অম্বিকা এক এক করে ভাবতে লাগলেন। তাদের চেহারা, হাব-ভাব বয়স, মিলিত হবার সময় তাদের একেকজনের বিকার–এই সব-সাচিন্তয়ত্তদা ভীষ্মমন্যাংশ্চ কুরুপুঙ্গবা। বহুতর দীপালোকিত শয়নকক্ষে কত শত কথা তার মনে আসছে–ভীষ্ম তাদের তিন বোনকে হরণ করে নিয়ে এলেন, মহারাজ বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে তার বিবাহ, তার প্রাণাধিক ভালবাসা, তার মৃত্যু এবং পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে আজ এই রম্য অভিযান-এত সব ভাবতে ভাবতেই রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর উপস্থিত হল।
মহর্ষি বেদব্যাস উপস্থিত হলেন অম্বিকার শয়ন কক্ষে–শয়নং প্রবিবেশ হ। মহাভারতের কথক-ঠাকুর তার কথাগুরু বেদব্যাসের চেহারার বর্ণনা দিয়ে বলেছেন–তাঁর মাথায় ছিল পিঙ্গল জটাভার, এক গাল দাড়ি, কালো গায়ের রঙ, আর চোখ দুটো যেন জ্বলছিল–তস্য কৃষ্ণস্য কপিলাং জটাং দীপ্তে চ লোচনে। দ্বৈপায়ন তার মাকে বলেছিলেন-আজই যদি তোমার বধূর সঙ্গে মিলন চাও, তবে আমার বিকৃত রূপ, বিকৃত বেশ আর গায়ের দুর্গন্ধ সহ্য করতে হবে তোমার বন্ধুকে। আমাদের ধারণা–তিনি আর নতুন কী বিকার ঘনিয়ে আনবেন নিজের চেহারায়। তার চেহারাটাই তো ওইরকম। আমরা ছোটবেলায় বৈষ্ণব-সজ্জনদের মুখে মহামতি ব্যাসের একটা ধ্যানমন্ত্র শুনতাম। সেই শ্লোক মন্ত্রে ব্যাসের প্রথম উপাধি হল-বেদ-শাস্ত্রের অধ্যয়ন-অধ্যাপনে যার বুদ্ধি পরিশীলিত হয়েছে এই তার আন্তর রূপ। দ্বিতীয় রূপ হল বাহ্যরূপ–চামড়ার কাপড় পরিধানে, কালো গায়ের রঙ, মাথায় কপিল-তুঙ্গ জটাভার কৃষ্ণত্বিষং কনকতুঙ্গ-জটাকলাপ। আর মধ্যে আছে দুটি আগুনের ভাটার মতো চোখ–
রাজবাড়ির সার্বত্রিক পরিচ্ছন্নতার মধ্যে যে রাজবধূ জীবন কাটিয়েছেন, যিনি ভীষ্ম কিংবা রাজপরিবারের ভাশুর স্থানীয় অন্য কারও কথা ভেবে নিজের মনকে তবু একটু প্রস্তুত করছিলেন, সেই রাজবধু রাজবালা মহর্ষি বেদব্যাসের এই অকল্পনীয় রূপ দেখে ভয়ে চোখ বুজলেন- দৃষ্টা দেবী ন্যমীলয়ৎ। ঘরে দীপ জ্বালা রয়েছে ব্যাস উপস্থিত হয়ে রমণীর হৃদয়হারী কোনও চাটুবাক্য বললেন না, কোনও শৃঙ্গার-নর্মে মন দিলেন না। শুধু মায়ের ইচ্ছাপূরণ করে ইতিকর্তব্য পালন করলেন। ওদিকে অদ্ভুত আশঙ্কায়, ভয়ে রাজবধূ অম্বিকা চক্ষু মুদে আপন রুচি-বিরোধী এক পুরুষ-সংসর্গ সহ্য করে গেলেন। একবারের জন্যও তিনি চোখ খুলে ব্যাসের দিকে আর তাকালেন না– ভয়াৎ কাশীসূতা তন্তু নাশক্লোদভিবীতুম্।
রানীর শয়নকক্ষ থেকে ব্যাস বেরিয়ে চলে যাবার পথেই তাকে ধরলেন সত্যবতী। জিজ্ঞাসা করলেন–খুব ভাল ছেলে হবে তো, বাবা। রাজার ছেলে রাজপুত্রের মতোই হবে তো সে অপ্যস্যাং গুণবান্ পুত্র রাজপুত্রো ভবিষ্যতি? সত্যবতীও বোধহয় পুত্রের চেহারা দেখে তত ভরসা পাননি। অবশ্য প্রশ্নটাও ঠিক পুত্রের কাছে মায়ের মতো নয়। এ যেন ভবিষ্যদ-দ্রষ্টা এক ঋষির কাছে সাধারণ রমণীর আকুতি-ভাল ছেলে হবে তো, বাবা! ব্যাস জননীর কথা শুনে দৈবপ্রেরিত ব্যক্তির দূরদৃষ্টিতে বললেন–মা! এই রানীর গর্ভে যে ছেলেটি হবে, তার গায়ে থাকবে হাতির মতো শক্তি। তিনি বিদ্বান, ভাগ্যবান এবং বুদ্ধিমান হবেন যথেষ্টই। কিন্তু সেই ভাবী ছেলের মা এমনই একটা ব্যবহার করল, যে ছেলেটি তার অন্ধ হয়েই জন্মাবে–কিন্তু মাতুঃ স বৈগুণাদ অন্ধ এব ভবিষ্যতি।
সত্যবতী বললেন–কী সৰ্বনেশে কথা, বাবা! একজন অন্ধ মানুষ কি কুরুবংশের উপযুক্ত রাজা হতে পারে নান্ধঃ কুরূণাং নৃপতিরনুরূপস্তপোধন? তুমি বাপু কুরুবংশের উপযুক্ত, রাজা হওয়ার মতো একটি পুত্র-জন্মের ভাবনা করো। সেও তার পিতার বংশের ধারা বজায় রাখবে। ব্যাস আর কী করেন। মায়ের কথায় রাজি হলেন আবার।
কাশীরাজনন্দিনী অম্বিকা যথা সময়ে একটি অন্ধ পুত্র প্রসব করলেন। এখনকার দিনে হলে বলা যেত, অনীতি এক ধর্ষণের ফলেই অম্বিকার পুত্রের এই অঙ্গহানির বিকার ঘটেছে। অথবা ব্যাসের ভবিষ্যৎ-দৃষ্টির ওপর ভরসা না থাকলে বলা যায়-অম্বিকার পুত্র অন্ধ হয়ে জন্মানোর পরেই সত্যবতী তাঁর দ্বিতীয় অনুরোধটি করেছেন ব্যাসের কাছে। এই অনুরোধের মধ্যে আশ্চর্যের কিছু নেই। কারণ অম্বিকা অলৌকিকভাবে ব্যাসের মিলন-মুহূর্তেই তার সদ্যগর্ভ প্রসব করেননি। তিনি সন্তান ধারণ করেছেন এবং যথাকালেই প্রসব করেছেন–সাপি কালে চ কৌশল্যা সুষুবে’ন্ধং তমাত্মজ।
অন্ধ পুত্রের মুখ দেখে ভূয়োদর্শিনী সত্যবতী আবারও আহ্বান জানালেন ব্যাসকে। এবারে এবার বিচিত্রবীর্যের দ্বিতীয়া মহিষী অম্বালিকার পালা। সত্যবতী তাকেও ধীরে-মধুরে বুঝিয়ে-সুজিয়ে শয়নকক্ষে পাঠালেন-পুনরেব তু সা দেবী পরিভাষ্য সুষাং ততঃ।
অম্বালিকা অপেক্ষা করতে লাগলেন নিযুক্ত পুরুষ ব্যাসের আগমনের জন্য। ব্যাস একইভাবে জটা-দাড়ি আর দীপ্ত চক্ষুর বিকর্ষণ নিয়ে উপস্থিত হলেন অম্বালিকার শয়ন-প্রকোষ্ঠে–ততস্তেনৈব বিধিনা মহর্ষিস্তামপদ্যত। অগ্রজা অম্বিকার অভিজ্ঞতায় অম্বালিকা মনের জোর করেই চোখ বন্ধ করলেন না বটে, কিন্তু ভয়ে সিঁটিয়ে গেলেন একেবারে। সেই ভয়েই তিনি বুঝি একেবারে বিবর্ণ ফ্যাকাশে হয়ে গেলেন- বিবর্ণা পান্ডুসঙ্কাশা সমপদ্যত ভারত। মিলন সম্পূর্ণ হল এইভাবেই–ভয়ে, বিবর্ণতায়।
আগের বারে যাঁর সঙ্গে তার মিলন হয়েছিল, সেই ভীতা নিমীলিতচক্ষু অম্বিকার সঙ্গে কথা বলার কোনও সুযোগই পাননি ব্যাস। এক অন্তহীন বিকর্ষণের মধ্যেই তাকে বিদায় নিতে হয়েছিল। এবারে শত শত প্রজ্বলিত দীপামালার মধ্যে তারই দিকে তাকিয়ে থাকা এক বিবর্ণ মলিন সন্ত্রস্ত মুখ ব্যাস দেখতে পেলেন। সে মুখের মধ্যে তৃপ্তির আভাস ফুটে না উঠলেও, তার মধ্যে অনভিনন্দন বা সম্পূর্ণ নির্বিকার ভাব ছিল না। ভয়ে সিটিয়ে থাকা রমণীর মুখপানে তাকিয়ে ব্যাস দুটো কথা বলার সুযোগ পেলেন। বললেন–আমার এই বিরূপ বিষম আকৃতি দেখে তুমি যখন এমন বিবর্ণ পার হয়ে গেলে, তাই তোমার পুত্রটির চেহারাও হবে এইরকম নিষ্প্রভ বিবর্ণ গোছের। আমি বলি—তার নাম রেখো পাণ্ডু–তস্মাদেষ সুতস্তে বৈ পারেব ভবিষ্যতি। মাথা নত করলেন অম্বালিকা।
