এই যে কাউকে কিছু না বলে মায়ের ডাক শোনা মাত্রই বেদপাঠ ছেড়ে চলে আসা–এই সমস্ত প্রক্রিয়াটার মধ্যে এমন ত্বরিত গতি এবং আবেগ ছিল যে, মহাভারতের কবি সেটাকে অলৌকিকভাবে বর্ণনা করে তার নিজের কাছে মায়ের আদেশের মূল্য কতখানি, সেটাই বোঝাতে চেয়েছেন। এতকাল পরে তাঁর কুমারী অবস্থার প্রথমজ পুত্রটিকে দেখে সত্যবতীর অন্তর্গঢ় স্নেহধারা উদ্বেলিত হয়ে উঠল। ছেলে এখন মহাযোগী হয়েছে, মহা-ঋষি হয়েছে, তাই প্রথমে সাধারণের সম্মান-বিধি অনুসারে একটু কুশল প্রশ্ন বা স্বাগত-ভাষণ করেই সুচিরকালের ব্যবধানে দৃষ্ট পুত্রটিকে জননী সত্যবতী দুই হাতে জড়িয়ে ধরলেন। এতকাল পরেও যেন তার মাতৃস্তন্যের উষ্ণ ধারা ক্ষরিত হল প্রায়-পরিজ্য চ বাহুভ্যাং প্রস্রবৈরভিষিচ্য চ। সত্যবতীর চোখ দুটি বাষ্পচ্ছন্ন হল আনন্দে, এতকাল পর পুত্র দর্শনের সন্তুষ্টিতে–মুমোচ বাষ্পং দাসেয়ী পুত্রং দৃষ্টা চিরস্য তম্।
আজন্ম সংসার-বিরাগী ব্যাসও উদ্বেল মাতৃস্নেহে আকুল বোধ করলেন। কীই বা দেবার আছে! সমস্ত পুণ্যতীর্থের জল তার কমণ্ডলুতে ভরা ছিল। সেই জল মায়ের মাথায় ছড়িয়ে দিলেন দেবতার আশীর্বাদের মতো–তামদ্ভিঃ পরিষিচ্যার্তাং মহর্ষিরভিবাদ্য চ। বুঝিয়ে দিলেন–এতকাল এত তীর্থে ঘুরে ঘুরে তপস্যার ফল লাভ করেছি, মা! আজ সেই সর্বতীর্থোদ্ভব জল তোমার গায়ে ছড়িয়ে দিয়ে আমার জন্মাবধি সম্পূর্ণ জীবৎকালের সঙ্গে স্পর্শ ঘটালাম তোমার। মায়ের মাথায় তীর্থজল ছড়িয়ে দিয়ে তাকে যথাবিধি অভিবাদন করলেন ব্যাস। বললেন–তোমার মনের যা ইচ্ছে তাই করব আমি। তুমি যেমন আদেশ করবে এবং যেমনটি তোমার ভাল লাগে, তেমনটিই আমি করব–শাধি মাং ধর্মতত্তম্ভেজ্ঞ করবাণি প্রিয়ং তব।
মহামুনি ব্যাস এসেছেন হস্তিনায়। ব্যাস তো শুধু মায়ের নন, তিনি যে সবার। খবর পেয়ে হস্তিনাপুরের রাজপুরোহিত এসে মঙ্গল-মন্ত্র উচ্চারণ করলেন মহর্ষির শুভাগমনের জন্য। মহর্ষি ব্যাসও রাজপুরোহিতের দেওয়া পাদ্য-অর্ঘ্য সাদরে স্বীকার করলেন। তিনি আসনে উপবেশন করতেই সত্যবতী আবার তার প্রথমজন্মা পুত্রটির কাছে এসে বসলেন। কথাগুলো রাজপুরোহিতের সামনেই হওয়া ভাল, কারণ রাজপুরোহিত তৎকালীন রাজযন্ত্রের অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব। রাজবাড়িতে যা ঘটছে, সমস্ত প্রজাদের স্বার্থে তা তার জানার অধিকার আছে।
সত্যবতী পুত্রকে আবারও কুশল প্রশ্ন করলেন। এতকাল পরে তার মাতৃত্বের দাবি কতটা টিকবে, সেটাও যেন একটু বুঝে নিতে চাইলেন তিনি। পুত্রকে বললেন–কবি!
সম্বোধনটা ভারি চমৎকার। পৃথিবীর প্রথম কবিতাবলীর মর্মকথা বুঝে নিয়ে সেগুলির শ্রেণী বিভাগ করেছেন ব্যাস। কোনটা মন্ত্র, কোনটা গান সব বুঝে নিয়ে তিনি চতুর্বেদের পৃথক সংকলন করেছেন–ঋক্, সাম, যজুঃ, অথর্ব-যো বাস্য বদাংশ্চতুর-স্তপসা ভগবানৃষিঃ। তা। এমন মানুষকে তার জননী কবি বলবেন না তো কি? তাছাড়া সংস্কৃতে কবি শব্দের অর্থ বড় গভীর। ভূত, ভবিষ্যৎ, বর্তমান–সব তিনি দেখতে পান বলে ক্রান্তদশী কবির সঙ্গে ঋষির কোনও পার্থক্য নেই। সত্যবতী সেই ক্রান্তদর্শী পুত্রের কাছে আপন মাতৃত্বের দাবি জানাচ্ছেন। বলছেন-কবি! সংসারে একটি ছেলে যেমন পিতার সবচেয়ে বড় সহায়, তেমনি সে তার মায়েরও সবচেয়ে বড় সহায়। পিতা যেমন তার পুত্রকে স্বচ্ছন্দে শাসন করতে পারেন, তেমনি মাও তাকে শাসন করতে পারেন–তেষাং যথা পিতা স্বামী তথা মাতা ন সংশয়ঃ।
সত্যবতী গৌরচন্দ্রিকা করছেন। এতকাল পিতার সংস্পর্শে ছিলেন, অতএব পিতার কথাই মান্য, আর এতকাল মায়ের সঙ্গে তার থাকা হয়নি বলে মায়ের কথার কোনও মূল্য নেই–এই লঘুতা যাতে না ঘটে তার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুতি নিচ্ছেন সত্যবতী। তিনি বললেন–আমার কুমারী অবস্থায় তুমি যেমন আমার সমাজ-সম্মত প্রথম পুত্র–বিধানবিহিতঃ স ত্বং যথা মে প্রথমঃ সুতঃ–তেমনি বিচিত্রবীর্যও আমার কনিষ্ঠ পুত্র। আবার দেখ–পিতার দিক দিয়ে মহামতি ভীষ্ম যেমন বিচিত্রবীর্যের ভাই, তেমনি মায়ের দিক দিয়ে তুমিও তার ভাই–যথা বৈ পিতৃতো ভীষ্ম-স্তথা ত্বমপি মাতৃতঃ। আমার মুশকিল হয়েছে–শান্তনব ভীষ্ম। বিবাহ করবেন না এবং রাজ্যও পালন করবেন না বলে কঠিন প্রতিজ্ঞা করেছেন। এই অবস্থায় তোমার ছোট ভাই বিচিত্রবীর্যের মঙ্গলের জন্য এবং মহান কুলের বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য আমি যা বলব, তা তোমায় একটু মন দিয়ে শুনতে হবে, বাবা!
এক বিচিত্রবীর্য এবং তাঁর বংশরক্ষা–এর মধ্যে যদি ব্যক্তিগত স্বার্থেরই শুধু চরিতার্থতা থাকে, তাই সত্যবতী বলছেন–হস্তিনাপুরবাসী সমস্ত প্রজাদের প্রতি যদি কোনও দয়া থাকে তোমার–(ভাবটা এই, সে দয়া আমার অন্তত আছে), সকলের রক্ষণাবেক্ষণের জন্য যদি তোমার কোনও ভাবনা থাকে, আর ওই স্বামী পুত্রহীনা বেচারা ওই বউ-দুটির ওপর যদি কোনও মায়া থাকে তোমার, তবে আমি যা বলব, তা শুনে তোমায় একটি কাজ করতে হবে, বাবা–আনৃশংস্যাচ্চ যক্ৰয়াং তদ্ভুত্ব কতুমহসি।
সত্যবতী আর ভণিতা করছেন না। কারণ, তখনকার দিনের সামাজিক রীতিনীতি এবং বিপন্নতায় সত্যবতী এখন কী প্রস্তাব করবেন, সে আন্দাজ ব্যাসের হয়ে গেছে বলেই সত্যবতী এবার ঝটিতি তার বক্তব্য জানালেন। বললেন-তোমার ছোট ভাইয়ের দুটি স্ত্রীই দেবরমণীদের মতো সুন্দরী। তাদের রূপ-যৌবন যথেষ্ট এবং তারা ধর্মানুসারে পুত্রকামনা করে-রূপযৌবন সম্পন্নে পুত্ৰকামে চ ধমতঃ। ব্যাসের সামনে পুত্রবধূদের রূপযৌবনের কথা উচ্চারণ করে সত্যবতী বোঝাতে চাইলেন–বিচিত্রবীর্য মারা যাবার সঙ্গে সঙ্গে এই দুই যুবতী বধূর সমস্ত কিছু ব্যর্থ হয়ে গেছে, এমনকি কোল-আলো করা দুটি সন্তানও নেই, যাদের দিকে তাকিয়ে এরা জীবন কাটাবে।
