দুর্বাসা যুবতী পৃথার কানে দেব-সঙ্গমের রহস্য-মন্ত্র উচ্চারণ করেছেন। বলেছেন–এই সিদ্ধ-মন্ত্রে তুমি যে দেবতাকেই কাছে ডাকবে, সেই তোমার বশীভূত হবে। পৃথা-কুন্তীর যুবতী-হৃদয়ে দেব-সঙ্গমের এই মন্ত্র অদ্ভুত এক তরঙ্গের সৃষ্টি করেছে। বারবার তার মনে হচ্ছে–সত্যি? এমনটি কি সত্যি হবে? আমি যে দেবতাকেই ডাকব, তিনিই আমার সামনে এসে দাঁড়াবেন? দুর্বাসামুনির মন্ত্রের এত শক্তি? পরক্ষণেই কুন্তী ভাবেন–লোকে তো আর মিথ্যে কথা বলে না। দুর্বাসার অভিশাপ অক্ষরে অক্ষরে ফলে যায়, আর আশীর্বাদ ফলবে না? তিরস্কারের শব্দ কষ্টকর হলেও তা যেমন সত্য, তেমনই ঋষির আশীর্বাণী মধুর শোনালেও তা সত্য ভাবতে সন্দেহ জাগে মনে–এইটুকুই যা দ্বিধা।
কুন্তীর যুবতী-হৃদয় বলে–অত-শত ভাবনার কী? দুর্বাসার মন্ত্র পরীক্ষা করে দেখলেই হয়। কুন্তীর বুদ্ধি বলে–খবরদার! সমাজের বিধিতে তোমার বিয়ে হয়নি এখনও। বিবাহের পূর্বে দিব্য মন্ত্রের কৌশলে মুহূর্তমাত্র দেব-সঙ্গমে কী সুখ তোমার? তার মধ্যে ভালবাসা নেই, প্রেমের সদাচার নেই, রসতার অনুশীলন নেই, শুধু কাম–মন্ত্রের সাধনায় পুত্র প্রসব করে কী আনন্দ তোমার? তাছাড়া কুন্তিভোজ কী বলবেন? বিবাহের পূর্বেই পুত্র প্রসব করে তোমার পালক পিতার কী গৌরব বাড়াবে তুমি? কুন্তীর যুবতী-হৃদয় মানে না। হৃদয় বলে–এত ভাবনার কী আছে? এই উত্তাল যৌবন তোর শরীরে। চিরকালের বসন্ত-বাতাস দোলা দিচ্ছে। মনে। মানুষের সঙ্গম তো দৃষ্ট-শ্রুত, প্রচলিত। কিন্তু ঋষির আশীর্বাদে আজ যখন কল্প-লোকের দেবতাদের সঙ্গম-রহস্য তোর করতলগত, তবে পরীক্ষা করে দেখতে ক্ষতি কী? ঋষি বলেছেন সকাম হোক আর অকাম হোক, দেবতা তোমার বশীভূত হবেন। তাহলে কুন্তিভোজকেই ভয় কী? দেবতা স্বর্গ থেকে খুঁয়ে নেমে আসেন কি না, এই পরীক্ষাটুকু সত্য হলেই যথেষ্ট। মন্ত্রগ্রামো বলং তস্য জ্ঞাস্যে নাতিচিরাদিব–তারপর ঐশীভূত দেবতাকে স্বর্গের পথে ফিরিয়ে দিলেই হবে।
কুমারী-যুবতীর হৃদয়ে দেব-সঙ্গমের অবিরল চিন্তা-ভাবনা, দ্বিধা দ্বন্দ্ব কুম্ভীর ঋতুভাব ত্বরান্বিত করল–এবং সঞ্চিন্তয়ী সা দদর্শর্তং যদৃচ্ছয়া। সামান্য একটু লজ্জাও হল কুন্তীর। বয়ঃসন্ধির প্রান্ত ভূমিতে এসে এতদিনও কুমারীর স্বচ্ছন্দতা উপভোগ করছিলেন তিনি। কিন্তু আজ এই কী মন্ত্র দিয়ে গেলেন ঋষি–অয়ং বৈ কীশনে মম দত্তো মহাত্মনা–কুত্তার মনের মধ্যে দেবপুরুষের কল্পিত সান্নিধ্য তার শরীরের মধ্যেও যে এক নতুন স্রোত বইয়ে দিল। কুন্তীর বড় লজ্জা হল–ব্রীড়িতা সাভবদবালা কন্যাভাবে রজস্বলা।
দ্বিধা-দ্বন্দ্ব-লজ্জা–সব কিছু মিলিয়ে সেই রাতটা কাটল। ঋতুর দিনও শেষ হল। পরের দিন সকালে তার ঘুম ভেঙে গেল খুব তাড়াতাড়ি। দেব-সঙ্গমের স্বাধীনতা এবং কৌতূহলে যে মন আকুল হয়ে আছে, সেই আকুলতা তাঁকে কোমল শয্যার মধ্যেই জাগরিত করে তুলল। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই প্রাতঃসূর্যের রক্তিম করস্পর্শ যুবতী কুন্তীর মুখে, গালে গণ্ডদেশে অনুভূত হল যেন। আজি এ প্রভাতে রবির কর, কেমনে পশিল প্রাণের পর। কুন্তী যেখানে শুয়ে থাকেন তার সামনেই বিশাল এক গবাক্ষপথ। রাত্রির দীর্ঘ-বিরহ অতিক্রম করে সূর্য যেমন আপন রক্তিম করস্পর্শে পূর্বদিবধূর গণ্ডদেশ রাঙিয়ে দেন, আজকে ঠিক তেমন করেই রাজভবনের দীর্ঘ গবাক্ষ-পথ দিয়ে প্রবেশ করে সূর্য তার প্রথম কিরণ-কর-স্পর্শে রাঙিয়ে দিলেন কুন্তীকে, তার কপালে এঁকে দিলেন রক্তিম চুম্বন।
এমন তো প্রতিদিনই হয়। কুন্তী খেয়াল করেন না। কিন্তু আজ তাঁর কাছে দেব-সঙ্গমের সমস্ত রহস্য উদ্ঘাটিত হয়ে যাওয়ায় মনুষ্য–কল্পনার প্রথম দেবতা সূর্য তার কাছে সম্পূর্ণ সজীব মূর্তিমান হয়ে ধরা দিলেন। আজ যেন বেদ–বেদান্তের সারাৎসার বহুশ্রুত সেই আলোক পুরুষটি, যাঁকে ধ্যানে জানতে হয়–ধ্যেয়ঃ সদা সবিতৃমণ্ডল-মধ্যবর্তী–তাকে যেন সম্পূর্ণ দেখতে পেলেন কুন্তী। মহার্ঘ্য শয্যায় শুয়ে-শুয়েই তিনি জ্যোতিষ্মন পুরুষের দিকে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন, তাঁর মন যেন সপুলকে অনুভব করল তাকে–তত্র বদ্ধমনোদৃষ্টিরভবৎ সা সুমধ্যমা।
রাত্রি দিনের সন্ধিলগ্নে উপস্থিত স্তিমিত এই সূর্যের দিকে তাকিয়ে থাকতে তার এতটুকু কষ্ট হল না। কুন্তী দেখতে পেলেন–এই পুরুষের গায়ে সোনার বরণ বর্ম আঁটা আছে, সুবর্ণ কুণ্ডল জ্বল জ্বল করছে দুই কানে–আমুক্তকবচং দেবং কুণ্ডলাভ্যাং বিভূষিতম্। হাতে সোনার কেয়ুর। গায়ের রঙ মধুর মতো পিঙ্গল। কুন্তীর মনে হল–দেবতা যেন হাসছেন তার আসঙ্গ-লিপ্সা বুঝতে পেরে–মধুপিঙ্গো মহাবাহুঃ কম্বুগ্রীবো হসন্নিব।
মহাভারতের কবির এই বিদগ্ধ-বর্ণনা শুনতে শুনতেই আমাদের কিন্তু মাথায় রাখতে হবে–কবি কিন্তু তাঁর পূর্বযুগের পরম্পরা নষ্ট হতে দেননি এখনও। বেদের মধ্যে আমরা সূর্যের স্বরূপ যেমনটি দেখেছি, তাতেও সমস্ত অভিরাম বর্ণনার মধ্যে সূর্যের একটা নায়কোচিত বিলাস বেশ ভাল করেই চোখে পড়ে। বৈদিক কবি সূর্যকে সুন্দরী ঊযার বসনাঞ্চলের প্রান্ত ধরে তারই পিছন পিছন সানুরাগে অনুগমন করতে দেখেছেন এবং তা ঠিক মনুষ্যলোকের অনুরাগী যুবক-যুবতীরই অনুকরণে–সূর্যো দেবীমুষসং রোমানাং/মর্যো ন যোবা অভ্যেতি পশ্চাৎ। মহাভারতের কবি তার মহাকাব্যের অন্যতম নায়িকাকে প্রথমেই মর্ত মানুষের হাতে ছেড়ে দিতে পারেননি। বৈদিক যুগের প্রাগ্রসর দেবতা-পুরুষ সূর্যের নায়কত্ব কল্পনা করে কবি এখানে বৈদিক যুগের ঐতিহ্য মেনে নিয়েছেন। কিন্তু সেই ঐতিহ্যের সঙ্গে তাঁর মহাকাব্যের কবি-কল্পনা মিশে গেছে। ইতিহাস-পুরাণের যুগে সূর্যের বৈদিক কল্প নারায়ণ-বিষ্ণুতে রূপান্তরিত হয়েছে। আমরা নারায়ণের ধ্যান করেছি সবিতৃমণ্ডলমধ্যবর্তী এক পুরুষ রূপে। তারও কানে সুবর্ণ-কুণ্ডল, মাথায় কিরীট, হাতে কেয়ূর–কেয়ূরবান্ কনককুণ্ডলবান কিরীটী/হারী হিরন্ময়বপুঃ।
