অপ্রাসঙ্গিকভাবে এইসব উদাহরণ দিয়েই কুন্তিভোজ বললেন–এইরকম একজন মহাভাগ ব্রাহ্মণের পরিচর্যার সমস্ত ভার তোর ওপরেই দিয়ে আমি নিশ্চিন্ত হয়েছি, মা–সোয়ং বৎসে মহাভাগ আহিতঃ ত্বয়ি সাম্প্রতম। ব্রাহ্মণের তীক্ষ্ণতা এবং সেইখানেই কুন্তীর নিযুক্তি থেকেই বোঝা যায় একজন তীক্ষ্ণতেজ, অভিশাপপ্রবণ মুনির পরিচর্যার ভারই কুন্তীর ওপর পড়েছে। আর কুন্তিভোজও ভালই জানতেন যে এক ব্রাহ্মণ আর দুর্বাসা মুনিতে তফাত আছে অনেক। দুর্বাসার যথেচ্ছ ব্যবহার, অপিচ তাঁর সাবধান-বাণী শোনা সত্ত্বেও কুন্তিভোজ যে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কুন্তীকে তার তুষ্টি-বিধানের জন্য নিয়োগ করলেন– এর মধ্যে তার নিজস্ব সচেতনতা এবং স্বার্থবোধও কাজ করেছে কিছু কিছু। একান্ত আপন ঔরসজাতা কন্যাকে তিনি কি এই ভয়ঙ্কর পরিচর্যা-কর্মে নিয়োগ করতে পারতেন? সন্দেহ হয়। আর ঠিক সেই জন্যই কুন্তিভোজকে তার মেয়ের কাছে সাফাই গাইতে হচ্ছে, টোক গিলে গিলে নানা কথা ব্যাখ্যা করতে হচ্ছে, এমনকি চাটুকারিতাও করতে হচ্ছে। কুন্তীও বোধহয় সে কথা বুঝতে পারছেন এবং তার সারা জীবনের অশান্তির বীজ হয়ত বা এইসব সময়েই উপ্ত হয়ে যাচ্ছে।
কুন্তিভোজ বললেন– অতিথি ব্রাহ্মণদের সেবা-পরিচর্যার ব্যাপারে, তোর যে কত নিষ্ঠা, মা– সে তো আমি ছোটবেলা থেকেই জানি জানামি প্রণিধানং তে বাল্যাৎ প্রভৃতি নন্দিনি। গুরুজনদের প্রতি তোর যা ব্যবহার, আত্মীয়-স্বজন বন্ধুবান্ধবদের প্রতি তোর যে মমতা, এমনকি এই রাজবাড়ির কাজের লোক ঝি-চাকরদের ওপরেও তোর যে দয়া আছে, তাতে সব সময় মনে হয়–সমস্ত বাড়িটাতেই তুইই জুড়ে বসে আছিস মা ময়ি চৈব যথাবত্ত্বং সর্বৰ্মাবৃত্য বৰ্তসে। আমার এই রাজভবনে এবং অন্তঃপুরে এমন একটি মানুষও নেই, যে তোর ব্যবহারে অসন্তুষ্টন হ্যতুষ্টো জনোস্তীহ পুরে চান্তঃপুরে মম। লোক-ব্যবহারের বিস্তীর্ণ ক্ষেত্রে সর্বত্রই তুই তোর উপস্থিতি প্রমাণ করছিস, মা। কিন্তু মা, এখনও তুই সেই ছোট্টটিই আছিস। বয়স তো খুব বেশি নয় তোর, তার ওপরে তুই যে আমার মেয়ে, পৃথা বালতি কৃত্বা বৈ সুতা চাসি মমেতি চ– তাই ব্রাহ্মণদের কোপের কথাটা একটু খেয়াল করতে বলছিলাম।
কুন্তিভোজ এখানেও তার কথা শেষ করতে পারতেন। কিন্তু তা করলেন না। অপিচ বক্তব্য শেষ না করে, যেসব কথা তিনি এরপরে বলবেন, তার মধ্যে স্পষ্টত না হলেও, অতি সূক্ষ্ম ইঙ্গিতে যা প্রকাশ পাবে, তার মধ্যে দত্তক পাওয়া কন্যার সম্পূর্ণ আত্মীকরণের সংবাদ তেমন করে মেলে না। কুন্তিভোজের কথার মধ্যে এমন এক মৌখিক আড়ম্বর ছিল, সেই আড়ম্বরের মধ্যেও এমন এক আপাত-মধুরতা ছিল, তার আড়াল থেকে তাঁর পিতৃত্বের কৃত্রিমতা সর্বাংশে যাচাই করা যায় না। কিন্তু যে রমণী মনস্বিনী এবং বিদগ্ধা যার পক্ষে যেমন কুন্তিভোজের যৎকিঞ্চিৎ সচেতনতা ধরে ফেলা অসম্ভব নয়, তেমনই তার পক্ষেও কুন্তিভোজের সরল কথা জটিল করে ধরা অসম্ভব নয়– যাকে জ্ঞান হওয়ার পর অন্য একটি গৃহে দত্তক দেওয়া হয়েছে।
কুন্তিভোজের বক্তব্য নিবেদন করার আগে আমাদের ঘরের কথা বলে ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে দিই। ধরুন, একটি সম্পন্ন গৃহস্থের বাড়িতে পুত্রের কৃতিত্ব এবং অকৃতিত্ব নিয়ে কথা হচ্ছে। ধরুন, ছেলেটি একটি ভাল কাজ করেছে, এবং সেই ভাল কাজটা তার পক্ষে হয়ত যথেষ্টই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই ভাল কাজের মর্যাদার সামান্য একটু স্পর্শ পাবার জন্য মা স্বামীকে বললেন, আমি আগেই তোমাকে বলেছিলাম, ছেলে আমার এই করবে, সেই করবে… ইত্যদি। অর্থাৎ ছেলের গর্বে মা গরবিনী হলেন, তাঁর গলার শিরা ফুলে উঠল এবং পারলে সমস্ত জগতের কাছে যেন তিনি ঘোষণা করে দেন যে, ছেলেটি তারই স্বর্ণগর্ভজাত বলেই এই কৃতিত্বের অধিকারী হয়েছে।
এবার ধরুন ছেলেটি একটি খারাপ কাজ করে এল এবং সেটাও তার পক্ষে স্বাভাবিক। তখন কিন্তু উপরিউক্ত জননী অন্য সুরে স্বামীকে বলবেন– আমি আগেই তোমাকে বহুবার বলেছি, তুমি তোমার ছেলে সামলাও। এইরকম হবে, আমি আগেই জানতাম। ইত্যাদি কথোপকথনের পর বংশের ধারা যাবে কোথায়, যেমন বাপ তেমন ছেলে– ইত্যাদি এবং নানান গার্হস্থ্য এবং দাম্পত্য বাদ-প্রতিবাদ এবং ঝগড়া-ঝাটি হতেই থাকবে এবং আমরা এইসব নৈমিত্তিক ঝগড়া-ঝাটির সঙ্গে অতি-পরিচিত। আমরা জানি, সংসার জীবনের গড্ডলিকা প্রবাহে বাবা-মায়েরা তাদের অতি প্রিয় সন্তানকে কখনও স্বসুখবাসনায় অঙ্গীকার করেন কখনও বা আপসে disown করেন। কিন্তু এই অঙ্গীকার বা অনঙ্গীকার সুস্থ-সরল সন্তানের মধ্যে অতিরিক্ত কোনও মনস্তাপ ঘটায় না। কিন্তু পুত্র-কন্যার জীবনের গতি যদি সরল না হয়, তা যদি বাঁধাধরা আহ্নিকগতির বাইরে কোনও জটিল পথ ধরে চলতে থাকে, তবে কিন্তু পিতা-মাতার অতি-সাধারণ তির্যক ভাষণও পুত্র-কন্যার মনে অনাত্মীয়করণের বীজ বপন করবে।
কুন্তীকে আমরা জানি। তিনি কয়েক বছরের কিশোরী পৃথার জীবন মথুরায় কাটিয়ে এসে এখন কুন্তিরাষ্ট্রের রাজা কুন্তিভোজের ঘরে যৌবনবতী কুন্তী হয়েছেন। তাঁর কিশোর-মনের জটিলতা এমনই অস্ফুটচারে বয়ে চলেছিল, যা তাঁর নিজের কাছেও তত স্পষ্ট ছিল না হয়ত, পালক পিতা কুন্তিভোজের কাছে তো তা ধরা পড়বারই কথা নয়। কিন্তু নদীর গভীরস্থিত আবর্তের মতো কুন্তীর মনের গহনে কুন্তিভোজের আপাত-সরল কথাগুলি কী প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে, তা আমরা এখন থেকেই ভাবতে থাকব।
