কুন্তিভোজ বললেন– বাছা! প্রসিদ্ধ বৃষ্ণিবংশে তুই জন্মেছিস। মহারাজ আর্যক শূরের তুই প্রথম মেয়ে– বৃষ্ণীনাং চ কুলে জাতা শূরস্য দয়িতা সুতা। তোর জন্মদাতা পিতা আর্যক আমার কাছে কথা দিয়েছিলেন যে, তাঁর প্রথম সন্তানকে তিনি আমার হাতে তুলে দেবেন। তিনি প্রতিজ্ঞা পালন করেছেন। তিনি সানন্দে তাঁর অগ্রজাতা কন্যাটিকে আমার হাতে তুলে দিয়েছেন– দত্তা প্রীতিমতা মহং পিত্রা বালা পুরা স্বয়ম্। তিনি সপ্রতিজ্ঞ উচ্চারণে সানন্দে তার কথা রেখেছিলেন আজ তুই আমার মেয়ে তেনাসি দুহিতা মম।
একজন পিতা, যিনি পূর্বে কোনওদিন সন্তানের মুখে বাবা ডাক শোনেননি, পত্নীর প্রথম গর্ভসঞ্চারে যিনি কুমারসম্ভবের গান শোনেন, সেই পিতা নিজের দয়িতা কন্যাকে তুলে দিয়েছেন অন্যের হাতে? এ কথা শুনে কুন্তীর কান কি জুড়িয়ে যাবার কথা। না হয়, কুন্তিভোজ তার পিতার ভাই এবং বন্ধুও, তবু সেই জন্মদাতা পিতা সানন্দে অন্যের হাতে দত্তক দিলেন তাঁর প্রথমজাতা কন্যাটিকে? কথাটা শুনলেই যেন সৃষ্টিলুপ্তির হাহাকার জাগে মনে, কুন্তীর মনেও কি সেই হাহাকার জাগল না? বাবা হয়ে অনেক্ট হাতে তুলে দিলাম– তাও না হয় বোঝা গেল–পূর্বকৃত প্রতিজ্ঞার পীড়ন ছিল। কিন্তু সানন্দে দত্তা প্রীতিমতা মহ্যম? কুত্তীর হৃদয় চূর্ণ হল না?
কুত্তিভোজ বললেন– তুই তো যে সে মেয়ে নোস, মা। তুই আর্যক শূরের মেয়ে, বসুদেবের বোন তুই। যেমন প্রসিদ্ধ কুলে তুই জন্মেছিস তেমনই এক প্রসিদ্ধ কুলে প্রতিপালিত হয়েছিস। এ যেন এক সুখ থেকে আরেক সুখের মধ্যে এসে পড়েছিস, এক মহাহ্রদ থেকে আরেক মহাহুদে সুখাৎ সুখমনুপ্রাপ্তা হুদাদ হ্রদমিবাগতা।
আমরা জানি কুন্তী যখন কুন্তিরাষ্ট্রে যৌবনবতী হয়ে উঠেছেন, তখনই মহামতি বসুদেব মথুরার রাজনীতিতে কেউকেটা হয়ে উঠেছেন। কংসের মন্ত্রিসভার তিনি একজন বটে, কিন্তু যখন তখন কংসের বিরোধিতা করে রাজার বিরাগভাজন হয়ে ওঠায় এখন তিনি আরও বিখ্যাত হয়ে উঠেছেন। লোকে এখন তাঁকে কংসবিরোধী গোষ্ঠীর নেতা জানে। আর এত বড় নেতা বলেই কুন্তিভোজকে একবার সগৌরবে কুন্তীকে বলতে হয়–মহামতি বসুদেবের বোন তুই, আমার কন্যাস্থানীয়দের মধ্যে সবার ওপরে তোর স্থান– বসুদেবস্য ভগিনী সুতানাং প্রবরা মম।
কুন্তিভোজ তার নিজের বাড়িতে কুন্তীকে যে আদরে মানুষ করেছেন, সেই আদর বা আগ্রহের মধ্যে স্নেহ–মমতার ফাঁক নিশ্চয়ই নেই। কিন্তু ওই যে বললেন– এক সুখ থেকে আরেক সুখের মধ্যে এসে পড়েছিস, এক হ্রদ থেকে আরেক হ্রদে এই বক্তব্যটা কেমন শোনাল কুন্তীর কাছে? সুখ তো বটেই। রাজবাড়ির সুখ, সুখ নয়? কিন্তু কুন্তীর কাছে এ সুখের মূল্য কী? মহাভারতের কবি এইরকম একটা উপমা বহুত্র ব্যবহার করেছেন এক সুখ থেকে আরেক সুখ, এক হ্রদ থেকে আরেক হ্রদ। কিন্তু এই উপমাটি তিনি ব্যবহার করেছেন একটা ভিন্ন প্রসঙ্গে। যখন এক রাজবাড়ির মেয়ে আরেক রাজবাড়িতে বিবাহিতা হয়ে এলেন, তখনই সেই রাজকন্যা-রাজবধূর সম্বন্ধে মহাভারতের কবি প্রায়ই এই উপমাটি ব্যবহার করেছেন– এক সুখ থেকে আরেক সুখের মধ্যে তার আগমন ঘটল। এক হদ থেকে যেন আরেক হ্রদে। মহারাজ কুন্তিভোজ নিজের অজান্তেই যে উপমাটি ব্যবহার করলেন, সেটি কুন্তীর কানে কেমন শোনাল?
শৈশব-কৈশোরের পরিচিত বাবা-মায়ের কাছে একবার মানুষ হওয়ার স্বাদ পেয়ে, তাদের মা-বাবা বলে ডেকে তারপর অন্য এক বাড়িতে অন্য এক বাবা-মার কাছে মানুষ হওয়ার মধ্যে কী সুখ– তা কুন্তিভোজের পক্ষে বোঝা সম্ভব নয়। কুন্তী জানেন– সেই সুখ কী। পরের ঘরে অতিসুখে লালিত, প্রতিপালিত, প্রত্যেক পুত্র-কন্যাই জানেন সে সুখ কী। শুধুমাত্র রাজবাড়ির সাজাত্যে কুন্তিভোজ যা উচ্চারণ করলেন তা যে কুন্তীর সুখের হতে পারে না, তা পরিষ্কার বোঝা যায় এই অস্থান-পতিত উপমার ব্যবহারেই। কুন্তিভোজের বাড়ি কুন্তীর শ্বশুরবাড়ি নয়। যে বাড়িতে তিনি ছিলেন, সেখানে তিনি সুখেই ছিলেন যথেষ্ট। মহারাজ আর্যক শূরের আদরও কিছু কম ছিল না তার প্রতি। কুন্তিভোজ নিজেও সেকথা স্বীকার করেছেন– শূরস্য দয়িতা সুতা। সেখানে নতুন এক রাজবাড়িতে শুধুমাত্র প্রতিপালিত হওয়ার মধ্যে কুন্তীর কী সুখ থাকতে পারে?
কিন্তু এই সুখকে কুন্তী সুখ বলে না ভাবলেও কুন্তিভোজ ভাবছেন–বড় সুখ হয়েছে তার কন্যার। তা হোক। কিন্তু প্রসিদ্ধ বৃষ্ণিবংশের গৌরবের সঙ্গে নিজের বাড়ির রাজসুখের বাণী উপহার দিয়ে কুন্তিভোজ যে কুন্তীকে বড় মহিমান্বিত করে তুললেন,–এই মহিমাখ্যাপনের কারণ কিন্তু একেবারেই অন্য কিছু। কুন্তিভোজ জালেন–ওইরকম বিখ্যাত বৃষ্ণিকুলে যে জন্মেছে, আর এইরকম মহৎ কুলে যে বড় হয়ে উঠেছে–তাদৃশে হি কুলে জাতা কুলে চৈব বিবর্ধিতা– তাকে আমার জানাতে কোনও বাধা নেই যে, জান তো, মন্দ এবং নীচ বংশের মেয়েদের যদি খানিকটা আচার-নিয়মের মধ্যে রাখা যায়, তবে তারা চপলতাবশত যা করা উচিত নয় তাই করে ফেলে।
দৌধুলেয়া বিশেষেণ কথঞ্চিৎ প্রগ্রহং গতাঃ।
বালভাবাদ বিকুন্তি প্রায়শঃ প্রমদাঃ শুভে।
এই প্রসঙ্গে একটি কথা জানাই। আমি আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে দেখেছি। যাঁরা নিঃসন্তান, একটি শিশুপুত্রের জন্য তারা দুঃখে কাতর হন, তাদের আমি কখনও বলেছি–আপনারা অনাথ আশ্রম থেকে কাউকে দত্তক গ্রহণ করেন না কেন? তারা প্রথমে ইতি-উতি চেয়ে প্রথমে একটা উদাসীনতার ভাব দেখালেও, আমার সনির্বন্ধ আলোচনার বিস্তারে অনেকেই বলেছেন অনাথ-আশ্রম থেকে বাচ্চা আনব, কার না কার ছেলে, পরে কী রূপ ধরবে, বড় সন্দেহ হয় জানেন। আমাদের বক্তব্য– অনাথ আশ্রম তো অজানা জায়গা, কিন্তু পিতা-মাতার গুণদোষ যেখানে জানা থাকে, সেখানে দত্তক-নেওয়া সন্তানের চরিত্র-গুণ প্রকাশ পেলে সেটা প্রতিপালক পিতার গুণ হয়ে দাঁড়াবে; কিন্তু সেই দত্তক-গৃহীত সন্তানের দোয় দেখা গেলে সে দোষ বীজী পিতা এবং গর্ভধারিণী মাতার দোষ বলেই চিহ্নিত হবে। তাই হয়।
