অতএব সত্যবতীর প্রস্তাব–আমার এই দুই পুত্রবধূর গর্ভে তুমি পুত্ৰ উৎপাদন করো। একমাত্র তুমিই এই কাজ করতে পার, বাছা–তয়োরুৎপাদয়াপত্যং সমর্থো হাসি পুত্ৰক।’পুত্র’ সম্বোধনটির মধ্যেও ভারি সুন্দর ব্যঞ্জনা আছে। অক্সার্থে ‘ক’ প্রত্যয় হয়। ক’ প্রত্যয়ের প্রয়োগে বড়কে ছোট করে দেখানো যায়, যেমন বাল, বালক, মানব, মানবক (শিশু)।’পুত্র’ শব্দের ব্যঞ্জনা–তুমি যত বড় ঋষিই হও না কেন, বেদ-বিভাগ করে তুমি যত বড় কবিই হও না কেন, মায়ের কাছে এখনও তুমি সেই আদরের শিশুটিই আছ। অতএব আমার কথা শুনতে হবে বাছা! ব্যাস যদি ভাবেন–এই কর্মে শুধু স্নেহময়ী মায়েরই অনুমোদন আছে, হস্তিনার পূর্বজাত দায়ভাক্ ভীষ্মের অনুমোদন নেই, তাই সে কথা সত্যবতী আগেই বলে নিয়েছেন ভীষ্ম এই ব্যাপারে প্রয়োজনীয় অনুরোধ করেছেন, আর আমারও এই আদেশ–ভীষ্মস্য চাস্য বচনান্নিয়োগাচ্চ মোনঘ। তুমি বিচিত্রবীর্যের পত্নীদের গর্ভে পুত্রের জন্ম দাও। তাতে আমার কনিষ্ঠ পুত্রের বংশধারাও অক্ষুণ্ণ থাকবে এবং তোমারও সন্তান জন্মাবে-অনুরূপং কুলসাস্য সত্যাঃ প্রসবস্য চ।
জননীর এই আদেশ দ্বৈপায়ন ব্যাসের মনে কোনও আকস্মিকতা সৃষ্টি করেনি। এক পুত্রবধূর গর্ভে পুত্রোৎপাদনের জন্য অন্য পুত্রের নিয়োগ যেহেতু তদানীন্তন সমাজ-সচল প্রথা, কাজেই সত্যবতীর অনুরোধে ব্যাস কিছুই আশ্চর্য হননি। তিনি এমন ঘটনা অনেক দেখেওছেন-দৃষ্টং হ্যেতৎ সনাতন। অতএব জননীর উদ্দেশে তিনি সাধারণভাবেই বললেন–মা! তুমি ঐহিক এবং পারত্রিক সব ধর্মই জান। তোমার বুদ্ধিও ধর্মবোধে পরিশীলিত। কাজেই তোমার আদেশ মেনে শুধু ধর্মের খাতিরেই তোমার ইচ্ছাপূরণ করব–তস্মাদহং ত্বন্নিয়োগাদ্ধৰ্মমুদ্দিশ্য কারণম্। আমি নিশ্চয়ই আমার ভাই বিচিত্রবীর্যের জন্য দেবোপম পুত্র উৎপাদন করব। কিন্তু তার জন্য তোমার রাণীদের কিছু কষ্ট করতে হবে। আমি যেমন বলব, ঠিক সেইভাবে তোমার দুই রাজবধু এক বৎসর কাল ব্রত পালন করুন–ব্রতং চরেতাং তে দেব্যৌ নির্দিষ্টমিহ যন্ময়া। এতে তাদের শুদ্ধি ঘটবে এবং সেই ব্রতক্লিষ্ট শুদ্ধ অবস্থাতেই আমার সঙ্গে মিলন হবে তাদের। নীতি নিয়ম-ব্ৰতহীন অবস্থায় আমার সঙ্গে কোনও রমণীর সঙ্গতি হতে পারে না–ন হি মাম অব্রতোপেতা উপেয়াৎ কাচিদঙ্গনা।
ব্যাসের ভাবটা বোঝা যায়। উপযুক্ত পুত্রের জন্য পিতা-মাতাকে তপস্যা করতে হয়। শুধুই কামজাত পুত্রের দ্বারা জগতের কোনও হিত সাধন হয় না বলেই ব্যাস মনে করেন। তাছাড়া বিচিত্রবীর্যের সাহচর্যে দুই রানীর এতদিন যে কাম সাধন চলেছে, সেই একই বৃত্তিতে তাপোধন দ্বৈপায়ন ব্যাসের সাহচর্য লাভ করা যায় না। তপঃক্লিষ্ট মুনির কাছে পুত্র কামনা করলে তার জন্য তাদেরও চিত্ত শুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। সেইজন্যই ব্যাস এক বৎসরের ব্রত-নিয়মের কাঠিন্য আরোপ করতে চাইছেন রানীদের ওপর–সংবসরং যথান্যায়ং ততঃ শুদ্ধে ভবিষ্যতঃ।
সত্যবতী দেখলেন–এক বছর সময় বড় কম নয়। তার ওপর যোগী-মুনি বলে কথা। কখন কী মতিগতি হয় কে জানে? হয়তো এক বৎসর পর এসে ছেলে বলল-না, এখনও কাল পরিপক্ক হয়নি, চিত্ত শুদ্ধ হয়নি। তখন আবার কোন বিপদ হবে কে জানে? সত্যবতী ভাবলেন –একবার যখন তার পুত্রটিকে হাতের কাছে পাওয়া গেছে, তখন যেভাবেই হোক তাকে দিয়ে ঈঙ্গিত কাজটি করিয়ে নিতে হবে। সত্যবতী তার প্রিয় পুত্রকে কাতর হয়ে অনুরোধ জানালেন বাবা! এখনই যাতে রানীরা গর্ভ ধারণ করতে পারে, সেই ব্যবস্থাই করো, বাবা! –সদ্যো যথা প্রপদ্যেতে দেব্যৌ গর্ভং তথা কুরু। এ দেশে এখন রাজা নেই। অরাজক রাজ্যে বৃষ্টি হয় না, অরাজক রাজ্যের ওপর দেবতার প্রসন্ন দৃষ্টি থাকে না। আর আমরাই বা কী করে এই অরাজক রাজ্য রক্ষণাবেক্ষণ করব। তাই বলছিলাম-তুমি বাবা আর বিলম্ব করো না। রানীরা যাতে এখনই গর্ভ ধারণ করতে পারেন, তুমি সেই ব্যবস্থা করো। সন্তান জন্মালে তাদের বড় করে তুলবেন মহামতি ভীষ্ম, তুমি কোনও চিন্তা করো না–তস্মাদ্ গর্ভং সমাধৎস ভীষ্মঃ সম্বৰ্ষয়িষ্যতি।
সত্যবতীর প্রস্তাব শুনেই বোঝা যায়–আজকের মহাকবি যে সাবেগে বলেছিলেন কৌরব-পাণ্ডবের এক পিতামহ-সে কথাটা ততটা আক্ষরিক সত্য নয়। আসলে দুই পিতামহ–একজন মহামুনি ব্যাস, অন্যজন ক্ষত্রিয় ভীষ্ম। কাশীরাজের দুই কন্যাকে এনে তিনি বিবাহ দিয়েছিলেন বিচিত্রবীর্যের সঙ্গে। আজ বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর তিনিই রয়ে গেলেন তার সন্তানদের বড় করে তোলার জন্য। প্রকৃতির প্রতিশোধ বোধহয় এমনটাই হয়। যিনি বিবাহ করবেন না, রাজ্য গ্রহণ করবেন না বলে কঠিন প্রতিজ্ঞা করে বসে রইলেন, তাকেই সংসারের সবচেয়ে মায়াবদ্ধ জীবটির মতো ভাইয়ের বিবাহ দেওয়ার জন্য, তার ছেলেপিলে মানুষ করার জন্য সংসার আঁকড়ে বসে থাকতে হচ্ছে। সন্ন্যাসী মুনি মুহূর্তের গর্ভাধান-সম্পন্ন করে আবারও তপস্যায় ফিরে যাবেন, আর ক্ষত্রিয়ের তপস্যা এমনই যে, প্রতিজ্ঞাত সত্য রক্ষা করার জন্য, রাজ্য রক্ষার জন্য ভীষ্মকে সারা জীবন আরও এক সাধনা করে যেতে হবে। নিজে সন্তানহীন, অথচ সারা জীবন তাকে অন্যের সন্তানের মায়ায় মুগ্ধ হতে হবে–ভীষ্মঃ সম্বর্ধয়িষ্যতি।
