হয়ত এইসব সময়েই, বসন্তের বাতাসটুকুর মতো চপলতা কিছু ঘটে থাকবে। রুক্ষ-শুষ্ক ঋষি-হৃদয় কখনও হয়ত বিগলিত হয়ে কুন্তীর রাগের কারণ ঘটিয়ে থাকবে এইসব সময়েই। কিন্তু সব কিছু মিলিয়ে কুন্তীকে পাওয়া এবং সেইরকম করে না পাওয়া, তার পরিচর্যা লাভ করার অফুরন্ত সুযোগ এবং একইসঙ্গে এক যুবতীর হৃদয়-লাভে নিজের অযোগ্যতা এবং অন্যায়-বোধ–এই সব কিছু মিলিয়ে দুর্বাসার মুনি-হৃদয়ে এক অদ্ভুত মিশ্র ক্রিয়া তৈরি করেছিল। তিনি নিজে যাকে পাননি কিংবা পাবার মধ্যে যদি তার হীনমন্যতা কাজ করে থাকে, তবে সেই মানসিকতা থেকেই তিনি কুন্তীকে এমন একটি মন্ত্র দিয়েছেন, যাতে চিরকাল তিনি মর্ত-মানুযের অপ্রাপ্য থেকে যাবেন। তারই মতো রক্তমাংসের কোনও মানুষ কুন্তীর শরীর এবং হৃদয়ের অধিকার পান–দুর্বাসা এমনটি চাননি বলেই, তিনি তাকে একান্তভাবে দেবভোগ্য করে রাখলেন। অকামই হোন আর সকামই হোন, দেবতার রমণ-বিলাসে মানুষের বিকার থাকে না বলেই মানুষের কাছে তা কাম্য নয়। দুর্বাসা কুন্তীকে অন্য সীমন্তিনী রমণীদের অপ্রাপ্য মন্ত্র দিয়ে যতখানি নিজের অপ্রাপ্যতার শোক মেটালেন, তেমনই মানুষের অপ্রাপ্য বর দিয়ে–বরং বৃণীঘ কল্যাণ দুরাপান্ মানুযৈরিহ–কুন্তীকেও বুঝি মানুষের সুখ থেকে বঞ্চিত করলেন কিছুটা।
দুর্বাসার দুরূহ মনস্তত্ত্ব মনস্বিনী কুন্তীও যে মনে মনে একটুও বোঝেননি, তা মোটেই নয়। বরং তাঁর বোঝাটা আমরা বুঝি তার ব্যবহার দেখেই। কুন্তী বর চাননি, দুর্বাসা বর দিয়েছেন। কিন্তু বর-গ্রহণের জন্য কুন্তীর আকুলতা নেই এখনও তিনি একবার দুর্বাসাকে প্রত্যাখ্যান করেছেন, কিন্তু দ্বিতীয়বার আর তাকে প্রত্যাখ্যান করার সাহস পেলেন না–ন শোক দ্বিতীয়ং সা প্রত্যাখ্যাতুনিন্দিতা। দুর্বাসার মুখে দুরন্ত অভিশাপের ভয় কুন্তীকে নুইয়ে দিল ব্রাহ্মণ মহর্যির চরণে–তদা শাপভয়ানূপ। কুন্তী বললেন–উপদেশ করুন, মুনিবর! সেই দেবতাত্মানের মন্ত্র উপদেশ করুন আপনি। দুর্বাসা তার দক্ষিণ হস্তের অভয় মুদ্রা প্রসারণ করে অথর্ববেদের শেষভাগে অবস্থিত দেবতার বশীকরণ মন্ত্রগুলি শিখিয়ে দিলেন সুন্দরী কুন্তীকে–ততস্তামনবদ্যাঙ্গীং গ্রাহয়ামাস স দ্বিজঃ মন্ত্রগ্রামং ভদা রাজন্ অথর্বশিরসি স্থিত।
মহাভারতের কবির কাছে ধন্যবাদ লাভ করবেন দুর্বাসা মুনি। তাঁর হাজার দোষ থাকতে পারে, তার হৃদয়ে জ্বলতে পারে অফুরন্ত ক্রোধ, অভিশাপ নৃত্য করতে পারে তার জিহ্বার অগ্রভূমিতে, কিন্তু দুর্বাসা, দুর্বাসার শাপ কবিকুলের একান্ত সহায়-সাধন। দুর্বাসার অভিশাপ অধ্যাহার করে কালিদাস তাঁর অভিজ্ঞানশকুন্তলে যেমন চরম নাটকীয়তা সৃষ্টি করলেন, তেমনই দুর্বাসার আশীর্বাদ-মস্ত্রও মহাভারতের কবিকে তার মহাকাব্য-প্রসারণের সুযোগ এনে দিল। দুর্বাসার মন্ত্রবলে আমরা এর পরে মহাভারতের বিপরীত-নায়ক সহায় কর্ণকে দেখতে পাব। দুর্বাসার মন্ত্রবলে পঞ্চ-পাণ্ডবের অমর সৃষ্টি ঘটবে। আবার দুর্বাসার মন্ত্রবলেই কুন্তীকে আমরা এক দেবভোগ্যা রমণীর বিষামৃতরসে পদে পদে কষায়িত এবং রসায়িত হতে দেখব।
কুন্তীকে দেবাহ্বানের অমন্দ মন্ত্রবর্ণ দান করে দুর্বাসা কুন্তিভোজকে বললেন–রাজা! বড় সুখেই আমার সংবৎসর কাল কেটে গেল তোমার গৃহে। তোমার মেয়ের সেবা-পরিচর্যায় আমি পরম সন্তুষ্ট হয়েছি–উষিতস্মি সুখং রাজ কন্যয়া পরিতোষিতঃ। এবার আমার যাবার সময় হল–সাধয়িষ্যামহে তাবৎ। দুর্বাসা চলে গেলেন, আর কুন্তীর গুণপনা দেখে মুগ্ধ-বিস্মিত হলেন রাজা কুন্তিভোজ। দুর্বাসার মতো মূর্তিমতী বিপন্নতা কুন্তীর মনস্বিতা আর পরিচর্যার গুণে এমন স্বচ্ছন্দে শান্ত হয়ে যাবে, এমনটি তিনি ভাবেননি। স্তব্ধ বিস্ময়ে বার বার তিনি কুন্তীর প্রশংসায় পঞ্চমুখ হলেন–বভূব বিস্ময়াবিষ্টঃ পৃথাঞ্চ সমপূজয়ৎ। হয়ত তিনি বুঝলেন–পৃথা ছাড়া এ যাত্রায় তার বাঁচবার উপায়ই ছিল না।
.
৭২.
আগেই বলেছি, অশ্বনদী, যাকে আধুনিকেরা অশ্বথ-নদী বলে ডেকেছেন, ঠিক সেই নদীর ওপরেই কুন্তিভোজের রাজপ্রাসাদ। ভারতবর্ষের নদী-মানচিত্রে এই অশ্বনদীর কোনও আভিজাত্য নেই। ছোট্ট নদী কুলু-কুলু ধ্বনিতে চমতী নদীতে গিয়ে পড়েছে। চর্মতী গিয়ে পড়েছে যমুনায়। এমনিতে অশ্বনদীর জলে কোনও তরঙ্গ নেই। নেই উত্তাল আকুল কোনও চলোর্মির চাঞ্চল্য। কিন্তু যমুনার ভরা-জলে যখন জোয়ার-ভাটা খেলে, বর্ষার জলধারায় যখন যমুনা প্লাবিত হয়, তখন চমতীও ফুলে-ফেঁপে ওঠে, আর চমতীর সূত্র ধরে অশ্বনদীর মধ্যেও তখন ভীষণ চাঞ্চল্য দেখা যায়।
অশ্বনদীর ওপরে দাঁড়ানো কুন্তিভোজের রাজবাড়ির অলিন্দে আজ যে মেয়েটি একাকী দাঁড়িয়ে আছে, তার জীবনে কোনও তরঙ্গ ছিল না। এক রাজবাড়ি থেকে আরেক রাজবাড়িতে এসে তার জীবনে কোনও নতুন বৈচিত্র্য আসেনি। পিতা কুন্তিভোজ তাঁর দত্তক নেওয়া মেয়েকে যথেষ্টই ভালবাসেন, কিন্তু বৃষ্ণিরাজনন্দিনী তার পূর্ব জীবন এবং আধুনিক বয়ঃসন্ধির সমস্ত জটিলতার ঊর্ধ্বে উঠে এখনও এই রাজবাড়িকে সম্পূর্ণ অঙ্গীকার করে নিতে পারেননি। তার বৈচিত্র্যহীন জীবনে তার মনের গহনে পূর্ব-সঞ্চিত কতগুলি জটিল ভাবনাই শুধু বৈচিত্র্যের কাজ করে। কিন্তু আজকের দিনটি যেন একটু অন্যরকম। যমুনা-চমতীর উদ্বৃত্ত জল যেমন কোনও দিন অশ্বনদীর শান্ত জলের মধ্যে ঢুকে পড়ে তাকে চঞ্চল করে তোলে, তেমনি দুর্বাসা-মুনির মন্ত্র আজ তাকে উদ্বেলিত করে তুলেছে।
