সত্যবতী আপন পুত্রের এত গুণ-ব্যাখ্যান করছেন, তার কারণ আছে। বস্তুত নিয়োগ প্রথায় পুত্র উৎপাদন করতে গেলে এমনই একজন পুরুষকে আহ্বান জানানো দরকার, যিনি জ্ঞানী, গুণী, পণ্ডিত। এতে পরম্পরাক্রমে জ্ঞান এবং বিদ্যাবত্তা নিয়োগজাত পুত্রের মধ্যে সঞ্চারিত হতে পারে। দ্বিতীয় কারণ, যাঁকে পরক্ষেত্রে পুত্রোৎপাদনের জন্য আহ্বান করা হবে তিনি যেন কামুকতার বশবর্তী হয়ে না আসেন। নিযুক্ত হবার মুহূর্তে বাস্তব পরিস্থিতিই কামুকতার সঞ্চার করবে, কিন্তু নিযুক্ত পুরুষ যদি পূর্বাহ্নেই কামে বশীভূত হয়ে থাকেন, তবে তাকে দিয়ে পরের স্ত্রীর গর্ভে পুত্রোৎপাদন করানোটা খুব বড় একটা মানসিক বিপর্যয় তৈরি করে। সত্যবতী তাই তার পুত্রের সত্যবাদিতার সঙ্গে অন্তরিন্দ্রিয়ের নিরুদ্ধির কথা জোর দিয়ে বলেছেন–শমপরঃ অন্তরিন্দ্রিয়-নিগ্রহ-ব্যাপৃত। শুধু অন্তরিন্দ্রিয় এইজন্য যে, এর সঙ্গে বহিরিন্দ্রিয়েরও নিরুদ্ধি ঘটলে পুত্রোৎপাদনের ঘটনাই অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
শমদমাদির পরম সাধনা যাঁর করায়ত্ত, ঐহিক-পারত্রিক কোনও কামনা বা ফলে যার কোনও স্পৃহা নেই সেই রকম একজন মানুষই যে,এক রমণীর গর্তে নিরাসক্তভাবে পুত্র উৎপাদন করার সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি সে বিষয়ে সন্দেহ নেই কারও। সত্যবতী ভীষ্মকে বললেন–আমি এবং তুমি, দুজনেই যদি এই তেজস্বী মুনিকে তোমার ভ্রাতৃ বধূদের গর্ভে পুত্র। উৎপাদন করার জন্য নিযুক্ত করিস নিযুক্তো, ময়া ব্যক্তং ত্বয়া চাপ্রতিমদ্যুতিঃ–তবে সে কিছুতেই না বলতে পারবে না। আমার এই পুত্রটি আমাকে ছেড়ে যখন পিতার সঙ্গে তপস্যা করতে গেল, তখন আমাকে বলেছিল–কোনও প্রয়োজন হলে আমাকে ডেকো, আমি ঠিক চলে আসব। আজ সেই প্রয়োজন উপস্থিত। ভীষ্ম! এখন তুমি এ বিষয়ে অনুমতি করো তাহলে আমি তাকে স্মরণ করতে পারি–ত্বং স্মরিয্যে মহাবাহো যদি ভীষ্ম ত্বমিচ্ছসি।
এই প্রস্তাব যে ভীষ্মের কাছে অত্যন্ত আদরণীয় হয়েছে, তা তার পরবর্তী মন্তব্য থেকেই বোঝা যাবে। কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাসকে তিনি এতটাই সম্মান করেন যে, তার নাম শোনামাত্রই তিনি হাত জোড় করে দাঁড়ালেন–মহর্ষেঃ কীর্তনে তস্য ভীষ্মঃ প্রাঞ্জলিরব্রবীৎ। বললেন–মা! যিনি কাজ করার আগেই ধর্ম, অর্থ, কাম এবং এগুলির ফলাফল–দুইই চিন্তা করতে পারেন, তিনিই প্রকৃত বুদ্ধিমান। বিচিত্রবীর্যের স্ত্রীদের গর্ভে পুত্রোৎপত্তির জন্য যা আপনি বলেছেন, তা শুধু ধর্মসম্মতই নয়, তা আমাদের বংশের পক্ষেও হিতকর হবে, আমাদের তাতে মঙ্গল হবে। আপনার এই প্রস্তাব আমার অত্যন্ত ভাল লাগছে–উক্তং ভবতা যয়ে স্তন্মহং রোচতে ভূশম্।
লক্ষণীয় বিষয় হল, মহামতি ভীষ্ম একজন বীর ক্ষত্রিয় পুরুষ। তিনি কুরুবাড়ির সংসার সীমার মধ্যে আবদ্ধ। কিন্তু তিনি বিবাহ করেননি। তিনি আমৃত্যু ব্রহ্মচর্যের ব্রত নিয়েছেন এবং তিনি রাজ-সিংহাসনও ভোগ করবেন না বলে ঠিক করেছেন। এক কথায় তিনি গৃহস্থ হওয়া সত্ত্বেও সন্ন্যাসী। অন্যদিকে কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন ব্যাস একজন ব্রাহ্মণ মহর্ষি। কোনও সামাজিক বিবাহ-বন্ধনের মধ্যে তার জন্ম হয়নি। জন্মমাত্রেই তিনি পিতার সঙ্গে তপস্যায় নিযুক্ত হয়েছেন। তিনি এখনও পর্যন্ত অবিবাহিত। কিন্তু তিনি সুদুর আশ্রম থেকে কুরুবাড়ির সংসার-সীমার মধ্যে ফিরে আসছেন কুরুবাড়ির বংশধারা অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য।
ব্যাস এবং ভীষ্ম দুজনেই কুরুবাড়ির মূল বংশধর বিচিত্রবীর্যের ভাই–একজন মাতার সম্বন্ধে, অন্যজন পিতার সম্বন্ধে। পিতৃ-সম্বন্ধ অনুযায়ী ক্ষত্রিয় ভীষ্মই তার বংশরক্ষায় সবচেয়ে উপযুক্ত ব্যক্তি ছিলেন। কিন্তু তিনি ব্রহ্মচর্যের প্রতিজ্ঞা নিয়েছেন বলে তার মাতৃসম্বন্ধের ভাই ব্রাহ্মণ মহর্ষি কৃষ্ণদ্বৈপায়ন ব্যাস তার ভাইয়ের স্ত্রী দুই ক্ষত্রিয়াণীর ক্ষেত্রে বা গর্ভে ব্রাহ্মণ্যের বীজ বপন করার জন্য আমন্ত্রিত হয়েছেন। ব্রাহ্মণ মহর্ষি তার বীজ বপন করেই চলে যাবেন, আর ক্ষত্রিয় ভীষ্ম কুরুবাড়ির সংসার-সীমান্তে দাঁড়িয়ে এই বীজ অঙ্কুরিত হতে দেখবেন, সেই অঙ্কুরকে তিনি লালন করবেন, সেই অঙ্কুরকে বিস্তারিত শাখা-প্রশাখায় মহীরুহে পরিণত হতে দেখবেন এবং সেই মহীরুহের মহতী বিনষ্টি থেকে নতুন সৃষ্টি পর্যন্ত দেখে যাবেন। এই বিশাল। এক বিবর্তন প্রক্রিয়ার দ্রষ্টা হয়ে থাকবেন ভীষ্ম, আর তার পরিপূরক ব্যক্তিত্ব হিসেবে স্রষ্টার ভূমিকায় থাকবেন ব্যাস–যিনি ভারত-বংশের ধারা অক্ষুণ্ণ রাখবেন এবং ভবিষ্যতে মহাভারতের কবি হবেন। আপাতত ভারত বংশের মূল ক্ষেত্রে সৃষ্টির জন্য তার ডাক এসেছে–এই সৃষ্টির বিষমৃতই তাকে পরে মহাভারতের কবি করে তুলবে।
আপাতত ভীষ্ম সত্যবতীকে সমর্থন করার সঙ্গে সঙ্গে সত্যবতী কাল বিলম্ব না করে তার প্রথম পুত্র দ্বৈপায়ন ব্যাসকে মনে মনে স্মরণ করলেন। মহর্ষি সেই মুহূর্তে বেদ-পাঠে নিরত ছিলেন। সেই অবস্থাতেই জননী তাকে কোনও প্রয়োজনীয় কাজে স্মরণ করছেন মনে করে | তিনি সকলের অলক্ষিত অবস্থায় মায়ের সামনে আবির্ভূত হলেন।
কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন ব্যাস এতটাই উচ্চ স্তরের যোগী এবং মুনি যে, তার সম্বন্ধে যেন এমন অলৌকিকভাবে বললেই ভাল মানায়। কিন্তু মহাভারতের সর্বত্রই এই দেবোপম ঋষিরা এবং এমনকি স্বয়ং দেবতা বলে প্রথিত পুরুষেরাও এমন মনুষ্যোচিতভাবে লীলায়িত হয়েছেন যে, ব্যাসের মায়ের সামনে আসাটুকুও লৌকিকভাবেই উপস্থাপিত করা যায়। বাস্তব জগতে আমরাও শ্রদ্ধেয় মানুষকে দেখা হলে বলে থাকি–আপনাকে স্মরণ করছিলাম। একইভাবে সত্যবতী ব্যাসকে স্মরণ করে বিশ্বস্ত কাউকে পাঠিয়েছিলেন তাঁর কাছে। হয়তো সেই সময় তিনি বেদ পড়ছিলেন–স বেদান্ ব্রিব্রূবন্ ধীমান্। কিন্তু সেই সময় মা তাকে স্মরণ করছেন শুনে কাউকে কিচ্ছুটি না বলে সবার অজ্ঞাতে তিনি মায়ের কাছে চলে এসেছেন– প্রাদুর্ভুবাবিদিতঃ ক্ষণেন কুরুনন্দন।
