সত্যবতী বললেন–কৌশল্যা! তোমার কাছে ধর্ম-সম্মত কথাই একটা বলব। কিন্তু কথাটা আগেই না বলে সত্যবতী নিজেকে দায়ী করলেন প্রাথমিকভাবে। কথার মধ্যে পুত্রবধুর নিরুপায়তা এবং নির্দোষত্ব বজায় রেখে নিজের ওপর দোষ চাপানোটাই সত্যবতীর মনস্বিতা। সত্যবতী বললেন– সবই আমার কপালের দোষ, অম্বিকা! আমার কপাল-দোষেই আজ এই প্রসিদ্ধ ভরত বংশ উচ্ছন্নে যেতে বসেছে–ভরতানাং সমুচ্ছেদে ব্যক্তং মদ্ভাগ্যসংক্ষয়াৎ। আমি তো এই বংশলোপের ভয়ে খুবই ভেঙে পড়েছিলাম। আমার-তমার পিতৃবংশীয় লোকেরা অর্থাৎ আমাদের শ্বশুরকুলের সবাই তো সব আশাই ছেড়ে দিয়েছিলেন। এই অবস্থায় বুদ্ধিমান ভীষ্ম এই বংশের বৃদ্ধির জন্য আমাকে একটা বুদ্ধি দিয়েছেন–ভীষ্মে বুদ্ধিমদাম্মহাং কুলস্যাস্য বিবৃদ্ধয়ে।
আমরা জানি বুদ্ধিটা সত্যবতীরই, ভীষ্ম সেটাকে সাদর সমর্থন করেছেন। পুত্রবধুদের কাছে মহামতি ভীষ্মের কথাটা বেশি মর্যাদাকর এবং ওজনদার হবে ভেবেই সত্যবতী ভীষ্মের নাম করে অম্বিকাকে বললেন–ভীষ্ম আমাকে একটা বুদ্ধি দিয়েছেন ঠিকই, তবে সে বুদ্ধির সফলতা নির্ভর করছে সম্পূর্ণই তোমার ওপর–সা চ বুদ্ধি-স্তয্যধীনা। আমার ইচ্ছা তুমি বুদ্ধি সফল করে লুপ্তপ্রায় ভরত বংশকে পুনরুদ্ধার করো– নষ্টঞ্চ ভারতং বংশং পুনরেব সমুদ্ধর। ভীষ্মের বুদ্ধিটা আসলে কী–সত্যবতী তো স্পষ্ট করে কিছু বললেন না, কেননা তিনি আন্দাজ করতে পারেন-রাজবধুরা আকারে ইঙ্গিতে ঠিকই কিছু বুঝেছেন। নিয়োগ-প্রথা সেকালের সমাজ-সচল প্রথা হলেও রাজবধুদের দিক থেকে সংকোচ কিছু থাকবেই। সেই সংকোচ এবং লজ্জার শব্দমাত্রও উচ্চারণ না করে যে বিষয়ে তার পুত্রবধূটি প্রলুব্ধ হয়ে রয়েছেন, সত্যবতী সেই কথা উচ্চারণ করলেন। সত্যবতী বললেন-সুশ্রাণী! (এই শব্দের ব্যঞ্জনা–এখনও তোমার রূপ-যৌবন-বয়স যে কোনও পুরুষের কাম্য) দেবরাজ ইন্দ্রের মতো একটি ছেলে হতে পারে তোমার। তুমিই সেই অসামান্য পুত্রের জন্ম দিতে পার–পুত্রং জনয় সুশ্রাণি দেবরাজসমপ্রভ। তোমার সেই গর্ভজাত পুত্রই এই বিখ্যাত বংশের ধারা রক্ষা করবে, আর সেই পুত্রই হবে ভবিষ্যতের রাজা–স হি রাজ্যধুরং গুৰীমুক্ষ্যতি কুলস্য নঃ।
পুত্রহীনা রমণীর কাছে পুত্রের আশ্বাস যতটুকু মধুর লাগে, অম্বিকার কাছে ততটাই নিশ্চয় মধুর লাগল সত্যবতীর আশ্বাস। কিন্তু যে উপায়ে সেই বহু প্রতীক্ষিত পুত্রলাভ ঘটবে, সেই উপায়টি অস্বিকার কাছে কতখানি অবাঞ্ছিত–তা কি সত্যবতী জানেন? জানেন নিশ্চয়ই, কিন্তু তিনিও নিরুপায় অথবা ‘ডেসপারেট’। এক অতি সুখী পুত্রবতী জননী অন্য এক পুত্রহীনা দুঃখিনীর প্রসঙ্গ উত্থাপন করে আমাকে বলেছিলেন–আমি যদি হতাম, আমি যে কোনও উপায়ে পুত্রলাভ করতাম। তাতে যদি অপরিচিত কারও সঙ্গে মুহূর্তের জন্য যান্ত্রিকভাবে সঙ্গতও হতে হত, তাও আমি লজ্জিত হতাম না। আমি জানি- পুত্রহীনার চোখের জল দেখেই, তিনি এত বড় কথাটা বলেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে স্বামী বেঁচে থাকতে বা স্বামী স্বর্গত হলে ভারতবর্ষের সামাজিক, পারিবারিক এবং ব্যক্তিগত রুচিতেও অনীতি পুরুষের সাহচর্যে গর্ভধারণ যে কতটা বেদনার, তা বুঝতে পারবেন তিনিই, যিনি এমন অস্বাভাবিকভাবে গর্ভধারণ করেছেন।
পুত্রহীনা অম্বিকা পুত্রের আশ্বাস পেয়ে যতটা আনন্দ লাভ করলেন, দুঃখও পেলেন ঠিক ততটাই। মহাভারতের কবি এই দুঃখটা বর্ণনা করেছেন অদ্ভুত একটা শব্দ প্রয়োগ করে। তিনি বলেছেন–সত্যবতী ধর্মের দোহাই দিয়ে, এই কাজের ধর্মসঙ্গতি যথাসম্ভব ব্যাখা করে অনেক বোঝালেন অম্বিকাকে এবং বহু কষ্টে তাকে রাজি করালেন–সা ধর্মতো’নুনী য়ৈনাং কথঞ্চি ধর্মচারিণীম। কী রকম অম্বিকা? বিশেষণ দিচ্ছেন–ধর্মচারিণীম। এর সোজা অর্থ হল, যিনি স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই বৈধব্যের কারণে ইন্দ্রিয়-সংযম এবং ব্রত-নিয়মের কাঠিন্যে ব্রহ্মচারিণীর মতো জীবনযাপন করছেন, সত্যবতী তাকে অনেক বুঝিয়ে-সুজিয়ে রাজি করালেন। কিন্তু অর্থটা যে এত সোজা নয় তা বলে দিয়েছেন টীকাকার নীলকণ্ঠ। তিনি বলেছেন–কথঞ্চিৎ, মানে কোনও প্রকারে বহু কষ্টেসৃষ্টে। যিনি অন্য পুরুষের স্পর্শ কোনওভাবেই সহ্য করতে পারছেন না, এই রকম অম্বিকাকে বহু কষ্টে রাজি করালেন–এনাং পুরুষান্তরস্পর্শ অনিচ্ছুন্তী ইতি সূচয়তি কথঞ্চিদিতি।
অম্বিকা শাশুড়ির মুখে বংশের প্রয়োজন এবং তাঁর ধর্ম-সম্মত ব্যাখ্যা শুনে কোনওমতে তার প্রস্তাবে নিমরাজি হতেই রাজবাড়িতে উৎসব লেগে গেল। সত্যবতী ব্রাহ্মণদের ডেকে, মহর্ষি-দেবর্ষিদের ডেকে খুব করে ভোজ দিলেন। ক্রমে দিন শেষে রাত্রি হল। সত্যবতী ঋতুস্নাতা পুত্রবধু অম্বিকাকে শয়ন-গৃহে নিয়ে গেলেন ধীরে, সযত্নে। তাঁর গলার স্বর মৃদু হল, সত্যবতী বললেন–অম্বিকা! তোমার এক ভাশুর আছেন, তিনি আজ তোমার সঙ্গে মিলিত হতে আসবেন। তুমি সাবধানে তাঁর জন্য অপেক্ষা করো। রাত্রির অর্ধকাল অতীত হলে তিনি আসবেন। তার লক্ষ্য কিন্তু তুমিই অপ্রমত্তা প্রতীক্ষৈনং নিশীথে হ্যাঁগমিষ্যতি। সত্যবতী অম্বিকার মানসিক প্রস্তুতি খানিকটা বাড়িয়ে দিয়ে শয়ন-গৃহ ছেড়ে চলে গেলেন।
একা মহার্ঘ শয্যায় শুয়ে রইলেন অম্বিকা। কাশীরাজনন্দিনী, বিচিত্রবীর্যের প্রথম প্রেয়সী। ঘরের মধ্যে প্রদীপ জ্বলছিল অনেক–দীপ্যমানেষু দীপেষু। অম্বিকা রাজবাড়ির এক বিদহ্মা রমণী। ভরত বংশের ধারা রক্ষার দায়িত্ব নিয়ে কোনওদিন তাকে এমন অস্বস্তিতে পড়তে হবে, এমন কথা তিনি ভাবেননি। সত্যবতী তাকে বলে গেলেন– তোমার ভাশুর আসবেন নিশীথিনীর অন্ধকারে। কিন্তু কে এই ভাশুর? ভীষ্ম কি? অন্য কেউ যিনি ভাশুর-স্থানীয়?
