আমরা জানি–কুন্তীর দিক থেকে এই কোপস্থানগুলি কী কী? অসময়ে আসা-যাওয়া, কিংবা ঋষির আসন-অশন-শয়নের উচ্ছঙ্খল আচরণ কুন্তীর ক্রোধ-ঘটনার কারণ নয়, অন্তত সে কথা আমরা বেশ জানি। সঙ্গে সঙ্গে এও জানি–কুন্তীর সৌন্দর্য ছিল অসামান্য। দুর্বাসার সেবাকাজে কুন্তীকে নিয়োগ করার আগে তার পালক পিতা কুন্তিভোজ পর্যন্ত তার রূপের জন্য তাকে সাবধান করেছিলেন। অথচ এই রূপ তিনি দুর্বাসার পরিচর্যা-তুষ্টিতে ব্যবহারও করেছিলেন। রূপ যেখানে সচেতনভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে, সেখানে সেবা-পরিচর্যার কোনও অবসন্ন মুহূর্তে এই রূপের দিকে দুর্বাসা কখনও ফিরেও তাকাবেন না, অথবা শুষ্ক-রুক্ষ মুনিচিত্ত কখনই সে রূপের আতপ্ত ছোঁয়ায় দলিত মথিত হবে না, এমন ভাবার কোনও কারণ নেই। বরং ধরে নিই, কোনও অসতর্ক মুহূর্তে অথবা কোনও অকারণের আনন্দে দুর্বাসা মুনির মন কুন্তীর প্রতি যদি কখনও সরস হয়েই থাকে অথবা ঘটে গিয়ে থাকে অশোভন চপলতা, তবে কুন্তীর দিক থেকে সেটা তাঁর রাগের কারণ হলেও সে রাগ তিনি সংযত করেছেন নিজের শৌচাচারের মহিমায়, সেই সরস চপলতা তিনি সযত্নে পরিহার করেছেন শিষ্যা, কন্যা এবং ভগিনীর ব্যবহারভূমিতে নিজেকে স্থাপন করে।
ঋষি দুর্বাসা সন্তুষ্ট হতে বাধ্য হলেন। কুন্তীর চরিত্র এবং ব্যবহার-কৌশলেই তিনি ধীরে ধীরে সন্তুষ্ট হলেন কুন্তীর ওপরে–তস্যাস্তু শীলবৃত্তেন তুতোষ দ্বিজসত্তমঃ। সন্তুষ্ট তিনি ছিলেনই, কিন্তু পরীক্ষা আর নিরীক্ষার মাধ্যমে যখন তার ব্যবহার আর চরিত্রের মধ্যে কোনই ত্রুটি খুঁজে পেলেন না মহর্ষি,–নাপশ্য দুষ্কৃতং কিঞ্চিৎ পৃথায়াঃ সৌহৃদে রতঃ–তখন এই যুবতী রমণীকে তিনি স্নেহের চোখে দেখতে বাধ্য হলেন। ততদিনে এক বৎসর পার হয়ে গেছে। মহর্ষির বোধহয় এবার যাবার সময় হয়ে এল।
কুন্তীর সেবা-পরিচর্যায় সম্বৎসর কেটে গেলে একদিন দুর্বাসা ঋজু হয়ে দাঁড়ালেন কুম্ভীর সামনে। প্রণাম-নম্ৰা কুন্তীর কেশ থেকে ফুল ঝরে পড়েছিল দুর্বাসার পায়ে। দুর্বাসা বলেছিলেন–তোমার সেবা পরিচর্যায় আমি পরম সন্তুষ্ট হয়েছি, ভদ্রে!–প্রীতেস্মি পরমং ভদ্রে পরিচারেণ তে শুভে। তুমি বর চাও। এমন বর, যা মানুষ কখনও পায়নি। এমন বর, যাতে সমস্ত সীমন্তিনী বধূরা ঈর্ষায় কাতর হবে তোমাকে দেখে–যৈত্বং সীমন্তিনীঃ সর্বা যশসাভিভবিষ্যসি।
কুন্তী প্রার্থনা–কাতর মানুষের মতো লোভে চালিত হলেন না। দুর্বাসার কথা শুনে শান্ত মনে বললেন–কিছুই আমার চাইবার নেই। আপনি সন্তুষ্ট হয়েছেন, আপনার সন্তুষ্টিতেই সন্তুষ্ট হয়েছেন আমার পিতা, আমি আর কোনও বর চাই না–ত্বং প্রসন্নঃ পিতা চৈব কৃতং বিপ্র বরৈমর্ম। কতদিন পর আজ আবার কুন্তিভোজকে পিতা সম্বোধন করলেন কুন্তী। আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে যে নির্মম আদেশ তার ওপরে নেমে এসেছিল, সেই আদেশ সম্পূর্ণ করার পরেই কুন্তিভোজকে পিতা সম্বোধন করার যুক্তি খুঁজে পেলেন কুন্তী। তাছাড়া ঋষি দুর্বাসার সামনে অন্তত কুন্তিভোজের পিতৃত্ব অস্বীকার না করে কুন্তী তার মর্যাদা রক্ষা করেছেন।
যাই হোক, কুন্তী যে দুর্বাসার কথা শোনামাত্রই লোভীর মতো বর চাইলেন না, তাতে দুর্বাসা বোধহয় খুশিই হলেন। বললেন–তুমি যদি একান্তই আমার কাছে কোনও বর নাই চাও, তবে আমি একটি মন্ত্র দিয়ে যাব তোমাকে। সেই মন্ত্রের বলে যে কোনও দেবতাকে আহ্বান করতে পারবে তুমি। শুধু তাই নয়, মন্ত্রের শক্তিতে যে দেবতাকেই আহ্বান করবে, তিনিই তোমার বশীভূত হবেন। তিনি তোমার প্রতি অকামই হোন বা সকামই হোন অর্থাং তোমাকে তিনি চান বা না চান, আমার মন্ত্রশক্তি তাকে তোমার ভৃত্যে পরিণত করবে—বিবুলো মন্ত্রসংশাতে ভবেদভৃত্য ইবানতঃ।
কী অদ্ভুত বরই না দিলেন দুর্বাসা! এক যৌবনবতী রমণীকে রাজেন্দ্রাণী হবার বর দেওয়া যেত, তাকে সসাগরা ধরিত্রীর ঐশ্বর্য-সম্পদে অভিষিক্ত করে রান করে দেওয়া যেত, কিন্তু ঋষি বর দিলেন–তুমি দেবতাকে বশীভূত করবে মন্ত্রবলে। তোমার প্রেমের ভৃত্য হবেন দেবতারা–তেন তেন বশে ভদ্রে স্থাব্যং তে ভবিষ্যতি। দুর্বাসার এই অতি মহান এবং অদ্ভুত বরের পিছনে এক অতি অদ্ভুত মনস্তত্ত্বও আছে বলে আমাদের মনে হয়। লোকচরিত্রের মহিমা এবং মনের গহন গতির সম্বন্ধে যদি সম্যক ধারণা থাকে, তবে বুঝবেন–যে সুন্দরী যুবতীকে দেখে আপনার ভীষণ পছন্দ হল, যাঁকে আপনি হৃদয়–প্রাণ দিয়ে ভালবাসবেন বলে ঠিক করলেন, দৈবক্রমে সেই যুবতী যদি আপনারই পরিচিত আরেকজনের কাম্য হয়ে ওঠেন, তিনি যদি তারই বধূ নির্বাচিত হন, তবে আপনার ভাল লাগবে না, হয়ত বা সহ্যও হবে না। অপরিচিত যারই সঙ্গে সেই রমণীর বিবাহ-সম্বন্ধ ঘটুক, আপনি তাতে অখুশি হবেন না, কিন্তু আপনার পরিচয়ের মধ্যে এই ঘটনা ঘটলে আপনার ভাল লাগবে না।
অন্তত এক বছর ধরে দুর্বাসা কুন্তীর কাছাকাছি ছিলেন একান্তে। তার সেবা-পরিচর্যা গ্রহণ করেছেন সাদর ঘনিষ্ঠতায়। আমরা দেখেছি–প্রথম দিকে দুর্বাসা যতই রাগ করুন, যতই ক্ষুব্ধ হোন, আস্তে আস্তে কুন্তীর গুণে নাকি রূপে?) তিনি মুগ্ধ হচ্ছিলেন। মহাভারতের কবির শব্দচয়ন লক্ষ্য করুন। তিনি বলেছেন–কন্যা-রমণীদের মধ্যে অনিন্দ্যসুন্দরী পৃথা মহামুনি দুর্বাসার প্রতি উৎপাদন করছিলেন–প্রীতিমুৎপাদয়ামাস কন্যারত্নমনিন্দিতা–এবং দুর্বাসাও আরও বেশি সময় কুন্তীর সাহচর্যে দিন কাটাচ্ছিলেন, যাতে কুন্তীর পরিচর্যা–স্পর্শ আরও বেশি করে পাওয়া যায় এবং সেদিকে মুনির আত্যন্তিক প্রয়াস তৈরি হচ্ছিল–অবধানে চ ভূয়োস্যাঃ পরং যত্নমথাকরো।
