কুন্তীর সমস্ত অনুরাগ এখন চলে গেছে। সমাজ-বহির্ভূত এই অসামাজিক মিলনের মধ্যে যে বিপন্নতা আছে, সেই বিপন্নতাই এখন তাকে পেয়ে বসেছে। ওদিকে আস্কারা-পাওয়া যুবকটির মতো সূর্য আরও পরিষ্কার করে বললেন–তুমি কী চাও, আমি জানি। তুমি চেয়েছিলে আমারই মতো একটি পুত্র হোক তোমার গর্ভে–তবাভিসন্ধিঃ সুভগে সূর্যাৎ পুত্রো ভবেদিতি। তুমি চেয়েছিলে–সেই ছেলের শক্তিমত্তা হবে দুনিয়ার সমস্ত বীর–পুরুষের চেয়ে বেশি। আর দেখতেও হবে ঠিক আমারই মতো, ঠিক এমনই সোনার বর্ম আঁটা তার গায়ে, এমনই দুটি সুবর্ণ-কুণ্ডল তার কানে–বীর্যেণাপ্রতিমো লোকে কবচী কুণ্ডলীতি চ। কিন্তু এমন একটা পুত্র পেতে হলে তোমার শরীরের মূল্যটুকু যে দিতেই হবে। তুমি আমার হাতে নিজেকে ছেড়ে দাও–সা ত্বম্ আত্মপ্রদানং বৈ কুরুধ গজগামিনি। তুমি যেমনটি চেয়েছিলে সেইরকমই পুত্র হবে তোমার। তবে এর জন্য তোমার সঙ্গে মিলন সম্পূর্ণ করেই যেতে হবে আমাকে–তথা গচ্ছাম্যহং ভদ্রে ত্বয়া সঙ্গম সুস্মিতে।
পুত্র! পুত্র! পুত্র! কুণ্ডলী কবচী সূর্য-পুরুষকে দেখার সময় একবারও কি পুত্রের কথা ভেবেছিলেন কুন্তী? অথচ তার প্রকোষ্ঠে উপস্থিত হওয়ার পর থেকেই সূর্য শুধু পুত্র-পুত্র করে যাচ্ছেন। এর অর্থ একটাই। শারীরিক মিলন। সেকথা এখন সূর্যদেব বেশ স্পষ্ট করেই বলছেন। তুমি নিজেকে আমার হাতে সমর্পণ করো অথবা তোমার সঙ্গে মিলিত হয়ে তবেই আমি যাব–এই কথাগুলি পুত্রলাভের প্রক্রিয়ার মধ্যে পড়ে এবং সেই সব শব্দ এখন স্পষ্ট উচ্চারিত হচ্ছে। এর সঙ্গে আছে সঙ্গম-সহায় চাটুকারিতা-গজগামিনি, সুস্মিতা–এইসব মনভোলানো সম্বোধন। সব কিছু মিলিয়ে সূর্য–পুরুষের অগোপন বক্তব্য একটাই–শারীরিক মিলন। কিন্তু দুর্বাসার মন্ত্র-পরীক্ষার মধ্যে কুন্তীর কৌতূহল ছিল নিশ্চয়ই। এমনকি রক্তিম পুরুষকে দেখে তার প্রথম ভাল লাগাটুকুও হয়ত মিথ্যে নয়। কিন্তু এই যে পুরুষের আগমন মাত্রেই সঙ্গম-চিৎকার ধ্বনিত হচ্ছে, বার–বার পুত্রদানের ব্যঞ্জনায় যে শারীরিক মিলনের কথা প্রকট হয়ে উঠছে, কুন্তী কি এই চেয়েছিলেন?
সূর্যের অকপট সঙ্গমেচ্ছা প্রকট হয়ে উঠলেও কুন্তী যে এই বিষয়ে খুব আগ্রহ দেখালেন, তা মোটেই নয়। নিরুপায় সূর্যদেব এবার ভয় দেখালেন–তুমি যদি আমার কথা না শোন, আমার যা প্রিয় কার্য তা যদি না কর–যদি ত্বং বচনং নাদ্য করিষ্যসি মম প্রিয়–তবে তোমার পিতাকে এবং সেই ব্রাহ্মণের উদ্দেশে অভিশাপ উচ্চারণ করব আমি। তুমি নিজে আমাকে ডেকে এনেছ এখানে এবং তোমার এই অন্যায় আচরণের কথা তোমার পিতাঠাকুর জানেন না, অতএব তোমার এই অপরাধে তোমার পিতাকেই অভিশাপের আগুনে দগ্ধ করব আমি। তবে বাদ যাবেন না সেই ঋষি–ব্রাহ্মণও, যিনি তোমার স্বভাব–চরিত্র কিচ্ছুটি না জেনে তোমাকে এই দেব-সঙ্গমের রহস্য জানিয়েছেন–তস্য চ ব্রাহ্মণস্যাদ্য যোসৌ মন্ত্রমদাত্তব। ভাবটা এই–পুরুষের সম্বন্ধে রমণীর যে সাধারণ সংযমটুকু আকাঙ্ক্ষিত, সেই সংযম-স্বভাবের কথা না জেনে-বুঝে যিনি মন্ত্র দিয়েছেন তোমাকে, সেই ঋষিকে আজ আমি গুরুতর দণ্ড দেবশীলবৃত্তমবিজ্ঞায় স্যামি বিনয়ং পরম।
আমরা জানি, কুন্তী অন্যায়ভাবে তিরস্কার লাভ করছেন। আমরা জানি, সূর্যকে ডাকার সময় মন্ত্র পরীক্ষার কৌতুক ছাড়া আর কিছুই ছিল না এবং এই কৌতুক অতি স্বাভাবিক। আজকের আধুনিক কোনও যুবক-যুবতীকেও যদি এমন স্ত্রী-পুরুষ-বশীকরণের সিদ্ধমন্ত্র দেওয়া যায়, তবে তাঁরাও আগে মন্ত্রের শক্তি পরীক্ষা করার জন্য আকুলিত হবেন। কারণ মণি, মন্ত্র এবং ওষধির মধ্যে তথাকথিত চমৎকৃতির এমনই এক মন্ত্রণা আছে, যাতে লোকে মন্ত্রশক্তি পরীক্ষা করতে খুব তাড়াতাড়ি কৌতূহলী হয়। কুন্তীর ক্ষেত্রেও তাই হয়েছে। কিন্তু সূর্য যে কুন্তীর নিস্তব্ধতায় ক্রুদ্ধ হয়ে শেষ পর্যন্ত তার স্বভাব-চরিত্র নিয়ে গালাগালি দিতে লাগলেন অথবা তার পিতা এবং মন্ত্রদাতা ঋষিকে অভিশাপ দিতে চাইলেন, তার পিছনে কুন্তীর স্বভাব-চরিত্র যত বড় কারণ, তার চেয়ে অনেক বড় কারণ হল নিজের ব্যক্তিগত অপমান।
সাড়ম্বরে রমণীর দ্বারা আহত হয়ে নে পুরুষেরই বা প্রত্যাখ্যাত হতে ভাল লাগে? আসল কথাটা বলেই ফেললেন সূর্যদেব। বললেন–এই যে তুমি আমাকে ডেনে এনে, এখনই আবার। ফিরে যেতে বলছ, এতে কি আমার মান-সম্মান কিছু থাকছে? তাকিয়ে দেখ মুক্ত আকাশের দিকে। তোমাকে তো আমি দিব্যচক্ষু দিয়েছি, সেই চোখেই তো তুমি আমার স্বরূপ দেখেছ। এখন সেই চোখেই খোলা আকাশের দিকে তাকিয়ে দেখ! দেখতে পাবে–আমার স্বজন-বন্ধু দেবতারা, ইন্দ্র, যম, বরুণ–আমার সমানধর্মা এইসব দেবতা আমার প্রতি তোমার এই প্রত্যাখ্যান-ভাষণ শুনে মুখ লুকিয়ে মিটিমিটি হাসছেন–ত্বয়া প্রলব্ধং পশ্যত্তি স্মরন্ত ইব ভাবিনি। একজন দেবপুরুষ হওয়া সত্ত্বেও মনুয্যলোকের মরণধর্মা এক সাধারণ রমণীর কাছে। এই প্রত্যাখ্যানের অপমান কি কখনই সইবে? তার ওপরে এইসব দেবতা এখন চেয়ে চেয়ে মজা দেখছেন। আমার কি এতও সইবে?
কুন্তী চেয়ে দেখলেন আকাশের দিকে। দেখলেন–সত্যি দেবতারা আপন রূপে দীপ্যমান। কিন্তু তাঁরা দৃষ্টি রেখেছেন মর্ত্যলোকের এই ঘটনার দিকে। কুন্তী এবার সত্যিই লজ্জিত হলেন–সা তান দৃট্রা ব্রীড়মানের বালা। কিন্তু তাই বলে মনুষ্যলোকের সমস্ত সাবধানতা অতিক্রম করে সঙ্গে সঙ্গেই তিনি সূর্যের কাছে আত্মসমর্পণ করলেন না। অভিশাপের সমস্ত ভীতি অন্তরে চেপে রেখে কুন্তী বললেন–দেবতা আমার! আপনি আপনার বিমানে আরোহণ করুন। আমি একটি কুমারী কন্যা। আমার পক্ষে কুমারীত্ব বিসর্জন দিয়ে আপনার ঈপ্সিত শারীরিক মিলনের মধ্যে যাওয়া সম্ভব নয়–কন্যাভাবা দুঃখ এবোপকারঃ।
