কুন্তিভোজ এতক্ষণ যা বলছিলেন, তা ছিল সাধারণ উপদেশের মতো। কিন্তু এই এক্ষুনি যে কথাটা বললেন সেটা তো সাধারণ কোনও কথা নয়। মহাভারতের অন্যতম এক বিদগ্ধা নায়িকা এই মধুর উপদেশের মধ্যে কোনও ইঙ্গিত খুঁজে পাবেন না, এমনটি হয় নাকি? হঠাৎ এই মন্দ-নীচ বংশের কথাটা আসল কেন? কুন্তীকেই কি কুন্তিভোজের বাড়িতে অতিরিক্ত আচার-নিয়মের প্রগ্রহে রাখা হয়েছে? কুন্তিভোজের ইঙ্গিত খুব স্পষ্ট। অর্থাৎ নিয়ম-আচারের শৃঙ্খলের মধ্যে থেকেও দোষ বা চপলতা যদি কিছু ঘটে, তবে সেই দোষ অবশ্যই চেপে যাবে সেই বীজী বংশের ঘাড়ে! আরও পরিষ্কার করে বলা যায়– কুন্তিভোজ প্রসিদ্ধ বৃষ্ণিকুলকে এখন যতই ভাল-ভাল কথা বলে সাধুবাদ দিন, তেমন তেমন দোষের কিছু ঘটলে কুন্তিভোজ অনাত্মীকরণের সুযোগ ছাড়বেন না। তিনি disown করবেন এবং উপরি মন্তব্য সেই অনাত্মীকরণের গৌরচন্দ্রিকা। কুন্তী এসব কিছুই বোঝেন না।
কুন্তিভোজ তাঁর এই অদ্ভুত মন্তব্য ততোধিক অদ্ভুত তৎপরতায় মিশিয়ে দিয়েছেন চাটুকারিতার মধুভাষে। দুর্বাসার যথেচ্ছ ব্যবহার সহ্য করার ব্যাপারে যিনি সবচেয়ে কাজের হবেন, তাকে এক লহমার মধ্যে ভাবতে কুন্তিভোজের সময় লাগেনি। কিন্তু একটি যুবতী মেয়ে, যাঁকে তিনি নিজের মেয়ে বলেই মনে করেন, তার দিক থেকে এই কাজের সমস্যা কত তার সম্বন্ধে কুন্তিভোজ ওয়াকিবহাল আছেন যথেষ্টই। কিন্তু পৃথার অপূর্ব রূপ যে তার নিজেরই সমস্যা তৈরি করতে পারে এবং সেই সমস্যা হলে কুন্তিভোজের প্রসিদ্ধ রাজকুলও যে এক ভয়ঙ্কর আবর্তের মধ্যে পতিত হবে সেই সম্বন্ধেও কুন্তিভোজের বক্তব্য, মন্তব্য দুইই আছে।
.
৭১.
মহারাজ কুন্তিভোজ তার যুবতী কন্যাকে দুর্বাসার সেবায় লাগালেন বটে, কিন্তু কন্যার যৌবন–=সন্ধির কারণে তার বিশেষ দুশ্চিন্তা রয়ে গেছে। কুন্তীর অলোকসাধারণ রূপলাবণ্য তাকে যে শমপ্রধান এক মহর্ষিরও অতি কাম্য করে তুলতে পারে, সে সম্বন্ধে কুস্তিভোজর সম্যক ধারণা আছে। কিন্তু অভ্যাগত মুনিকে তো আর গিয়ে বলা যায় না যে,–দেখবেন আপনি একটু সাবধানে চলবেন। যৌবনবতী কন্যা আমার, তার যেন কোনও ক্ষতি না হয়। এ কথা অতিথিকে বলা যায় না বলেই কুন্তিভোজ কন্যা কুন্তীকেই সাবধান করে বললেন–পৃথা! রাজবংশে তোর জন্ম মা! তোকে দেখতেও যে ভারি সুন্দর–পৃথে রাজকুলে জন্ম রূপঞ্চাপি বাদ্ভূতম্।
তিনি যে দেখতে সুন্দরী, সে কথা কুন্তীর অজানা নয়। পুরুষ মানুষের চোখ, সাধারণ জনের সপ্রশংস সম্ভাষণ এবং অন্য যুবতী-=-জনের ঈর্ষায় প্রত্যেক সুন্দরীই যেমন নিজের সৌন্দর্য সম্বন্ধে সচেতন হয়, কুন্তীও তেমনি নিজের সম্বন্ধে সচেতন। তিনি যে বৃষ্ণি রাজকুলের জাতিকা সে সম্বন্ধেও তাঁর সচেতনতা যথেষ্ট। কিন্তু এই সচেতনতা তো কুন্তিভোজের থাকবার কথা নয়। তিনি বৃষ্ণি–রাজকুলের এক বালিকাকে নিজের মায়ায় মানুষ করে যুবতীটি করে তুলেছেন। কিন্তু তাকে আজ এই আকালিক পৃথা সম্বোধন কেন? এই নামে তো তাকে চেনেন শুধু আর্যক শূরের বাড়ির লোকেরা। দুর্বাসাকে তুষ্ট করার প্রক্রিয়ায় এমন–সেমন যদি কিছু ঘটে, কুন্তিভোজ কি তার দায় গ্রহণ করবেন না বলেই পূর্বাহ্নেই তিনি কুন্তীর জন্ম–সম্বন্ধ স্মরণ করাচ্ছেন? তিনি একবারও বললেন না–অন্যথা কিছু ঘটলে–তুমি আমার মেয়ে–আমার সম্মান যাবে। বললেন–পৃথা! অর্থাৎ সেই শূর–=বংশের নাম–পৃথা! তোমার জন্ম রাজকুলে অর্থাৎ সেই বংশের মেয়ে হয়েও অন্য কিছু ঘটলে, আমার বংশের সম্মান যাবে–কৃৎস্নং দহ্যেত মে কুল–আমার বংশ ছারখার হয়ে যাবে।
কুন্তিভোজের কথা থেকে বোঝা যায়–কুন্তীর অন্যায় যদি কিছু ঘটে–সে অন্যায় তাঁর রূপের জন্যই হোক, অথবা তার রাজবংশের সচেতনতায় দম্ভ-অহংকারের জন্যই সে অন্যায় ঘটুক–অন্যায় যদি কিছু ঘটে, তবে সে তার মূল বংশের দোষ, কিন্তু সে অন্যায়ের ফল যেহেতু কুন্তিভোজকেই ভুগতে হবে, অতএব তিনি সাবধানবাণী উচ্চারণ করছেন কুন্তীর পুরাতন বংশের নামেই–পৃথা! রাজকুলে তোর জন্ম, তোর রূপেরও কোনও অভাব নেই। তবে দুর্বাসাকে তুষ্ট করতে হলে তোকে তোর বংশের গৌরব ত্যাগ করে, রূপের অহংকার ত্যাগ করে–সা ত্বং দর্পং পরিত্যজ্য দম্ভং মানঞ্চ ভাবিনি–তার সেবা করতে হবে। তবেই তোর মঙ্গল হবে, মা! কিন্তু কোনওভাবে তিনি যদি অসন্তুষ্ট হন, তবে আমার বংশের যে সর্বনাশ হবে, মাকোপিতে চ দ্বিজশ্রেষ্ঠে কৃৎস্নং দহেত মে কুলম্।
কুন্তী সব বুঝলেন। যিনি মথুরার অন্যতম বৃষ্ণি গোষ্ঠীর নেতা আর্যক শূরের মেয়ে, যিনি কংস-রাজার বিরোধী গোষ্ঠীর শ্রেষ্ঠ নেতা বসুদেবের ভগিনী, তিনি সমস্ত কথার ইঙ্গিতই বোঝেন। মহারাজ কুন্তিভোজের সমস্ত ইঙ্গিত অন্তরে রেখে মনস্বিনী কুন্তী এবার জবাব দিলেন। ভারি আশ্চর্য! কুন্তী পিতার সম্বোধনে কথা আরম্ভ করলেন না। বললেন–রাজন! রাজেন্দ্র! ভাবটা এই-দুর্বাসা মুনির মতো এক সুলভকোপ মহর্ষিকে সেবা করার জন্য যে শুষ্ক দায়িত্বভার কুন্তীর ওপর চাপালেন কুন্তিভোজ, সে দায়িত্ব প্রায় রাজকার্যের অঙ্গ। মুনির স্বভাব সম্পূর্ণ জেনেও এক পিতা তার দয়িতা কন্যার ওপরে এই দায়িত্ব চাপাতেন না। কিন্তু কুন্তিভোজ তার সঙ্গে কোনও পরামর্শ না করেই যে দুর্বাসার কাছে কুন্তীর নাম উচ্চারণ করে তাকে ঋষির সেবায় নিযুক্ত করে দিলেন, এই ব্যবহার রাজার মতো। কুন্তীও তাই প্রথমে সাড়া দিলেন রাজকার্যের ইতিকর্তব্যতায়।
