাস্য লোকে কীর্তি-শেত্ততঃ। তবু সব কিছু বিসর্জন দিয়েও আমি আপনার অভীষ্ট সঙ্গমে লিপ্ত হব–যদি আপনি এই কাজটাকে ধর্ম মনে করেন–অথবা ধর্মমেতং ত্বং মনসে তপতাং বরঃ।
কুন্তীর সম্বোধনগুলো বড়ই শানিত হয়ে উঠছে। সূর্যকে তিনি বলছেন–তপতাং বরঃ। সাধারণভাবে সমগ্র জগৎকে তাপিত করেন বলে সূর্য তপন নামে প্রসিদ্ধ। কিন্তু এই মুহূর্তে তিনি কুন্তীর হৃদয়কে তাপিত করছেন। এরপরেই কুন্তী তাকে ডাকলেন–দুর্ধর্ষ বলে–অর্থাৎ যিনি অত্যন্ত দুঃখকরভাবে ধর্ষণের আচারে লিপ্ত হয়েছেন এবং যাঁকে কোনওমতেই অন্যায্য সঙ্গমকার্য থেকে বিরত করা যাচ্ছে না। কুন্তী বললেন–দুর্ধর্ষ দেবতা আমার! তবু আমি নিজেকে সঁপে দিতে পারি আপনার কাছে, কিন্তু সব কিছুর পরেও আমি সতী থাকতে চাই–আত্মপ্রদানং দুর্ধর্ষ তব কৃত্বা সতী বৃহম্।
