শমীক মুনির গলায় মরা সাপ ঝুলিয়ে দিয়ে পরীক্ষিত যখন চলে গেছেন, শৃঙ্গী তখন সদ্য বাড়ি ফিরেছেন। বাড়ি ফেরার পরই তার এক বন্ধু-কৃশ তার নাম তিনিও ঋষিকুমার, তার সঙ্গে শৃঙ্গীর দেখা হল। বন্ধুর পিতা শমীককে দেখে কৃশর খারাপ লাগছিল। কাজেই শৃঙ্গীর সঙ্গে দেখা হতেই তিনি বললেন, ভাই! তুমি তো জপে তপে খুব তেজস্বী হয়েছ বলে শুনি। তোমার বাবাও যথেষ্ট তপস্বী এবং তেজস্বী। কিন্তু এরপর থেকে আমরা ঋষি বালকেরা যখন কথা বলব, তখন তুমি আর তেজ বেশি দেখিও না, বেশি কথাও যেন বোলো না– মাস্ম কিঞ্চিদ বচো বদ। এত তুমি ব্ৰহ্মর্ষির পৌরুষ দেখাও, এত বড় বড় কথা তুমি বল। তা আর একটু পরেই তুমি দেখতে পাবে-তোমার মৌনী পিতা কেমন একটি শব গলায় ঝুলিয়ে বসে আছেন।
শৃঙ্গী রাগে জ্বলে উঠলেন। কী! আমার পিতা শব ধারণ করে আছেন–শৃঙ্গী জ্বলে উঠলেন। জিজ্ঞাসা করলেন, কেমন করে সম্ভব হল এই ঘটনা অপৃচ্ছত্তং কথং তাতঃ সমে’দ্য মৃতধারকঃ? কৃশ বললেন, কেমন করে আবার? মহারাজ পরীক্ষিত হরিণের পিছনে ছুটতে ছুটতে হরিণ না পেয়ে তোমার বাবাকে সেই হরিণের সংবাদ জিজ্ঞাসা করলেন। আর তিনিও মৌনী হয়ে আছেন বলে কোনও জবাব দিলেন না। ব্যস্ যা হবার তাই হল। পরীক্ষিত ধনুকের অগ্রভাগ দিয়ে কোথা থেকে একটি মরা সাপ তুলে নিয়ে এসে ঝুলিয়ে দিলেন তার গলায়। সেই অবধি তোমার পিতা সেই সর্প-শব ধারণ করেই বসে আছেন আর মহারাজ পরীক্ষিত এখন হস্তিনাপুরে বসে আছেন।
শৃঙ্গী মুনির চোখ দুটি রাগে লাল হয়ে উঠল, শরীর জ্বলে গেল ক্রোধে কোপ সংরক্তনয়নঃ প্রজ্বলম্নিব মনা। অসংবৃত ক্রোধে এক মুহূর্তে তিনি আচমন-শুদ্ধ অভিশাপের জল তুলে নিলেন হাতে। অভিশাপ দিলেন যে পাপিষ্ঠ আমার ব্রতক্লিষ্ট পিতার গলায় মৃত সর্প প্রদান করেছে, আজ থেকে সাতদিনের মাথায় তীক্ষ্ণবিয তক্ষক আমার কথায় কুরুকুলের গ্লানি ওই পাপিষ্ঠ রাজাকে যমালয়ে প্রেরণ করবে।
মহাভারতের অনুসরণে এই যে শেষ অনুচ্ছেদটি লিখে ফেললাম এর মধ্যে অন্তত দুটি জিনিস আছে লক্ষ্য করার মতো। এক, আমাকে অনেকেই প্রশ্ন করেন, এই যে আপনাদের ঋষি-মুনিরা আছেন, কী রকম লোক এরা? অ্যাঃ! কথায় কথায় এত রাগ? পান থেকে চুন খসলেই অভিশাপ? সবটাই যেন এঁদের খেয়াল খুশি!
এই প্রশ্নের উত্তর আমরা এখনই দেব না। আরও দু-একটা জব্বর জব্বর অভিশাপের ঘটনা জমে উঠুক, কারণে নয় অকারণে দু-একবার ক্রোধাবেশ হোক মুনি ঋষিদের, তখন এর উত্তর দেব। বরং কথা প্রসঙ্গে এখন দ্বিতীয় বিষয়টাই বেশি করে মাথায় রাখা ভাল। সে বিষয়টা কিন্তু পুরনো–সেই নাগরাজ তক্ষকের বিষ। শৃঙ্গী মুনি রাগের মাথায় যে অভিশাপটা দিলেন তার ভাষাটা খেয়াল করেছেন কি? শৃঙ্গী বলেছেন, আমার কথায় চালিত হয়ে নাগরাজ তক্ষক ব্রাহ্মণকুলের অপমানকারী কুরুকুলের কলঙ্ক সেই পাপিষ্ঠ রাজাকে মৃত্যুর পথে নিয়ে যাবে মদবাক্য-বলচোদিতঃ সপ্তরাত্রাদিতে নেতা যমস্য সদনং প্রতি।
আগেই বলেছি- নাগজাতীয়রা কেউ সাপ টাপ নন। তারা রীতিমতো মানুষ এবং এই মানুষদের সঙ্গে তৎকালীন ব্রাহ্মণ-সমাজের বনিবনাও দেখা যাচ্ছে কোথাও কোথাও। নইলে নাগরাজ তক্ষক, যিনি অবশ্যই নাগ গোষ্ঠীর এক প্রধান নেতা, তিনি ব্রাহ্মণের কথায় চালিত হবেন কেন? লক্ষণীয় বিষয় হল–আমরা এর আগে ব্রাহ্মণ উতষ্ককে দেখেছি। তিনি তক্ষকের ওপরে ভীষণ ক্রুদ্ধ। জনমেজয়কে তিনি তক্ষকের বিরুদ্ধে উত্তেজিতও করেছেন। আবার ব্রাহ্মণ-সমাজের অন্যাংশকেও এখন আমরা লক্ষ্য করছি। তারা ক্ষত্রিয় রাজার ওপরে বিরক্ত হয়ে নাগ-জন-জাতির পাশাপাশি দাঁড়াচ্ছেন। স্বয়ং নাগরাজ তক্ষক তাদের শাসনে চলেন। ব্যাপারটার মধ্যে যে রাজনৈতিক এবং সামাজিক চোরাবালি কিছু লুকিয়ে আছে সেটা একটু বুঝে নিতেই হবে।
শৃঙ্গী-মুনি পরীক্ষিতকে অভিশাপ দিয়ে পিতা শমীকের কাছে গেলেন। তিনি তখনও সেই অবস্থায় মরা সাপ গলায় নিয়ে বসে আছেন, যেমনটি তিনি আগে ছিলেন শৃঙ্গী রাগে কেঁদে ফেললেন। পিতার মৌনতা বিঘ্নিত হল। শৃঙ্গী সদর্পে বললেন, যে দুরাত্মা আপনার এই অবস্থা করেছে তার খবর শোনামাত্র আমি তাকে অভিশাপ দিয়েছি, বাবা।–হেমাং ধর্ষণাং তাত তব তেন দুরাত্মনা। আজ থেকে সাত দিনের মাথায় নাগরাজ তক্ষক তাকে মৃত্যুদন্ড দেবে।
শান্ত মহর্ষি শমীক পুত্রের অভিশাপ উচ্চারণে খুশি হলেন না। তিনি বললেন, কাজটা তুমি ভাল করনি, পুত্র! এতে আমার তো সুখ তো কিছু হলই না বরং তুমি তোমার তপস্বীর ধর্ম থেকে বিচ্যুত হলে- ন মে প্রিয়ং কৃতং তাত নৈষ ধর্মস্তপস্বিনাম। শমীক পুত্রকে বুঝিয়ে বললেন, পরীক্ষিত মহারাজ আমাদের রাজা বটে। সমস্ত সময় তিনি আমাদের সঙ্গে আছেন, আমাদের তিনি রক্ষা করেন। আর তুমি তার এই বিপদ ঘটালে? ভাল নি, পুত্র! ভাল কাজ করনি।
পিতা-পুত্র, দুই মুনির ভাব চরিত্র দেখলেন নিশ্চয়। দুজনে দু’রকম। একজন রাজাকে অভিশাপে ধ্বংস করতে চাইছেন, অন্যজন তাকে রক্ষা করতে চাইছেন। শমীক পুত্রকে রীতিমতো তিরস্কার করে বললেন, তুমি সত্যব্রত। তোমার অভিশাপ মিথ্যা হবে না জানি। কিন্তু পুত্র যাতে গুণবান যশস্বী হয়ে ওঠে তার জন্য বয়স্ক পুত্রকেও পিতা শাসন করেন–পিত্রা পুত্রো বয়স্থ’পি সততং বাচ্য এব তু। আমি তাই করছি। তুমি যে অভিশাপই দিয়ে থাক, আমি কিন্তু মহারাজ পরীক্ষিতের কাছে তোমার এই আকস্মিক ক্রোধের খবর জানাব। আমি জানাব, যে আপনি আমাকে অপমান করেছেন জেনে আমার বদরাগী বুদ্ধিহীন, অশিক্ষিত ছেলে আপনাকে অভিশাপ দিয়েছে।–মম পুত্রেণ শপোসি বালেনাকৃতবুদ্ধিনা।
