কুন্তী বললেন–আমি যথাসাধ্য নিয়ম-নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিজেকে বেঁধে নিয়েই অভ্যাগত ব্রাহ্মণ-ঋষির সেবা করব–ব্রাহ্মণং যন্ত্রিতা রাজন্ উপস্থাস্যামি সেবয়া। এই বাক্যে যন্ত্রিত শব্দের অর্থ নীলকণ্ঠের মতে নিয়ন্ত্রিতা। আমরা বলি–শব্দটাকে যন্ত্রের অনুষঙ্গে ধরলেই বা ক্ষতি কী? রাজার আদেশ, রাজার নিয়োগ–অতএব যন্ত্রের মতোই তো কাজ করতে হবে কুন্তীকে। কুন্তী ভাষা ব্যবহার করেছেন যন্ত্রের যন্ত্রণা দ্ব্যর্থকতার মধ্যে আবদ্ধ করে। কুন্তী বললেন–তুমি যেমনটি তাকে কথা দিয়েছ, সেইভাবেই তার সেবা করব। বামুন-ঠাকুরদের যত্ন-আত্তি করার ব্যাপারটা তো আমার স্বভাবের মধ্যেই পড়ে। আর সেই সেবার মাধ্যমে তোমার প্রিয় কর্ম করাও যেমন হবে, তেমনই আমারও তো মঙ্গল হবে–তব চৈব প্রিয়ং কার্যং শ্রেয়শ্চ পরমং মম।
দুর্বাসার জন্য কী কাজকর্ম করতে হতে পারে এবং গৃহস্থ বাড়িতে তার অবস্থানের রীতি-পদ্ধতি কুন্তীর পূর্বাহ্নেই জানা আছে। আর জানা আছে বলেই কুন্তিভোজকে তিনি সমস্ত দুর্ভাবনা থেকে নিশ্চিন্ত করে বলেছেন–তিনি যেখানে ইচ্ছে যান, যখন ইচ্ছে বাড়ি ফিরুন–সকাল, সন্ধে, রাত্রে, রাত-দুপুরে–যখন ইচ্ছে বাড়ি ফিরুন–যদেবৈষ্যতি সায়াহ্নে যদি প্রাতরথো নিশি–তবু আমার ওপরে রাগ করার কোনও সুযোগই পাবেন না তিনি। এতক্ষণ কুন্তিভোজের মুখে অনাত্মীকরণের যে সূক্ষ্ম ইঙ্গিতগুলি কানে শুনেছেন কুন্তী, এবার তিনি তা ফিরিয়ে দিচ্ছেন ততোধিক সূক্ষ্মতায়। কুন্তী বললেন–তোমার আদেশ যেমন পেয়েছি, রাজা। আমি সেই আদেশ অনুযায়ী তোমার হিত সাধন করব। তুমি একেবারে নিশ্চিন্ত থাক–বিশ্রক্কো ভব রাজেন্দ্র–তোমার বাড়িতে থাকাকালীন তার অন্তত এতটুকু অসুবিধেও হবে না। অন্তত আমার দিক থেকে আমি আমার যথাসাধ্য চেষ্টা করব, যাতে ঋষিমশাইও খুশি হন, আর তোমারও যাতে ভাল হয়। তুমি নিশ্চিন্ত হও–আমি চেষ্টা করব–যতিষ্যামি তথা রাজন্ ব্যেতু তে মানসো জ্বরঃ।
মনে রাখা দরকার, কুন্তী বিদগ্ধা রমণী। তিনি জানেন যে, তার কালের সমাজে নমস্য ব্রাহ্মণ ঋষিদের সন্তুষ্টির ওপর যে কোনও রাজার মঙ্গলামঙ্গল নির্ভর করে। ব্রাহ্মণরা সন্তুষ্ট হলে অনুকূল জনমত তৈরি হয়, অনুকূল জনমত তৈরি হলে যে কোনও রাজার অস্তিত্ব এবং রাজত্ব দীর্ঘস্থায়ী হয়। আর যদি ব্রাহ্মণরা রাষ্ট্রের প্রতিকূল হন, তবে রাজার দিক থেকেও বিপরীত এক বিপ্লবের আশঙ্কা থাকবে। কুন্তী এই কথাগুলি জানেন–তারণায় সমর্থাঃ সু বিপরীতে বধায়। চ। বস্তুত তখনকার দিনের রাজারা যতই স্বৈরাচারী বলে পরিচিত হন না কেন তাদেরও একটা অ্যাকাউন্টেবিলিটি ছিল এবং সেই দায়বদ্ধতা সমাজের সবচেয়ে শিক্ষিত সম্প্রদায়ের কাছে।
আপনারা লক্ষ্য করে দেখবেন–রাজবাড়িতে ব্রাহ্মণরা অথবা ঋযিরা যেমন নানা সময়ে সদুপদেশ দেবার জন্য আসেন, তেমনি অনেক সময় তারা এসে এমন এমন সব অবাস্তব কাণ্ডকারখানা আরম্ভ করেন, কখনও বা অন্যায় অসভ্য ব্যবহার করে এমন সব ধুন্ধুমার কাণ্ড বাধিয়ে বসেন, যাতে মনে হবে ব্রাহ্মণ-ঋষিদের মতো অত্যাচারী জীব আর পৃথিবীতে নেই। আমাদের ব্যক্তিগত মতে এই অপব্যবহার-অত্যাচারের একটা অন্য তাৎপর্য আছে। আসলে স্বৈরাচারী রাজাকেও এঁরা সাময়িকভাবে অতি সাধারণ পরিশ্রমী মানুষের পর্যায়ে নামিয়ে এনে সাময়িকভাবেই তাদের ঐশ্বর্যের মোহমুক্তি ঘটান। একজন রাজা যখন ঋষি ব্রাহ্মণের জন্য চাকরের মতো খাটেন, একজন রাজপুত্র যখন তার ব্রাহ্মণ-গুরুর তুষ্টির জন্য তার অযৌক্তিক আদেশ শিরোধার্য করেন, একজন ঐশ্বর্যবান পুরুষ যখন তার অভিমান-মঞ্চ থেকে নেমে এসে ব্রাহ্মণের পাদজে আপন শির পবিত্র করেন, তখন রাজা, রাজপুত্র বা সমেশ্বর্যশালী পুরুষকে নেমে আসতে হয় মাটির ধুলোয়। তাকে প্রতিষ্ঠা পেতে হয় সাধারণ মানুষের সম-মাহাত্ম্যে। ব্রাহ্মণ-ঋষির অযৌক্তিক অপব্যবহার এবং অত্যাচারের তাৎপর্য এইখানেই। নইলে, দুর্বাসা, অগস্ত্য, বিশ্বামিত্রের খামখেয়ালিপনা গল্পকথা মাত্র।
ব্রাহ্মণদের এই সামাজিক শিক্ষকতার ভূমিকা সম্বন্ধে কুন্তী সম্পূর্ণ অবহিত। কুন্তী বলেন–আমি তাদের যথেষ্ট চিনি বলেই তাকে তুষ্ট করব অবশ্যই–সাহমেদ বিজানী তোষয়িয্যে দ্বিজোত্তমম্। যেমনটি তুমি তাকে আশ্বাস দিয়েছ, আমি সেইভাবেই তাকে তুষ্ট করব। রাজা যদি অপরাধ করেন তবে ব্রাহ্মণরা তার অমঙ্গলের কারণ ঘটাবেন, সেটা আমি জানি বলেই, অন্তত আমার জন্য যাতে তোমার কোনও সমস্যা না হয়, সে ব্যাপারে আমি সযত্ন থাকবন মকৃতে ব্যথাং রাজ প্রাঙ্গ্যসি দ্বিজসত্তমা।
মহারাজ কুন্তিভোজের কাছে এই সম্পূর্ণ বক্তব্য নিবেদন করার সময় কুন্তী একবারের জন্যও তাকে পিতা বলে ডাকেননি। কথারম্ভ থেকে কথা–শেষ পর্যন্ত সেই একই কৃত্রিম সম্বোধন–রাজ অথবা রাজেন্দ্র, অথবা নরেন্দ্র। কুত্তিভোজও নিজের এই কৃত্রিমতা বুঝেছেন বলেই কুন্তীর বক্তব্য শেষে তিনি তাকে জড়িয়ে ধরেছেন–পরিষজ্য সমর্থ চ। আসলে কুন্তিভোজকে কুন্তী একবারও বুঝতে দেননি–কোথায় তার লাগছে? কুন্তিভোজের কথা তিনি এমন সহমতে মেনে নিয়েছেন, কুন্তিভোজের শুভৈষণায় তারই প্রতিজ্ঞাত কর্তব্যকর্মগুলি এমনভাবেই তিনি সম্পূর্ণ করে দেবার আশ্বাস দিয়েছেন যে, তিনি একবারও বুঝতে পারলেন না–তার কোন্ অসচেতন আচরণ, কোন্ অসতর্ক শব্দ এই যুবতী-হৃদয়ের গভীরে ক্রিয়া করল।
