এতকাল কী হয়েছে, বিচিত্রবীর্যের রানীরা বিষণ্ণ মুখে বিষণ্ণ ভাবনায় ঘরে শুয়ে থেকেছেন। কোনও আমন্ত্রণ নেই, অভিবাদন নেই অভিনন্দন তো দূরের কথা। রাজরানীর পরিশীলিত রুচিতে তথা আধুনিক দৃষ্টিতেও ব্যাসের প্রতি এই আচরণ হয়ত অসম্মত নয়। কিন্তু ব্যাসের দিক থেকে ব্যাপারটা কী রকম? তিনি পুত্র-সন্তানের জন্ম দিতে এসেছেন তৎকালীন সামাজিক প্রথা মেনে এবং রীতিমতো আমন্ত্রিত হয়ে। তার কাছে রাজবধূদের এই বিষবৎ পরিহারের আচরণ কেমন লেগেছে?
আজ কিন্তু সেরকম ঘটল না। আজ তিনি দেখলেন– এক সুন্দরী রমণী সর্বাভরণ ভূষিতা হয়ে তার আগমনের প্রতীক্ষা করছে। শয়নকক্ষে নয়, রাজগৃহের দ্বারে। তিনি আসতেই সে রমণী তাকে সাদরে পথ দেখিয়ে নিয়ে এল শয়নকক্ষ পর্যন্ত–সা তমৃমি অনুপ্রাপ্তং প্রত্যুদগম্যাভিবাদ্য চ। ঋষির অনুমতি নিয়েই সে তাকে আসন দিল বসতে, আহার দিল ফল-মূল। ভারি খুশি হলেন বেদব্যাস। তাঁর শুষ্ক-রুক্ষ মুনি-জীবনে কোনও সুন্দরী রমণী এমন মধুর ব্যবহার করেনি তার সঙ্গে। ব্যাস বড় খুশি হয়ে তার সঙ্গে বসে বসে বেশ খানিকক্ষণ গল্প করলেন। গল্পে-সন্সে, কথারঙ্গে কখনও তার হাত দুটি ধরলেন মুনি, কখনও হাত রাখলেন কাঁধে, পিঠে; কানে কানে কহিবার ছলে দাসীর লজ্জারুণ কুসুম-কপোল চুম্বন করলেন হয়ত-বাগবোপপ্রদানেন গাত্র-সংস্পর্শনেন চ। লগ্ন অনুকূল হল, আলিঙ্গন ঘনতর হল। ব্যাস দাসীর সঙ্গসুখে পরম তৃপ্তি লাভ করলেন-কামোপভাগেন রহস্তস্যাং তুষ্টিমগাদৃষিঃ।
হয়ত এই তৃপ্তির কারণও ছিল। এখানে নিয়োগ প্রথার নিয়ম মেনে কামনার গন্ধহীন কোনও যান্ত্রিকতা নেই। মহর্ষির দিক থেকেও নেই, শূদ্রা দাসীর দিক থেকেও নেই। অন্যদিকে সত্যবতী পুর্বে ব্যাসকে ডেকে এনে বলেছিলেন–তুমি তোমার ভ্রাতৃজায়াদের গর্ভে বিচিত্রবীর্যের এবং তোমার নিজেরও পূত্র উৎপাদন করো–অনুরূপং কুলস্যাস্য সত্যাঃ প্রসবস্য চ। আমাদের ধারণা বিচিত্রবীর্যের দুই রানীর গর্ভে দুটি পুত্র উৎপাদন করার পর এই যে তৃতীয় দাসী–এই দাসীগর্ভজাত পুত্রটিকেই তার একান্ত আপন পুত্র মনে করেই ব্যাস পরম আনন্দ লাভ করলেন। মহর্ষির বিবাহ হয়নি। সমাজের বিধান অনুযায়ী না হলেও এই শূদ্রা দাসীর অভিবাদন অভিনন্দনে তিনি প্রথম বিবাহের আনন্দ পেলেন যেন।
সহবাসের অন্তে পরম প্রীত ব্যাস–মহর্ষিঃ প্রিয়মানয়া-দাসীর কপালে হস্তস্পর্শ করে বললেন–আমার অনুগ্রহে আজ থেকে আর তুমি দাসী থাকবে না–অভুজিষ্যা ভবিষ্যতি। ব্যাস আরও বললেন–আমি মনে করি কোনও মহাপুরুষ আসছেন তোমার গর্ভে–অয়ঞ্চ তে শুভে গর্ভঃ শ্রেয়ানুরমাগতঃ। যিনি তোমার পুত্র হয়ে জন্মাবেন তিনি হবেন পরম ধার্মিক এবং বুদ্ধিমান মানুষের মধ্যে তিনি হবেন শ্রেষ্ঠ। দাসীকে আশীর্বাদ করে দ্বৈপায়ন ব্যাস বাইরে এলেন। জননীর কাছে বিদায় নেবার সময় বড় রানী অম্বিকার ছলিক আচরণের কথাও যেমন জানালেন, তেমনি জানালেন, শূদ্রা দাসীর সঙ্গে তার আনন্দ-মিলনের কথা–প্রলম্ভম আত্মনশ্চৈব শূদ্রায়াং পুত্রজন্ম চ।
মায়ের ঋণ তো কখনও পূরণ করা যায় না। কিন্তু জন্ম থেকেই যিনি তপস্বীর ব্রত গ্রহণ করেছেন, তিনি অন্তত তিন-তিনবার মায়ের আদেশ শিরোধার্য করে সন্তানের ঋণ শোধর চেষ্টা করে গেলেন। কারণ সেকালের ধারণা ছিল–সন্তানের জন্ম হলে তাদের ভাল মন্দ নিয়ে যখন মানুষ ব্যাপৃত থাকে, সন্তানের মূত্রপুরীষ পরিষ্কার করে তাদের বড় করে তোলার জন্য মানুষ যে কষ্ট এবং ভাবনা করে সে ভাবনার মাধ্যমেই একভাবে পিতৃ-মাতৃ-ঋণ খানিকটা শোধ হয়। ব্যাস তপস্বী, তাই মায়ের অনুজ্ঞা পালন করে সন্তানের জন্ম দিয়ে গেলেন, কিন্তু তাদের দায়িত্ব দিয়ে গেলেন তারই গৃহস্থাংশ ভীষ্মের ওপর। কিন্তু ভাবনার সময় যখন আসবে, তখন তাকে বারবার ঠিক ফিরে আসতে হবে হস্তিনার দ্বন্দ্ব-দীর্ণ সংসারের প্রাঙ্গণে। বারবার তাকে সত্যের পথ বলে দেবার জন্য আশ্রম ছেড়ে আসতে হবে। আসতে হবে মমতার টানে, নাড়ির টানে। আসতে হবে মহাভারতের কবি হয়ে ওঠার উপকরণ সংগ্রহের জন্য–স্রষ্টার মতো, সাক্ষী-চৈতন্যের মতো।
০৭০. আমি দুর্বাসা
৭০.
আমি দুর্বাসা। তোমার বাড়িতে ভিক্ষা চাই।
এই কথাটাই সেকালের সমস্ত রাজা-মহারাজাকে সন্ত্রস্ত করে দেবার পক্ষে যথেষ্ট ছিল। দুর্বাসা, খ্যাপা দুর্বাসা এসেছেন কুন্তিভোজের কাছে। কয়েকদিন তিনি এই রাজভবনে অন্ন গ্রহণ করবেন। কুন্তিভোজ জানেন– এ বড় সৌভাগ্যের কথা, কিন্তু এই দুরূহ সৌভাগ্য তিনি শেষ পর্যন্ত বয়ে নিয়ে যেতে পারবেন কিনা, সেই চিন্তায় তিনি এখন আকুল। দুর্বাসা যে সে মুনি-ঋষি নন। তার ক্রোধ-কোপ অত্যন্ত সুলভ, অভিশাপবাণী জিহ্বাগ্রে নৃত্য করছে সব সময়। তার এই আপাতমধুর ভাষণের মধ্যে, অথবা ব্রাহ্মণের মুখ-নিঃসৃত ভিক্ষা চাই–এই বহুশ্রুত যাচনার মধ্যে হয়ত কোনও ভয়ই নেই। কিন্তু যাচনার দ্বিতীয় পংক্তির মধ্যেই এমন একটা সাংঘাতিক শর্ত আছে, এবং সে শর্ত-পালনের সীমা ঠিক কত দূর তা ঠিক জানা নেই বলেই রাজরক্তও যেন হিম হয়ে যায় এবং তা হয় শুধু দুর্বাসা বলেই।
দুর্বাসা বললেন আমি কদিন থাকব তোমার ঘরে। তুমি বা তোমার সাঙ্গোপাঙ্গ কেউ যেন আমার অপ্রিয় আচরণ কোর নান মে ব্যলীকং কর্তব্যং ত্বয়া বা তব চানুগৈঃ। কেই বা সব জেনে-শুনে দুর্বাসা-মুনির অপ্রিয় আচরণ করবে? কুন্তিভোজও করবেন না। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে কুন্তিভোজ এও জানেন যে, দুর্বাসা মুনি অকারণের মধ্যেও কারণ খুঁজে বার করতে পারেন। সাধারণ চোখে যেটা কোনওভাবেই অপ্রিয় আচরণ নয়, দুর্বাসা সেখানেও অপ্রিয়তা তৈরি করতে পারেন। বলতে পারেন–এটাই আমার অপ্রিয় কাজ। কিসে কিসে তার অপ্রিয়তার কারণ ঘটতে পারে, তার এক আভাসও পাওয়া গেল দুর্বাসার কথায়।
