কুন্তীও সূর্যের এই মূর্তি দেখতে পেয়েছেন–অঙ্গদী বদ্ধমুকুটো দিশঃ প্রজ্বালয়ন্নিব। আমরা মহাভারতের কবির বৈদিক রসবত্তা নষ্ট করে কখনই এই জ্যোতিমূর্তিকে নারায়ণ বলব না। বলব সূর্য। বলব এই কারণে যে, ঋগবেদে সূর্যের মতো কুলীন দেবতা আর কে আছেন? এমনকি অন্য সমস্ত বৈদিক দেবতাকেও সূর্যেরই বিভূতি বলে কল্পনা করা হয়। অধ্যাপক সীতারাম শাস্ত্রী সমস্ত বৈদিক মন্ত্রেরই সূর্যনিষ্ঠ ব্যাখ্যা করতে ভালবাসতেন। তাছাড়া সূর্য এমনই এক দেবতা, যিনি শুধু ভারতবর্ষ নয়, গ্রিস-রোম-মিশর এবং সমস্ত পুরাতন সভ্যতাতেই তার জয়কার সগৌরবে ঘোষিত। পরবর্তীকালের যে সমস্ত দেবতা প্রধান এবং কুলীন পর্যায়ে উন্নীত হয়েছেন, মিথলজিস্টরা তাদের সৌরমূল (Solar origin) আবিষ্কার করতে ব্যস্ত হন। আমরা তাই আশ্চর্য হয়ে লক্ষ্য করি, মহাভারতের কবি তাঁর সহস্র কল্পনায় বিকশিত মহাকাব্য রচনা করতে গিয়েও সমস্ত বৈদিক দেবতত্ত্বের মূল সূর্যকেই তাঁর প্রথমা নায়িকার নায়ক হিসেবে নির্বাচন করতে ভুল করেননি। এতে একদিকে যেমন তার পূর্বসূরি বৈদিক কবিদের প্রতি শ্রদ্ধা সূচিত হয়েছে, অন্যদিকে তেমনি সূর্যকে পুরুবিধ কল্পনা করে, তিনি তার মহাকাব্যের নায়িকাকে নায়ক নির্বাচনের সুযোগ খুঁজে নিয়েছেন।
সূর্যের কবচী-কুণ্ডলী সর্বোদ্ভাসী রূপ দেখে কুন্তী মুগ্ধ হলেন। দুর্বাসার দেওয়া মন্ত্রের প্রথম পরীক্ষা যদি করতেই হয়, তবে এই অসাধারণ দেবতার ওপরেই তার প্রথম প্রয়োগ করতে হবে বলে কুন্তীর মনে হল। প্রণাম-আচমন করে শুদ্ধ হয়ে কুন্তী দুর্বাসার দত্তমন্ত্র উচ্চারণ করলেন, আর তার অন্তরে ভাবিত হল সোনার বর্ম পরা, সোনার মুকুট আর সোনার কুণ্ডল পরা সূর্যের সেই দৃপ্ত রূপ। কুন্তী সূর্যকে নিজের কাছে আসার জন্য আহ্বান-শব্দ উচ্চারণ করলেন দুর্বাসার মন্ত্রে–আহ্বানমকরোৎ সাথ তস্য দেবস্য ভাবিনী।
মন্ত্রের শক্তি সঙ্গে সঙ্গে অনুভূত হল। জ্যোতির্ময় সূর্য–পুরুষ নিজেকে দ্বিধা বিভক্ত করলেন–যোগাৎ কৃত্বা দ্বিধাত্মান। তার জ্যোতিঃস্বরূপে তিনি তাপ বিকিরণ করতে থাকলেন আগের মতোই, আর তার পুরুষ–স্বরূপে তিনি রাজভবনের গবাক্ষপথে নেমে এলেন কুন্তীর কাছে। হিরণ্যবর্ণ, কানে কুণ্ডল, গায়ে সোনার বর্ম আঁটা, মাথায় বদ্ধমুকুট।
অবাক বিস্ময়ে কুন্তীর শরীর-মন মুকুলিত হয়ে উঠল। দুর্বাসার মন্ত্র এমন করে সত্যি হয়ে উঠবে, তিনি ভাবেননি। দেবপুরুষ সূর্য কুন্তীর সামনে এসে প্রথমে সম্ভাষণ করলেন–ভদ্রে। সম্বোধনটা অনেকখানি ফরাসিদের মাদামের মতো। প্রথম আলাপের দূরত্ব এবং ভদ্রতা দুই-ই এতে বজায় থাকে। সূর্য বললেন–ভদ্রে! আমি এসেছি তোমার কাছে। তোমার মন্ত্রের শক্তি আমাকে বাধ্য করেছে তোমার বশীভূত হতে–আগতোস্মি বশং ভদ্রে তব মন্ত্ৰবলাৎকৃতঃ। এই শব্দটা আমরা চিনি। বলাৎকার, বলাৎকৃত–এই সব শব্দের অর্থ এবং ভাবের মধ্যে ভালবাসার কোনও ব্যঞ্জনা নেই। ভাবটা এই–তোমার মন্ত্রই এই বলাৎকার ঘটিয়েছে, আমি স্বেচ্ছায় তোমার কাছে আসিনি। কী করতে হবে বল। যা বলবে, তাই করব–কিং করোমি বশশা রাজ্ঞি ব্রহি কর্তা তদস্মি তে।
কুন্তী কি এইরকমটি চেয়েছিলেন? প্রভাতসূর্যের রক্তিম কিরণ-কর-স্পর্শে যিনি রোমাঞ্চিত হয়েছিলেন, তিনি শুধু মন্ত্রের সত্যরক্ষার জন্য তার সঙ্গে মিলিত হবেন, এ যে তার কাছেও বলাৎকার। প্রেমের স্পর্শহীন এক দৈহিক ব্যায়াম। এমনটি তিনি চাননি। অন্তত তাঁর উম্মত রোমাঞ্চের প্রত্যুত্তর হতে পারে না এই যান্ত্রিকতা। অতএব সঙ্গে সঙ্গে দেবতা-পুরুষের সমস্ত স্তুতি-নতি-বশ্যতা প্রত্যাখ্যান করে কুন্তী বললেন–ভগব। অর্থাৎ পরম শক্তিমানের প্রতি নিতান্ত দুর্বলের দূরত্বের সম্বোধন। ভগবন! আপনি চলে যান এখান থেকে। যেখান থেকে আপনি নেমে এসেছেন এইখানে, সেইখানেই প্রত্যাবর্তন করুন আপনি–গম্যতাং ভগবংস্তত্র যত এবাগতত হ্যসি।
কুন্তী নিজের কুমারীত্বের কথাও স্মরণ করলেন বুঝি। অপরিচিত পুরুষ যদি প্রথম দর্শনেই রমণীকে বলে–আমি তোমার বশীভূত, যা বল, তাই করব, রমণী তখন নিজের লালিত কুমারীত্ব-হানির ভাবনা করে। হয়ত সেই ভাবনা মনে রেখেই কুন্তী বললেন–আমি নিতান্ত কৌতূহলে আপনাকে একবার শুধু ডেকেছিলাম। আপনি মনে কিছু করবেন না, ফিরে যান–কৌতূহলাৎ সমাহূতঃ প্রসীদ ভগবন্নিতি। এখানে সংস্কৃতের প্রসীদ শব্দটি বাংলা ভাষায় তর্জমা করলে ঈপ্সিত অর্থ পাই না। প্রসীদ শব্দটা বাংলার প্রসন্ন হোন-এর থেকে অনেক বেশি স্মার্ট। তাই কুন্তীর অনুরোধ বাংলায় সঠিক তর্জমা করলে দাঁড়ায়–প্লিজ! আপনি ফিরে যান, আমি শুধু একটু মজা করার জন্য আপনাকে ডেকেছিলাম।
যৌবনবতী এক সুন্দরী সানুরাগে এক পুরুষকে ডেকেছেন মজা দেখার জন্য। সে মজাও যেমন–তেমন মজা নয়, কুন্তীর সানুরাগ আহ্বানের মধ্যে দুর্বাসার দেওয়া সঙ্গম-মন্ত্র উচ্চারিত হয়েছিল। কোনও একক পুরুষকে কোনও যুবতী যদি সঙ্গমের বাসনা নিয়ে ঘরে ডেকে, সে যদি বলে–প্লিজ! আপনি বাড়ি যান, তবে সে পুরুষ আর প্লিজড় হয়ে ঘরে ফেরে না। কথাটাকে যুবতী-সুলভ সামান্য লজ্জা-মাত্র ভেবে পুরুষ তখন ভদ্রতার সম্বোধন ত্যাগ করে এবং দৃষ্টি দেয় রমণীর উচ্চাবচ শরীরে। আর ঠিক তারপরেই সে সূর্যের মতো করে বলে–যাব। যাব। নিশ্চয়ই যাব। ক্ষীণ–কটি সুন্দরী আমার তুমি যখন বলছ, তখন যাব একসময় নিশ্চয়ই–গমিষ্যেহং যথা মা ত্বং ব্রবীষি তনুমধ্যমে। কিন্তু দেবতা-পুরুষকে এমনি করে সানুরাগে ডেকে তাকে কি আর ফিরিয়ে দিতে আছে। নিজের ইচ্ছেটাকে কি এমন করে বিফল করে দেবেন তু দেবং সমাহুয় ন্যায্যঃ প্রেষয়িতুং বৃথা।
