শয়নকক্ষ থেকে নির্গত হতেই দ্বৈপায়নকে ধরলেন সত্যবতী। বললেন–এবারে একটি সুক্ষণ পুত্রের জন্ম হবে তো? ব্যাস বললেন-এই পুত্রটি যথাকালে প্রবল পরাক্রান্ত এবং জগদ্বিখ্যাত হবে। কিন্তু মা! অম্বালিকার পূর্ব আচরণ আচরণনুযায়ী এই ছেলেটির গায়ের রঙ হবে বিবর্ণ পান্ডু।
গায়ের রঙ দিয়ে আর কী হবে! সত্যবতী খুব একটা হতাশ হলেন না। কিন্তু তবুও আবার কী মনে করে দ্বৈপায়ন পুত্রকে তিনি তৃতীয়বার অনুরোধ করে বসলেন। হয়ত এই অনুরোধও পাণ্ডু জন্মাবার পরেই তিনি করেছিলেন। হয়ত বা পাণ্ডুর বিবর্ণতা দেখে তার বড় কোনও আশঙ্কা হয়নি। কিন্তু একবারের তরেও হয়ত বড় রানী অম্বিকার দশা দেখে তার মায়া হয়েছিল। হয়তো ভেবেছিলেন–স্বামী বেঁচে নেই এবং একটি জন্মান্ধ পুত্রের মুখ দেখে সারাজীবন কাটাতে হবে তাকে। মনে মনে হয়ত সে দুষবে তার শাশুড়িকে। সত্যবতীর জন্যই তো তার এই দুর্দশা। সত্যবতী মাতৃসুলভ বায়না করে ব্যাসকে তৃতীয়বার অনুরোধ জানালেন–আরও একবার অম্বিকার সঙ্গে মিলিত হওয়ার জন্য।
জন্মেই যে বিরাগী পিতার সঙ্গে তপস্যায় চলে গিয়েছিল, সে পুত্রের মনে মাতৃকৃত্যের দায় ছিল। ব্যাস মায়ের কথায় রাজি হলেন। ওদিকে পাণ্ডু জন্মালেন। চেহারাটি বিবর্ণ হলেও রাজা হওয়ার মতো সমস্ত লক্ষণই তাঁর মধ্যে ছিল অতি প্রকট–পাণ্ডুলক্ষণসম্পন্নং দীপ্যমানবি শিয়া। সত্যবতী আবারও ব্যাসকে আহ্বান জানালেন এবং আবারও বড় রানী অম্বিকাকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করানোর চেষ্টা করলেন। অম্বিকা সামনাসামনি সত্যবতীর কথা অমান্য করলেন না। কিন্তু মহর্ষির তপঃক্লিষ্ট দেহের সেই দুঃসহ গন্ধ, ওই জটা-দাড়ির ঘন সন্নিবেশ তিনি মনে মনে মোটেই মেনে নিতে পারছিলেন না। তিনি ভাবলেন-শাশুড়ির কথা মাথায় থাক। তার পক্ষে দ্বিতীয়বার ওই বিষমরূপী মহর্ষির সঙ্গ করা সম্ভব নয়– নাকরোদ্ বচনং দেব্যা ভয়াৎ সুরসুলতাপমা।
শাশুড়ির কাছে তিনি স্বীকার করে এসেছিলেন বলেই নির্দিষ্ট শয়নকক্ষে তার উপস্থিতির ব্যাপারে সত্যবতী কোনও সন্দেহও করেননি। কিন্তু অম্বিকার বুদ্ধি ছিল অন্যরকম। নির্দিষ্ট দিনে তিনি ঠিক করলেন–নিজে নয়, তার সুন্দরী দাসীটিকে তিনি পাঠিয়ে দেবেন সেই শয়নকক্ষে–সেখানে ব্যাস আসবেন জননীর অনুরোধ মেনে নতুন করে গর্ভাধান করার জন্য। নিশীথিনীর মায়া-শয়নে মুনির চিত্ত যাতে বিগলিত হয়, তার জন্য অম্বিকা নিজে তার দাসীটিকে খুব করে সাজালেন। রাজ-আভরণে, বসনে-ভূষণে দাসীটিকে অপ্সরার মতো সুন্দর দেখাচ্ছিল–ততঃ স্বৈভূষণে দাসীং ভুষয়িত্বারোপমা।
আধুনিক দৃষ্টিতে দেখতে গেলে এই যে দাসীর কথা বললাম, এঁদের সামাজিক স্থিতি মোটেই ভাল ছিল না। কোনও রাজার বাড়িতে এঁরা থাকতেন, অথবা রাজারা এঁদের কিনে নিতেন। তারপর রাজকন্যার বিয়ের সময় যৌতুক হিসেবে এই অসহায়া রমণীদের পাঠিয়ে দেওয়া হত রাজকন্যার সঙ্গে। প্রথমত নতুন রাজবাড়িতে রাজকন্যার যাতে কোনও অসুবিধে না হয়, নতুন বাড়িতে লজ্জানা, রাজবধু যাতে সহজ হয়ে উঠতে পারেন নতুন আস্তানায়, সে ব্যাপারে এঁরা সাহায্য করতেন। দ্বিতীয়ত রাজবধুরা যখন ঋতুর কারণে স্বামী-সহবাসে অক্ষম হতেন, তখন রাজাদের সঙ্গ দিতেন এই রমণীরাই।
জাতিগতভাবে এঁরা সমাজের তিন উচ্চবর্ণ ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় বা বৈশ্যের ঘরের মেয়ে হতেন না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এঁরা ছিলেন শূদ্র বর্ণের। কিন্তু সৌন্দর্যের মাপকাঠিতে এরা অনেকেই। ছিলেন যথেষ্ট সুন্দরী এবং সৌন্দর্যের কারণেই এক রাজা তাদের যৌতুক দিতেন, অন্য রাজা তাদের ভোগ করতেন। মহাকাব্যের সমাজে এই দাসীরা অনেক বড় বড় রাজা-মহারাজা বা মুনি-ঋষির জননী হয়েছেন।
আমরা পূর্বে দীর্ঘতমা নামে এক অন্ধ মুনির কাহিনী কীর্তন করেছি। হস্তিনার রাজবাড়িতে পুত্রোৎপাদনের জন্য ব্যাসের নিয়োগের পূর্বে ভীষ্ম এই দীর্ঘতমারই উদাহরণ দিয়েছিলেন সত্যবতীর কাছে। অঙ্গ-দেশের রাজা বলি তার স্ত্রী সুদেষ্ণার গর্ভে পুত্র-উৎপাদনের জন্য অন্ধ দীর্ঘতমাকে নিয়োগ করেন। অন্ধতার সঙ্গে দীর্ঘতমার বার্ধক্যও ছিল আর ছিল কিছু যৌন বিকারও। রাজরানী সুদেষ্ণা অপুত্রক হলেও রাজকীয় রুচিতে বাধে বলে এই অন্ধ-বৃদ্ধ মুনির সঙ্গে–অন্ধং বৃদ্ধঞ্চ তং জ্ঞাত্বা-সহবাস করতে রাজি হননি প্রথমে। অতএব তিনিও প্রথমে তার দাসীটিকেই সাজিয়ে-গুজিয়ে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন দীর্ঘতমার কাছে। সে শুদ্রা রমণীর গর্ভে যে সব পুত্র জন্মে তারা অনেকেই ছিলেন মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি-মুনি। তাদের মধ্যে কাক্ষীবান তো রীতিমতো বিখ্যাত।
আমাদের ধারণা, হস্তিনার রাজবধূ দীর্ঘতমার উদাহরণেই নিজের দাসীটিকে নিজের বসন-ভূষণে অলঙ্কৃত করে পাঠিয়ে দিলেন মহর্ষি বেদব্যাসের কাছে–প্ৰেষয়ামাস কৃষ্ণায় ততঃ কাশীপতেঃ সুতা। রাজবাড়ির দাসীর কাছে এ ছিল অপরিমিত সৌভাগ্য। সে চিরকাল রাজার প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়েছে। রতি-রঙ্গের যাতনাটুকুই তার কাছে সাধারণ, রাজার সন্তান ধারণের সুযোগ তার সবসময় হয় না। আজ সে পুত্রলাভের জন্য সাদরে নিযুক্তা। তাছাড়া পরমর্ষি বেদব্যাসের সম্মান-মর্যাদা সেও কি জানে না? সে হস্তিনার রাজবাড়িতে থাকে; রাজকীয় পরিশীলনে তার বোধ অনেক উন্নত হয়ে গেছে এবং ইতোমধ্যে দুই রাজবধুর গর্ভে দুটি পুত্রসন্তান দেখে আজ সে আপ্লুত বোধ করছে। মহামুনি ব্যাস তার গর্ভে পুত্র জন্মাবেন এই মর্যাদায় আজ সে অভিভূত।
