কুন্তিভোজ কালবিলম্ব না করে পৃথা-কুন্তীকে সঁপে দিলেন দুর্বাসার হাতে–পৃথাং গরিদদৌ তস্মৈ দ্বিজায় দ্বিজবৎসলঃ। কুন্তিভোজ বললেন–এই আমার মেয়ে! বড় ছেলে-মানুষ! আর মানুষও হয়েছে বড় সুখে। যদি অন্যায় অথবা দোষ কিছু করে ফেলে, তবে মনে কিছু করবেন না–ন কাৰ্যং হৃদি তত্ত্বয়া। ও যথাসাধ্য আপনার সেবা করবে, আপনি সেই সেবা গ্রহণ করে কৃতার্থ করবেন ওকে। মুনি দুর্বাসা কুন্তিভোজের অনুরোধ আপাতত স্বীকার করে নিলেন সাধারণ ভঙ্গিতে–আচ্ছা সে দেখা যাবে। ঠিক আছে, ঠিক আছে–এইরকম কোনও উদাসীনতায়।
কুন্তিভোজ মুনির বসবাসের জন্য শ্বেতশুভ্র একটি গৃহের ব্যবস্থা করে দিলেন হংসচন্দ্রাংশুসঙ্কাশং গৃহমস্মৈ ন্যবেদয়ৎ। সেখানে থাকল একটি অগ্নিশরণ-গৃহ, যেখানে মুনির হোম-যজ্ঞের সুষ্ঠু ব্যবস্থা করে দেওয়া হল। সঙ্গে থাকলেন পৃথা। তিনি রাজপুত্রীর সমস্ত দম্ভ-মান ছেড়ে, নিদ্রালস্য ত্যাগ করে মুনির সেবা করতে লাগলেন–নিক্ষিপ্য রাজপুত্রা! তন্দ্রীং মানং তথৈব চ। কথায় বলে–দেবতার আরাধনা করতে হলে শম-দমাদি সাধনের দ্বারা নিজের অন্তঃকরণবৃত্তিকে দেবতার পর্যায়ে উন্নীত করতে হয়–দেবো ভূত্বা দেবং যজেত। কুন্তী এক ঋষির সেবায় নিজেকে উপযুক্ত করে তোলার জন্য নিজেকে শৌচ-নিয়ম-ব্রতের বাঁধনে এমনভাবেই বেঁধে ফেললেন–পৃথা শৌচপরা সতী–যে, তাঁকেও এই সময় ঋষি-মুনির মতো শান্ত লাগছিল–তোয়ামাস শুদ্ধেন মনসা সংশিতব্রতা।)
ঋষি-মুনির শুচিতা নিয়ে কুন্তী তার প্রয়াস চালিয়ে গেলেও দুর্বাসা তাতে খুশি হবেন–এ কথা ভাবার কোনও কারণ নেই। দুর্বাসা যে-সে মুনি নন। তাঁর আচার-ব্যবহার, ব্রত-নিয়মের মধ্যেও এমন এক স্বেচ্ছাচারিতা আছে, যা অন্যের পক্ষে দুঃসহ। বাইরে যাবার সময় দুর্বাসা কুন্তীকে হয়ত বলে গেলেন–আমি সকালেই ফিরব; কিন্তু তিনি ফিরলেন সন্ধ্যাবেলা, অথবা রাত্রে–তত আয়াতি রাজেন্দ্র সায়ং রাত্রাবথো পুনঃ। কুন্তী না খেয়ে না দেয়ে বসে আছেন, নানারকম খাবার–দাবার সাজিয়ে, অথচ দুর্বাসার ফেরার নাম নেই। ভক্ষ-ভোজ্য পড়ে রইল, আসন-শয্যা সবই প্রস্তুত রইল, কিন্তু মুনি এলেন না। আবার যখন ফিরলেন, তখন তিনি অজস্র গালাগালিও দেবেন পৃথাকে। তিনি বলবেন–এখন কি ঘুমোনোর সময়, যে শয্যা প্রস্তুত করেছ? এখন কি খাবার সময়, যে খাবার নিয়ে বসে আছ? অথচ মুনি কখন খাবেন, কখন শোবেন, তারও কিন্তু কোনও ঠিক নেই। এমন অসময়ে বাড়ি ফিরে এমন অসম্ভব খাবার চাইবেন তিনি, যা ভাবা যায় না। কিন্তু পৃথার ভাণ্ডার এমনই যে মুনি তাকে কিছুতেই অপ্রস্তুত করতে পারেন না। পৃথা-কুন্তী সব সময়েই প্রস্তুত। কিন্তু তিনি প্রস্তুত থাকলেও গালাগালির বিরাম নেই, আর অপ্রস্তুতির কথা তো ভাবাই যায় না–নির্ভৎসনাপবাদৈশ্চ তথেবাপ্রিয়য়া গিরা। পৃথা কোনও কথা বলেন না, মুনির এই অত্যাচার মুখ বুজে সহ্য করেন।
কিন্তু কারা সহ্য করেন এই ব্যবহার? গুরুর অত্যাচার শিষ্য বা শিষ্যা সহ্য করেন পিতার অমানবিক অত্যাচার পুত্র-কন্যারা সহ্য করেন, অথবা ভাইয়ের অত্যাচার সহ্য করে ভগিনী। অর্থাৎ রক্তের সম্বন্ধ আছে এমন জায়গায় অথবা বিদ্যালাভের প্রয়োজনে শিষ্য বা শিষ্যা যে অত্যাচার সহ্য করেন, পৃথা সেই অত্যাচার সহ্য করছিলেন বিনা কারণে। ঋষির কাছ থেকে পরম কোনও বিদ্যা লাভ করার বাসনা নেই তার। অথবা দুর্বাসা পিতা নন, ভাই নন, রক্তের সম্বন্ধের কেউ নন। কিন্তু সন্তোষণের বিধান এমনই দুরূহ কাজ, যেখানে পুত্র-কন্যার মমতা দিয়ে, শিষ্যের নম্রতা দিয়ে এবং ভাইয়ের জন্য ভগিনীর সহমর্মিতা দিয়ে পৃথা দুর্বাসার সমস্ত অত্যাচার হাসিমুখে মেনে নিচ্ছিলেন–শিষ্যবৎ পুত্ৰবচ্চৈব স্বস্বচ্চ সুসংযতা।
দিনের পর দিন, মাসের পর মাস স্তব্ধ হয়েও যে রমণী মমতা হারায় না, অতি বড় শত্রুও তার বশবর্তী হয়। দুর্বাসা আর যাই হোন, পৃথা-কুন্তীর শত্রু নন কোনও। নিস্তব্ধ আশ্রম ছেড়ে তিনি রাজবাড়িতে এসেছেন রাজার ধৈর্য পরীক্ষা করতে। কিন্তু রাজা যার মাধ্যমে এই ধৈর্যের পরীক্ষা দিলেন, তার কথা তিনিও তেমন করে ভাবেননি। তিনি ভীত–সন্ত্রস্ত হৃদয়ে তার কর্তব্য সেরেছেন সকাল-সন্ধ্যায় পৃথাকে সশঙ্কে জিজ্ঞাসা করে–পুত্রি! তোমার পরিচর্যায় ব্রাহ্মণ-ঋষি তুষ্ট হচ্ছেন তো–অপি তুষ্যতি তে পুত্রি ব্রাহ্মণঃ পরিচর্যয়া? পৃথা তাকে নিশ্চিত করে বলতেন–পরম সন্তুষ্ট। কোনও আশঙ্কার কারণ নেই। কিন্তু রাজবাড়ির সংস্রবচ্ছিন্ন সেই শ্বেতশুভ্র ভবনের মধ্যে যুবতী পৃথা কীভাবে মুনির সেবা-পরিচর্যা করে চলেছেন, তা শুধু তিনিই জানতেন। আর বোধহয় জানতেন সেই ঋষিও যিনি দিনের পর দিন এক অসামান্যা যুবতীকে শুধু ভৃত্যের পরিচর্যার মধ্যেই দেখেননি, দেখেছেন আরও সজীব কিছু।
কুন্তী এই ভয়ংকর অতিথিকে দেবতার শ্রদ্ধাটুকু দিয়েছেন–দেববৎ পৰ্য্যতোষয়ৎ–কিন্তু তার পরিচর্যা করেছেন শিষ্যের মতো, পুত্রের মতে, ভগিনীর মতো। আমরা জানি–সেই শ্বেতশুভ্র ভবনের একাকী-পরিচর্যার মধ্যে সুমধুর কোনও স্বেচ্ছা সম্পর্কের অবকাশ ছিল। হয়ত বা স্বেচ্ছা-ব্যবহার কুন্তীর দিক থেকে অনীতিতম হলেও, শুষ্ক-রুক্ষ মুনির দিক থেকে তা ছিল অনেক পাওয়ার মাঝে মাঝে কবে কখন একটুখানি পাওয়া। কিন্তু সেইখানে কুন্তী ছিলেন স্থির। ব্রাহ্মণের পরিচর্যায় তার মমতা ছিল, কিন্তু অস্থিরতা ছিল না। মহাভারতের কবিকে তাই সেই অসাধারণ উপমাটি ব্যবহার করতে হয়েছে–স্বস্বচ্চ সুসংযতা। জীবনের শেষ প্রান্তে গিয়ে কুন্তী যখন তার শ্বশুর ব্যাসদেবের কাছে নিজের পূর্ব-জীবনের সমস্ত স্বলন পতন ত্রুটির কথা উল্লেখ করবেন, তখন এই দুর্বাসার পরিচর্যা প্রসঙ্গও আসবে। কুন্তী তখন বলবেন–হৃদয়ের সমস্ত শুদ্ধতা এবং নিয়ম-ব্রতের শুচিতা দিয়ে আমি সেই মুনির সেবা করেছিলাম। মহর্ষি আমার সঙ্গে যে সব ব্যবহার করেছিলেন, তাতে আমার রাগ করবার অনেক কারণই ছিল, কিন্তু তবু আমি রাগ করিনি–কোপস্থানেপি মহৎসুকুপন্ন কদাচন।
