সত্যবতী তার এই সখাসম পুত্রের কাছে সবই খুলে বলবেন ঠিক করলেন। কিন্তু এই মুহূর্তে তার বড় লজ্জা করছে। সেই কুমারী অবস্থায় মহামুনি পরাশরের সঙ্গে তার মিলন হয়েছিল–আজ এতদিন পরে সেই ক্ষণিক মিলনের কথা পুত্ৰকল্প ভীষ্মের কাছে বিবৃত করবেন। তিনি। তার বড় লজ্জা করল। লজ্জা পেলে মানুষ বোকার হাসি হেসে লজ্জাকে চাপা দিতে চায়। সত্যবতীও তাই করলেন। হাসি-হাসি মুখ করে দু-একবার ইচ্ছাকৃতভাবে থতমত খেয়ে-বাচা সংসজ্জমানয়া–সত্যবতীর তাঁর পূর্ব জীবনের এক চরম ঘটনা ভীষ্মকে বলতে উদ্যত হলেন–বিহসন্তীব সত্ৰীড় ইদং বচনমব্রবীৎ।
নিজের জীবনের এই লুক্কায়িত ঘটনা, যা হয়তো মহারাজ শান্তনুও জানতেন না, সেই ঘটনা তিনি ভীষ্মের কাছে কেন বলছেন, তার কারণ সত্যবতী নিজেই বলেছেন। সত্যবতী বলেছেন–একমাত্র তোমার কাছেই আমি আমার মনের কথা বলতে পারি, ভীষ্ম! কারণ তোমাকে আমি সম্পূর্ণ বিশ্বাস করি–বিশ্বাসাত্তে প্রবক্ষ্যামি। টীকাকার নীলকণ্ঠ এই বিশ্বাসের মর্ম বোঝেন বলেই বলেছেন–এই বিশ্বাসের মানে হল ভীষ্মের সঙ্গে সত্যবতীর অন্তরঙ্গতা বিশ্বাস অন্তরঙ্গত্ববুদ্ধেঃ। আমরা আগেই জানিয়েছি–সত্যবতী তার এই সমবয়স্ক বা কিঞ্চিৎ অধিকবয়স্ক পুত্রটিকে বন্ধুর মতো দেখতেন। হয়তো এই অন্তরঙ্গতা ছিল বলেই সত্যবতী ভীষ্মকেই শুধু এই কাহিনী বলতে পারেন, আর কাউকে নয়।
সত্যবতী বললেন–আমাদের এই ভরত বংশের কুল রক্ষার জন্য আমার এই জীবনকাহিনী তোমাকেই শুধু বিশ্বাস করে বলতে পারি–বিশ্বাসাত্তে প্রবক্ষ্যামি সন্তানায় কুলস্য নঃ
সত্যবতী আরও বললেন-বংশবিলুপ্তির মতো এই বিপন্ন সময়ে আমাদের কী করা উচিত, সে কথা তোমাকে না বলেই বা থাকি কী করেন তে শক্যমনাখ্যাতুম্ আপদ্ধর্মং তথা বিধ। না বলে পারছি না এই কারণে যে, তুমিই এখন এই বংশের ধর্মরক্ষক, তুমিই সত্যরক্ষক, আর সবচেয়ে বড় কথা–তুমি আমাদের একমাত্র অবলম্বন–ত্বমেব নঃ কুলে ধৰ্মঃ ত্বং সত্যং ত্বং পরা গতিঃ।
আগেই বলেছি–মনস্বিনী সত্যবতী একা কোনও সিদ্ধান্ত নেবেন না। তিনি তার জীবনকাহিনী বিবৃত করে ভরত বংশের প্রবাহ রক্ষায় সাহায্য করতে চাইছেন, কিন্তু তিনি যা বলছেন, তা করণীয় কিনা সে সিদ্ধান্তের ভার দিলেন ভীষ্মের হাতে, কারণ হস্তিনাপুরের পূর্ব-যুবরাজ তিনি। তার পুত্রের নামে রাজা হলেও হস্তিনাপুরের রাজতন্ত্র ভীষ্মের হাতেই ছিল এবং এখন তার পুত্রদের মৃত্যুর পরেও ভীষ্মই প্রখ্যাত ভরত বংশের সম্পূর্ণ দায়ভার বহন করছেন। সত্যবতী তাই বললেন–আমার এই কাহিনী শুনে যা করবার তুমি করো–তস্মানিশম্য সত্যং মে কুরুত্ব যদনন্তরম্।
সত্যবতী বলতে আরম্ভ করলেন–আমার বাবার একখানা নৌকা ছিল, জান। আমার তখন। কাঁচা বয়স–গতা প্ৰথমযৌবনে–তো আমি সেই নৌকায় বসে ছিলাম যমুনা নদীর ওপর। এমন সময় মহামুনি পরাশর যমুনা পার হবার জন্য আমারই নৌকায় এসে উঠলেন।
সত্যবতী তার এই মিলন-কাহিনী খুব সংক্ষেপে বলছেন ভীষ্মের কাছে। কারণ তিনি পুত্রকল্প, আবার প্রধান প্রধান ঘটনাগুলি তিনি বাদও দিচ্ছেন না, কারণ সত্যস্বরূপ ভীষ্মের কাছে তিনি কিছুই লুকোবেন না। নৌকা বেয়ে নিয়ে যাবার সময় পরাশর কীভাবে তাকে দেখে মোহমুগ্ধ হয়ে পড়লেন, মুনির মুখে ধীর-মধুর প্রেমের কথা শুনে আস্তে আস্তে সত্যবতী নিজেও কীভাবে তার বশীভূত হয়ে পড়লেন–সব ঘটনা আনুপূর্বিক ভীষ্মকে শোনালেন সত্যবতী। কন্যা অবস্থায় তার এই মিলন-কাহিনী শুনে ভীষ্ম যদি ভাবেন–তার পিতা শান্তনু শুধুই বঞ্চিত হয়েছেন, কেননা যে রমণীর কুমারীত্ব হৃত হয়েছে, তাকে বিবাহ করে তার পিতা কী পেলেন জীবনে–ভীষ্ম যদি এই কথা ভেবে দুঃখিত হন, সত্যবতী তাই বলেছেন–আমার কোনও উপায় ছিল না, বাবা। এদিকে মহর্ষি শাপ দেবেন এই ভয়, ওদিকে পিতার ভয়। আমি কী করব ভেবে পাচ্ছি না। এই অবস্থায় মুনি আমাকে এমন একটি দুর্লভ বর দিলেন যে, আর তাকে প্রত্যাখ্যান করার উপায় রইল না আমার–বরৈরসুলভৈরুক্তা ন প্রত্যাখ্যাতুমুৎসহে।
সত্যবর্তী বলে চললেন–আমাদের মিলন হয়েছিল সেই নৌকার ওপরেই। মুনি আপন তেজে চারদিকে অন্ধকারাচ্ছন্ন করে আমাকে যুগপৎ অভিভূত এবং বশীভূত করে ফেললেন –অভিভূয়স মাং বালাং তেজসা বশমানয়ৎ। আমাদের মিলন সম্পূর্ণ হলে মুনি বললেন–এই নদী মধ্যগত দ্বীপের মধ্যে আমার দ্বারা উৎপন্ন গর্ভ প্রসব করে তুমি আবারও কন্যা হয়ে যাবে–কন্যৈব ত্বং ভবিষ্যসি।
সত্যবতীর ভাবটা এই–আমি তোমার পিতাকে বঞ্চিত করিনি পুত্র। নিজের গুঢ় মিলন বর্ণনা করে সত্যবতী বললেন–আমার সেই কুমারী অবস্থার পুত্রটি এখন দ্বৈপায়ন নামে প্রসিদ্ধ হয়েছে। শুধু তাই নয়, সে এক মহাযোগী, মহা-ঋষি হয়ে গেছে–পারাশৰ্যো মহাযোগী সবভূব মহানৃষিঃ। চারটে বেদ ভাগ করেছে বলে লোকে তাকে ব্যাস বলেও ডাকে আবার গায়ের রঙ আমারই মতো কালো বলে লোকে তাকে কৃষ্ণ বলেও ডাকে-লোকে ব্যাসত্ব আপেদে কাষ্ণাৎ কৃষ্ণত্বমেব চ।
এই কৃষ্ণ-দ্বৈপায়ন ব্যাসকে ভীষ্ম খুব ভাল করেই চেনন, কিন্তু তার সঙ্গে ভীষ্মের যে এইরকম এক ভ্রাতৃ-সম্বন্ধ আছে তা বোধহয় তিনি জানতেন না। সত্যবতী ভীষ্মের কাছে তার কন্যাবস্থার পুত্রটির গুণখ্যাপন করতে লাগলেন, যেন ভীষ্ম তার গুণ জানেন না। এই কিছুদিন আগে অম্বার তপস্যার ঘটনা এবং পরশুরামের সঙ্গে তার যোগাযোগের কথা তো তিনি এই দ্বৈপায়ন ব্যাস এবং নারদের সঙ্গেই আলোচনা করেছিলেন। অতএব ভীষ্ম তার পরম-ঋত্বিক সম্বন্ধে সম্পূর্ণ সচেতন। সত্যবতী সেই ভীষ্মের কাছেই পুত্রের গুণপনা ব্যাখ্যা করছেন। সত্যবতী বললেন–ছেলে আমার যেমন সত্যবাদী, তেমনি জিতেন্দ্রিয়। অহোরাত্র এমন তপস্যা করেছে যে, পাপ বলে কোনও জিনিস নেই তার মধ্যে–সত্যবাদী শমপরস্তপসা দন্ধকিন্বিষঃ। জন্মের সঙ্গে সঙ্গেই সে পিতা পরাশরের পদবি অনুসরণ করেছে।
