দুর্বাসা বললেন–দেখুন মহারাজ আমার যখন ইচ্ছে বাইরে যাব। যখন ইচ্ছে আসব– যথাকামঞ্চ গচ্ছেয় আগচ্ছেয়ং তথৈব চ। আমি কোথায় থাকব, কোথায় বসব, কোথায় শোব– এসব নিয়ে যেন কোনও প্রশ্ন না ওঠে। আপনার লোকেরা কেউ যেন অন্যায়ভাবে এ সব ব্যাপারে মাথা গলিয়ে অপরাধ না করে বসে– নাপাধ্যত কশ্চন। অর্থাৎ দুর্বাসা বলেই দিলেন–অপরাধ করবার স্থান কোনগুলি। বোঝা গেল যেন, অশন-আসন, গমন-আগমন–এসব ব্যাপারে সাবধান থাকলেই আর কোনও ভয় নেই যেন। শেষে যেন একটু সতর্কিত করেই বললেন দুর্বাসা– যদি এইভাবে আমায় থাকতে দিতে পার তবেই আমি এখানে থাকতে পারি, ভেবে দেখ–এবং বৎস্যামি তে গেহে যদি তে রোচতে অনঘ। এর উত্তরে কুন্তিভোজ কী বলবেন? না, এরকমটি এখানে সম্ভব নয়? আপনি অন্যত্র যান। এ কথা বললে তক্ষুনি তো অভিশাপ। দুর্বাসা যখন থাকবেনই তখন নিজেদেরকেই দুর্বাসার রীতি-শ্রুতি অনুযায়ী প্রস্তুত করতে হবে।
এই রকম একটা সঙ্কটকালে কুন্তিভোজ সমস্ত ব্যাপারটার মীমাংসা করলেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। সারা জীবনের রাজ-অভিজ্ঞতার সঞ্চয় কাজে লাগিয়ে কুন্তিভোজ বুঝলেন দুর্বাসাকে প্রাথমিকভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখার একমাত্র উপায় একটি যুবতী স্ত্রীলোক। না, এটা ভাবার কোনও কারণ নেই যে, শমপ্রধান মুনি-ঋষিরাও ইন্দ্রিয়পরবশতা ত্যাগ করতে পারেন না, অতএব সেই জন্যই কুন্তিভোজ একটি স্ত্রীলোককে ব্যবহার করতে চাইলেন। না, এটা ভাবার কারণ নেই। ইন্দ্রিয়পরবশতার সুযোগ নেবার জন্য নয়, বরং বলব, কারণটা আরও বেশি বাস্তব। কুন্তিভোজ জানেন– একটি পুরুষ, তিনি যত কঠোর বা হৃদয়হীনই হোন না কেন, তিনি একটি যুবতী স্ত্রীলোককে অনেক সহজে ক্ষমা কৰূতে পারেন। হৃদয়হীন হতেও তার একটু সংকোচ হবে ভিন্ন-লিঙ্গতার কারণে।
কুন্তিভোজ দুর্বাসার মুখে তার শেষ সাবধানবাণী শুনেছেন কেউ যেন কোনও অপরাধ না করে– নাপরাধ্যেত কশ্চন। এই সাবধান-বাণী যতটা না মুনির হৃদয়হীনতার ইঙ্গিত, তার থেকে অনেক বেশি সেই ভবিষ্যতের অপরাধীর প্রতি ক্ষমাহীনতার ইঙ্গিত। অন্তত এক সুন্দরী যুবতীর সরল স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে এই অপর্যাপ্ত অক্ষমা যদি প্রশমিত হয়, তাই একটি নামের কথাই তার মনে হল– পৃথা। কুন্তিভোজ বললেন– না, না, মুনিবর! আপনি এসব কী বলছেন। আপনার যেমন ইচ্ছে, তেমন করেই থাকবেন এবমস্তু। আপনার সমস্ত পরিচর্যার ভার থাকবে একটি মেয়ের ওপর। সে আমারই মেয়ে। ভারি বুদ্ধিমতী আর লক্ষ্মীমতী মেয়ে। যেমন তার স্বভাব–চরিত্র, তেমনই নিয়ন্ত্রিত তার ব্যবহার। ওর নাম পৃথা। আমার ধারণা ওর চরিত্র এবং ব্যবহার দেখলে আপনার সন্তুষ্টি হবে– তস্যাশ্চ শীলবৃত্তেন তুষ্টিং সমুপস্যতি।
রাজা কুন্তিভোজ যথানিয়মে অতিথিকে পাদ্য-অর্ঘ্য দান করে সুখাসনে বসালেন দুর্বাসাকে। দুর্বাসা একটু স্থিত হতেই কুন্তিভোজ ছুটলেন অন্দরমহলে। পৃথাকে তিনি এ বিষয়ে একটা কথাও এতক্ষণ বলেননি। তাঁর মতামতের অপেক্ষা না করেই তিনি দুর্বাসাকে কথা দিয়েছেন। অতএব সব তাকে জানানো দরকার। বিশেষত দুর্বাসার সমস্ত পরিচর্যার ভারই যখন কুন্তীর ওপর নির্ভর করছে, তাই আগে থেকে তাকে অবহিত করা দরকার। কুন্তিভোজ অন্তগৃহে পৌঁছে দেখলেন–ডাগর চোখে তার প্রতিপালিতা কন্যাটি চেয়ে রয়েছে একদিকে। সারাক্ষণ কী যে ভাবে এই মেয়েটা, কুন্তিভোজ বোঝেন না ভাল করে–উবাচ কন্যামভ্যেত্য পৃথাং পৃথুললোচনা।
কুন্তিভোজ বললেন–মা! এক বামুন ঠাকুর এসেছেন আমার ঘরে। তিনি কদিন থাকতে চান এখানে অয়ং বৎসে মহাভাগো ব্রাহ্মণো বস্তুমিচ্ছতি। তা আমি তার কথা শুনে বলেছি বেশ তো থাকুন এখানে, কোনও অসুবিধা নেই তথেত্যেবং প্রতিশ্রুত। কিন্তু জানিস মা! মুনির উপযুক্ত পরিচর্যা, এবং তার থাকা-খাওয়ার ব্যাপারে যাতে কোনও অসুবিধে না হয় সে ব্যাপারে তাকে আমি চরম আশ্বাস দিয়েছি তোরই ভরসায়– ত্বয়ি বৎসে পরাশ্বস্য ব্রাহ্মণস্যাভিরাধন। এখন আমার কথা যাতে মিথ্যা না হয়, আমার দিক থেকে তাকে তুষ্ট করার আশ্বাস যাতে বিফল না হয়, তার জন্য তোকে একটু চেষ্টা করতে হবে মা।
কুন্তিভোজ এখনও পর্যন্ত কুন্তীর কাছে মুনির নাম করেননি। কারণ দুর্বাসার নামের মাহাত্ম্য এমনই যে তা শোনামাত্রই একজন তার কর্তব্য-কৰ্ম অস্বীকার করতে পারে, বিশেষত যখন তার মত না নিয়েই কথা দেওয়া হয়েছে। কুন্তিভোজ এখনও নাম করছেন না, তবে আকারে-প্রকারে বুঝিয়ে দিলেন যে, ইনি সাধারণ কোনও মুনি নন, ইনি দুর্বাসা। কুস্তিভোজ বললেন–এই তপস্বী মুনি নিয়ত বেদাধ্যায়ী এবং অসম্ভব তেজস্বী। যা যা তিনি বলেন, যা যা চান, সব তুই নির্বিবাদে যুগিয়ে চলবি, মা–যদ্য ক্ৰয়ান্মহাতেজা তত্তদ্দেয়মমৎসরাৎ।
কুন্তিভোজ এই কটা কথা বলেই থামতে পারতেন। কিন্তু দুর্বাসা মুনি আগেভাগেই তাকে যেভাবে সাবধান করে দিয়েছেন, তাতে ব্রাহ্মণদের পূজনীয়তা সম্বন্ধে একটা সামগ্রিক জ্ঞান দিয়েই ক্ষান্ত হলেন না কুন্তিভোজ, তারা যে মাঝে মাঝে গৃহস্থের বিপন্নতাও তৈরি করতে পারেন–সেটা জানাতে ভুললেন না কুন্তিভোজ। ভুললেন না যে, তার কারণ একটাই–ইনি অন্য কেউ নন দুর্বাসা। সেকালে স্বাধ্যায়নিষ্ঠ ব্রাহ্মণের সম্মান ছিল বিশাল, অতএব সেইরকম এক ব্রাহ্মণের তুষ্টির জন্য পরিচর্যা-পরায়ণ গৃহস্থকে যে অনেক ব্যক্তিগত ত্যাগ স্বীকার করতে হবে– সে কথা যেমন কুন্তিভোজ জানেন, তেমনই কুন্তীও জানেন। কিন্তু ব্রাহ্মণদের সেবা করা খুব ভাল, এই সাধারণ জ্ঞানদান করার পর–অমুক সময় বাতাপি ব্রাহ্মণকে অবজ্ঞা করে মুত্যুবরণ করেছিল, যদুবংশের তালজ রাজারা ব্রাহ্মণদের অবমাননা করে যমদণ্ড লাভ করেছিল– এইসব ঘোর ভীতিজনক উদাহরণ দিচ্ছেন কেন কুন্তিভোজ?
