.
৬৬.
দ্বৈপায়ন বলেছিলেন–তোমার পুত্রবধূদের সম্বচ্ছর ধরে ব্রত-নিয়ম পালন করতে হবে, তবেই তাঁদের শুদ্ধ সত্তার মধ্যে সন্তানের জন্ম দেব আমি। সত্যবতীর উপরোধে ব্যাসের এই প্রস্তাব টিকল না। সত্যবতী দেরি করতে রাজি হলেন না। ব্যাস তখন বললেন-আমাকে যদি আকালিকভাবে এখনই পুত্র উৎপাদনে ব্রতী হতে হয়, তবে তোমার পুত্রবধুদের অনেক সহ্য-শক্তির পরীক্ষা দিতে হবে। তাদের সহ্য করতে হবে আমার বিকৃত রূপ এবং সেইটাই তাদের ব্রতের কাজ করবে–বিরূপতাং মে সহতাং তয়োরেতং পরং ব্রত। ব্যাস আরও বললেন-আমার শরীরে থাকবে দুর্গন্ধ, আমার রূপ হবে জঘন্য, আমার পরিধানেও থাকবে বিকারের ছোঁয়া। তোমার পুত্রবধুরা যদি এই সমস্ত বিকার মেনে নিয়েও আমার সঙ্গে সঙ্গত হতে পারেন, তবে আজই তাদের গর্ভে উৎকৃষ্ট সন্তান জন্মাবে-যদি মে সহতে গন্ধং রূপং বেশং তথা বপুঃ।
আমাদের জিজ্ঞাসা হয়, ব্যাস এইরকম একটা শর্ত দিলেন কেন? কেনই বা তার চেহারায়, পরিধানে এই স্বেচ্ছাকৃত বিকার ঘনিয়ে আনছেন তিনি? আমাদের ধারণা, কারণ এখানে একটাই। সেকালের দিনের নিয়োগ-প্রথার সুফল হিসেবে একজন স্বামী-পুত্রহীনা নারীও সন্তানের মুখ দেখতে পারতেন। কিন্তু এই সন্তান-লাভের জন্য স্ত্রী-পুরুষের মধ্যে কামনার আগুন জ্বলে ওঠাটা কোনও গৃহস্থ বাড়ির অভিভাবকেরই কাম্য হত না। আর এটাই তো স্বাভাবিক। ধরুন, কারও পুত্ৰ স্বৰ্গত হয়েছে। ছেলের বউ সুস্থ, স্বাভাবিক এবং বয়স কম। তার। কোনও সন্তানও নেই। গৃহস্থ চান, তাঁর পুত্রবধূর কোলে একটি সন্তান আসুক। এই অবস্থায়। সেকালের প্রথায় গৃহস্থ মানুষ অন্যের দ্বারা গর্ভাধান করাতে রাজি হলেও তিনি কি চাইবেন যে তার পুত্রের প্রেমাস্পদা বধূ অন্যের লালায়িত লালসার বিষয়ীভূত হোন।
আমরা জানি, এমনটি কেউ চাইবেন না। সেকালের দিনের নিয়োগ প্রথাতেও তাই কিছু বিধি-নিয়ম ছিল। নিয়োগ প্রথায় নিযুক্ত পুরুষ মানুষটির গায়ে ঘি, দই, লবণ ইত্যাদি মাখিয়ে তাকে একেবারে জ্যাবজ্যাব করে ফেলা হত, যাতে সেই পুরুষের দেহ-স্পর্শ কোনওমতেই এক রমণীর হৃদয়ে প্রফুল্লতা না আনে। গর্ভাধান সম্পন্ন হত অন্ধকারে, যাতে সেই পুরুষের রূপ রমণীর মনে কোনও সুখচ্ছায়া না ফেলে। পরিষ্কার বোঝা যায়–গর্ভাধানের মতো কর্তব্য কর্মটির মধ্যে শুধু কর্তব্য ছাড়া আর কিছুই থাকুক- এটা তখনকার সামাজিকেরা চাইতেন না।
আজকের সামাজিক বিচারে এই প্রথা কতটা নৃশংস অথবা নিযুক্ত রমণীর মতামতের অপেক্ষা না করে শুধু বৃদ্ধদের অনুমতিতে এই প্রথা সম্পন্ন হওয়ার মধ্যে কতটা সুবিচার ছিল, সে কথা আজকের পরিশীলিত সমাজিক মননে বিচার করে কোনও লাভ নেই। কেননা আজকের সামাজিক নীতি-নিয়মগুলিও হয়ত সেকালের মাপকাঠিতে অতীব নৃশংস। কাজেই সেই তারতম্যের আলোচনায় না যাওয়াই ভাল। আমাদের বক্তব্য–ব্যাস যে এই বিকৃত রূপ, পরিধানের বিকার তথা নিজ দেহকে দুর্গন্ধময় করে তুলে বিচিত্রবীর্যের বধুদের সামনে এক অসহ্য বিকার প্রকট করে তুলতে চাইলেন, তার পিছনে কারণ একটাই। কোনওভাবেই যেন এখানে কামনার অবকাশ না থাকে। তাকে যেন কোনওভাবেই রানীদের ভাল না লাগে। সাধারণ নিয়োগ-প্রথায় যেমন ঘৃত-দধি মাখানোর ব্যবস্থাও থাকে, ব্যাস সেই রাস্তায় গেলেন না। এমনকি নিশীথের অন্ধকারে তিনি আলোর ব্যবস্থাও রাখতে বলেছেন। অন্ধকারে থাকলে কল্পনায় একজনকে সুপুরুষ ভাবা যেতে পারে। ব্যাস সে ফাঁকটুকুও রাখেননি। তার চেহারায় তিনি এমনই এক ঘৃণ্য-বিকার ঘনিয়ে তুলবেন, যেন তা দেখেই আর কোনও সুখ-কল্পনার অবকাশ থাকবে না। যাঁরা ভাবেন-দ্বৈপায়ন ব্যাস রানীদের শয্যায় অলৌকিকভাবে আবির্ভূত হবেন, তাদের এই অলৌকিকতার মধ্যে প্রবেশ করতে নিষেধ করি। অথবা ব্যাস যে বিকার। নিয়ে রানীদের সামনে উপস্থিত হবেন, তা এতটাই অস্বাভাবিক যে, একভাবে সেটাকে আবির্ভাবই বলা যেতে পারে। এই আবির্ভাবে সমস্ত কামনা জ্বলে-পুড়ে ছাই হয়ে যাবে। আর সেই ছাই থেকেই জন্মাবে কর্তব্যের অঙ্কুর; দাবাগ্নিদগ্ধ কদলীকান্ড থেকেও যেমন অঙ্কুরোৎপত্তি হয় সেইরকম।
ব্যাসের দিক থেকে গর্ভাধানের সংকেত লাভ করে সত্যবতী বড় রানী অম্বিকার কাছে উপস্থিত হলেন, নির্জনে-মানসিকভাবে তাকে প্রস্তুত করানোর জন্য। বিচিত্রবীর্যের অন্যতম প্রিয়তমা মহিষী অম্বিকা। তিনি এতকালের রাজরানী। সত্যবতীর মতো না হলেও তারও কিছু ব্যক্তিত্ব আছে। হঠাৎ করে তার কাছে গিয়ে বলা যায় না–তুমি প্রস্তুত হও, তোমার ভাশুর আসছেন তোমার সঙ্গে মিলিত হতে। সত্যবতী জানেন–প্রলোভনের বস্তু এমন কিছু তার সামনে উপস্থিত করতে হবে, যাতে তার পুত্রবধূ স্বয়ংই আকর্ষণ বোধ করেন। তার সঙ্গে থাকতে হবে সামাজিক আচার এবং ধর্মের প্রলেপ। সত্যবতী ভূয়োদর্শিনী, মনস্বিনী। রাজরানীর ব্যক্তিত্ব স্মরণ করেই সত্যবতী যুক্তি সাজালেন অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে। বললেন–কৌশল্যা!
আমরা আগে বলেছি–কোশল দেশটি কাশীর সঙ্গে এক সময় রাজনৈতিকভাবে যুক্ত হয়েছিল এবং অম্বিকার পিতা কাশীরাজ মূলত কোশল দেশের জাতক না হলেও অম্বিকার সঙ্গে কোশলদোশের যোগাযোগ ছিল জন্মগত। কিন্তু এই মুহূর্তে তাকে ‘কৌশল্যা’ বলে ডেকে সত্যবতী যেমন তার নিজের মুখে পুত্রবধূর বাপের বাড়ির স্নেহমমতা ফুটিয়ে তুলেছেন তেমনি একাধারে তিনি তার পুত্রবধুর মধ্যে একটি দেশের ভাবনা ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। ভাবটা এই-কোশল দেশের মায়ায় তোমাকে যেমন কৌশল্যা বলে ডাকছি, তেমনি আজকে তোমার ডাক পড়েছে হস্তিনার জনসাধারণের কাছ থেকে। তাদের কথাও তোমাকে ভাবতে হবে।
