মহর্ষি শমীক পুত্রকে সম্পূর্ণ লজ্জা দিয়ে পরীক্ষিতকে সব জানানোর জন্য তার প্রিয় শিষ্য গৌরমুখ মুনিকে পাঠালেন, পরীক্ষিতের কাছে। শমীকের উদ্দেশ্য ছিল একটাই দেশের রাজা, যিনি এতকাল ধরে ব্রাহ্মণ-সজ্জনের প্রতিপালন করে এসেছেন, সেই তিনি যেন না ভাবেন যে, ব্রাহ্মণেরা তার বিপক্ষে চলে গেছেন। অপিচ ব্রাহ্মণদের পক্ষ থেকে যে আকস্মিক অভিশাপ নেমে এসেছে তার ওপর সে অভিশাপ যেন তার অজ্ঞাত না থাকে। অন্তত অভিশাপের সম্মুখীন হবার মতো মানসিক প্রস্তুতি যেন পরীক্ষিতের থাকে। শমীক সেই আশ্বস্ততাটুকু দিতে চেয়েছেন রাজাকে। এর মধ্যে যে অপমানটুকু রাজার পক্ষ থেকে মৃত সর্পের আকার নিয়ে এসেছিল তার কার্যকারণ সূত্র শমীক তাঁর অসীম ক্ষমায় ব্যাখ্যা করে নিতে পেরেছেন, কিন্তু সে ব্যাখ্যা তার পুত্রের কাছে অবোধ্য থেকে গেছে। মনে রাখতে হবে পরীক্ষিতের রাজত্বকালে কলিপ্রবেশ ঘটে গিয়েছিল। তার শেষ পরিণতিতে পরীক্ষিত স্বয়ং এক সচ্চরিত্র সজ্জন মুনিকে অপমান করে বসেছেন, সেই কলির প্রকোপ কিন্তু অন্যত্রও বেড়ে গিয়ে থাকবে। অর্থাৎ তার শাসনের মধ্যে সেই শক্তি বা সেই বাঁধন ছিল না, যা সমগ্র ব্রাহ্মণ সমাজকে ধরে রাখতে সক্ষম ছিল। শমীক নিজগুণে পরীক্ষিতের অপরাধ ক্ষমা করেছেন বটে, কিন্তু অন্যেরা তা পারছেন না। আর সেই সুযোগে অন্য জাতি-গোষ্ঠী যারা রাজার ওপর সন্তুষ্ট ছিল না অথবা পরীক্ষিতের দুর্বল শাসনে যারা মাথা তুলে দাঁড়ানোর সুযোগ পেয়েছে তারা এই বিক্ষুব্ধ ব্রাহ্মণ-গোষ্ঠীর সঙ্গে হাত মিলিয়েছে পরীক্ষিতকে সিংহাসন থেকে চ্যুত করার জন্য।
চলে আসুন এবার তক্ষকের কথায়। নাগরাজ তক্ষক নাগকুলের অন্যতম বিধ্বংসী ব্যক্তিত্ব। বিধ্বংসী তিনি একাই নন, আরও অনেকে আছেন তার সঙ্গে মহর্ষি শৌনক আমাদের মতোই জিজ্ঞাসা নিয়ে বসেছিলেন। নাগগোষ্ঠীর নানা কাহিনী শুনে আমাদের মতোই তার প্রশ্ন জেগেছে। কথক-ঠাকুর সৌতি উগ্রশ্রবার কাছে তিনি অনুযোগের সুরে বলেছেন, তুমি অনেক সর্প-কাহিনী শোনালে বটে, তবে তুমি কিছুতেই সর্পদের নাম বলছ না –পন্নগানাং তু নামানি নকীয়সি সূতজ। সাধারণদের কথা নাই বা বললে, অন্তত সর্প প্রধানদের নামগুলো বল তুমি। সৌতি বলতে আরম্ভ করলেন। সর্প প্রধানদের মধ্যে প্রথম নাম ইল শেষ নাগের, দ্বিতীয় নাম বাসুকির। তারপর ঐরাবত, তক্ষক, কালিয় ধনঞ্জয়, মণিনাগ, এলাপত্র, নহুষ, কৌরব্য, হস্তিপিণ্ড, ধৃতরাষ্ট্র, কুঞ্জর, হলিক ইত্যাদি।
সৌতি যত নাম করেছেন আমি তত করলাম না। আমার স্বার্থে আমি কতগুলি সর্প-নাম বেছে নিয়েছি যাঁদের সঙ্গে কুরু-পাণ্ডব বংশের অনেক রাজ-নামের মিল আছে। পন্ডিতেরা অনুমান করেন, যে ধৃতরাষ্ট্র-ধনঞ্জয় অথবা কৌরব্য-নহুষ–এই নামগুলি নাগ-গোষ্ঠীর প্রধানদেরই নাম বটে, কিন্তু এই নামগুলি এতটাই জনপ্রিয় বা সম্মানিত ছিল যে, কুরুকুলের অনেকেই সেই নামগুলি সচেতনভাবে এবং সসম্মানে গ্রহণ করেছেন। কথাটা একটু খুলেই বলি।
অসভ্যতা হলেও আপনি যদি এখনও কোনও বীরেন বা শশধর নাগকে তাঁর জাতির কথা জিজ্ঞাসা করেন, তাহলে বীরেনবাবু উত্তর দেবেন আমরা কায়স্থ; আর শশধরবাবু তার জাতির ইতিহাসটুকু আরও পূর্বে নিয়ে গিয়ে আপন পিতৃবংশের মাহাত্ম সূচনা করে বলবেন, আমরা বহু পূর্বে ক্ষত্রিয় ছিলাম, তবে এই শ্যাম বঙ্গ-দেশে আমরা কায়স্থ বলেই পরিচিত হয়েছি। বস্তুত বীরেন নাগ কি শশধর নাগ ‘শুদ্ধ-কৌলিক’ কায়স্থ, নাকি বাহাত্তুরে কায়স্থ’ –তা নিয়ে নানা বিবাদ বিসংবাদ আছে। এমনকি কায়স্থরা ক্ষত্রিয় জাতির অধস্তন কি না তা নিয়েও এক সময় বিশ্বকোষ রচয়িতা নগেন্দ্র নাথ বসু এবং বৈদ্য-কায়স্থ মোহমুদগরের লেখক উমেশচন্দ্র গুপ্তের উতোর চাপান বেশ ভাল রকম জমেছিল। আমি অবশ্য পরম সম্মানিত এই কায়স্থ জাতির মূল নিয়ে কোনও তর্কেই যাব না। কারণ আমি শুধু নাগ-বাবুদের নিয়ে চিন্তিত।
বঙ্গজ নাগরা কায়স্থ বা ক্ষত্রিয় যাই হোন না কেন, প্রাচীন ভারতের উত্তর, পশ্চিম এমনকি দক্ষিণেও নাগরা কিন্তু নিজেদের বংশ-মূল হিসেবে মহাভারতীয় বিখ্যাত নাগদের পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। দিল্লির একটি লৌহ স্তম্ভ লিপিতে চন্দ্র নামে এক নাগ রাজার নাম পাওয়া যায়। ঐতিহাসিকদের মতে তার পুরো নাম হয়তো চন্দ্রাংশ। পৌরাণিকেরা এই নাগদের বংশ পরিচয় দেবার সময় বড় গর্বভরে বলেছেন বিদিশার ভাবী নাগ-বংশের রাজাদের কথা শুনুন। এই বংশের শ্রেষ্ঠ রাজা ছিলেন চন্দ্রাংশ। তিনি শেষ নাগের পুত্র-শেষস্য নাগরাজস্য পুত্রঃ পর-পুরঞ্জয়ঃ।
যদি বলেন, পুরাণের কথায় বিশ্বাস করি না, ঐতিহাসিকরা তার থেকে ভাল। তাহলে বলতে হবে–বিদিশা অর্থাৎ এখনকার ভিলসার কাছাকাছি বেশনগর, পদ্মবতী (পদম পাওয়া), কান্তিপুরি আর মথুরায় নাগেরাই ছিলেন রাজা। কুষাণ রাজত্বের পরের দিকে তৃতীয়-চতুর্থ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে নাগরা উত্তর ভারত এবং মধ্য-ভারতে ভাল রকম আঁকিয়ে বসেছিলেন। সমুদ্রগুপ্ত থেকে স্কন্দগুপ্ত পর্যন্ত সবারই অনেক সময় গেছে এই নাগদের দাবিয়ে রাখতে। আর আমাদের বিখ্যাত দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্ত ইতিহাসের গৌরব যিনি বিক্রমাদিত্য বলে বিখ্যাত–তিনি বড় বুদ্ধিমান মানুষ। দাবিয়ে রাখার ঝামেলার থেকে এক নাগকন্যাকে বিবাহ করাটা তার কাছে অনেক বেশি শ্রেয় মনে হয়েছিল। এ বিষয়ে প্রমাণ চাইলে সময় মতো দেওয়া যাবে।
