দীর্ঘতমার নিজের জন্ম-কাহিনী যাই হোক, মহাভারত এবং অন্যান্য পুরাণগুলিতে যেমন খবর পাওয়া যাচ্ছে, তাতে দেখছি তার মধ্যেও কিছু কিছু যৌন বিকার তৈরি হয়েছিল। তিনি নিজে মন্ত্রদ্রষ্টা ঋষি ছিলেন। খোদ ঋগবেদে তার নামে কতগুলি সূক্ত আছে। কিন্তু বিদ্যাবত্তা এবং শাস্ত্রজ্ঞান যথেষ্ট থাকা সত্ত্বেও তিনি এতটাই ইন্দ্রিয়পরায়ণ হয়ে পড়েছিলেন যে, তার স্ত্রী-পুত্র তাকে ভেলায় করে গঙ্গায় ভাসিয়ে দেন। ভেলায় ভাসতে ভাসতেই দীর্ঘতমা এসে পৌঁছন আনব বা অনুবংশীয় রাজার দেশে। এখনকার দেশস্থিতিতে এই দেশ হল মুঙ্গের-ভাগলপুর অঞ্চল। এই দেশের রাজা বলির কোনও পুত্র ছিল না। রানী সুদেষ্ণা অপুত্রক অবস্থায় দিন কাটান। রাজবংশের ধারা বজায় রাখতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন এবং এই ব্যর্থতা বোধহয় অনেকটাই তার স্বামীর কারণেই। যাই হোক বলিরাজ দীর্ঘতমার কাছে প্রার্থনা জানালেন তার স্ত্রীর গর্ভে পুত্র উৎপাদন করার জন্য–সন্তানার্থং মহাভাগ ভার্যাসু মম মানদ।
দীর্ঘতমা বলিরাজের অনুরোধে স্বীকৃত হলেন বটে, কিন্তু রানী সুদেষ্ণা দীর্ঘতমাকে অন্ধ এবং বৃদ্ধ দেখে রাজার অজ্ঞাতসারে তার দাসীটিকে পাঠিয়ে দিলেন মুনির কাছে। মুনি সবই বুঝলেন এবং পরে অবশ্য বলিরাজের অনুরোধে এবং তিরস্কারে সুদেষ্ণাও দীর্ঘতমার সঙ্গে মিলিত হন। দীর্ঘতমার ঔরসে সুদেষ্ণার গর্ভে যে পুত্ররা জন্মাল, তাদের নাম জড়িয়ে আছে আমাদেরই পূর্ব ভারতের দেশগুলির সঙ্গে। এই পুত্রগুলির নাম অঙ্গ, বঙ্গ, কলিঙ্গ, পড় এবং সুহ্ম। বলিরাজের পুত্রদের নাম থেকেই না হয় আমরা আমাদের পরিচিত দেশগুলির নাম পেলাম, কিন্তু এই সম্পূর্ণ ঘটনা এবং প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে আমাদের যেটা লক্ষ্য করতে হবে, সেটা হল পরক্ষেত্রে উৎপাদিত দীর্ঘতমার এই পুত্রেরা কেউ দীর্ঘতমার পিতৃত্ব নিয়ে বিখ্যাত হলেন না। বলিরাজের নামেই তারা সবাই বালেয় ক্ষত্রিয় বলেই পরিচিত হলেন।
মহামতি ভীষ্মও সত্যবতীর কাছে এই ঘটনার উল্লেখ করে বুঝিয়ে দিতে চাইলেন যে, ক্ষেত্রজ সন্তান উৎপাদন করার জন্য ভীষ্মের দিকে অঙ্গুলি-নির্দেশ না করে উপযুক্ত ব্রাহ্মণ-ঋষিদের স্মরণ নিলে তার পূর্বকৃত সত্য-প্রতিজ্ঞা থেকেও তিনি ভ্রষ্ট হবেন না, অপরদিকে অম্বিকা ও অম্বালিকার সন্তানরাও বিচিত্রবীর্যের নামে পুরু-ভরত-কুরুবংশের গৌরবেই বিখ্যাত হবেন। ভীষ্ম শেষ সিদ্ধান্ত জানালেন–এই পৃথিবীতে মহাধনুর্ধর, মহা বলবান এবং পরম-ধার্মিক অনেক রাজাই আছেন–জাতাঃ পরমধর্মজ্ঞা বীর্যবন্তো মহারথাঃ যারা ব্রাহ্মণের বীজে পরক্ষেত্রে উৎপন্ন হয়েছেন–এমন্যে মহেসা ব্রাহ্মণৈঃ ক্ষত্রিয়া ভুবি। অতএব আপনিও সেই ব্যবস্থা করুন, মা! সেই ব্যবস্থা করুন। সিদ্ধান্তের শেষে ভীষ্ম আবারও সত্যবতীকে জননীর সম্বোধনে সম্বোধন করলেন, কারণ সত্যবতী এখন তার প্রায় সমবয়স্ক পুত্রটির কথা বন্ধুর মতো শুনছেন। ভীষ্ম বললেন–আমার কথা শুনে আপনার যেমনটি মনে চায় তাই করুন মা–এত্যুত্ব ত্বমপ্যত্র মাতঃ কুরু যথোঙ্গিত।
০৬৫. সত্য-প্রতিজ্ঞা
৬৫.
ভীষ্ম তার পূর্বকৃত সত্য-প্রতিজ্ঞা ছেড়ে মায়ের কথা শুনতে রাজি হলেন না। মায়ের কথা শোনাও নিশ্চয়ই ধর্ম, আপদ্ধর্মও ধর্ম, আবার সত্যরাও ধর্ম। মহাকাব্যের সমাজে এই সমস্ত ধর্মেরই মূল্য আছে, আবার এই ধর্ম সাধনের মধ্যে তরতমও আছে। মায়ের কথা, আপদ্ধর্ম–এই দুয়ের থেকেও ভীষ্মের কাছে প্রতিজ্ঞা-রক্ষার ধর্মই বড় হয়ে উঠল, কারণ প্রথমত বর্ণাশ্রমের আচারে ক্ষত্রিয়ের কাছে সত্য বা প্রতিজ্ঞা রক্ষা করার মতো বড় ধর্ম আর নেই। আর দ্বিতীয়ত মা যা চান, অথবা এখন যা আপদ্ধর্ম বলে বলা হচ্ছে, তার সমাধান ভীষ্ম ছাড়াও অন্য লোকও করতে পারেন। অর্থাৎ বিকল্প ব্যবস্থা এখানে হতে পারে। ভীষ্ম মাকে বলেছেন–আপনি গুণবান কোনও ব্রাহ্মণকে নিযুক্ত করুন। তিনিই প্রসিদ্ধ ভরত বংশের ধারা রক্ষা করবেন।
যে বংশে পুরু, ভরত, কুরুর মতো রাজা জন্মেছেন, সেই বংশ উপযুক্তভাবে রক্ষা করতে গেলে যাকে-তাকে দিয়ে কাজ হবে না–এ কথা ভীষ্মের মতো আর কে জানেন। ভীষ্ম তাই চরম ‘প্রোফেশনালিজম’ দেখিয়ে জননী সত্যবতীকে বলেছেন–দরকার হলে টাকা-পয়সা কবুল করুন, কিন্তু গুণবান কোনও ব্রাহ্মণকে এই ব্যাপারে আমন্ত্রণ করে আনতে হবে– ব্রাহ্মণো গুণবান্ কশ্চিদ্ ধনেনোপনিমতাম্।
‘গুণবান ব্রাহ্মণ’–কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সত্যবতীর মাথায় চকিতে বিদ্যুৎ খেলে গেল। যেমন আমাদেরও হয়। কঠিন রোগ সারাতে গেলে আমরা ডাক্তার ডাকি। এখানে বিকল্প থাকে। আমরা কখনও প্রচুর টাকা-পয়সা খরচা করে বড় ডাক্তার ডাকি, এবং অর্থমূল্যের বিশ্বাসে তার ওপর ভরসাও করি। অন্যদিকে আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে যদি কেউ ডাক্তার থাকেন, তবে তার ওপরে আমরা কিন্তু কখনও কখনও বেশি নির্ভর করি। তিনি হয়তো বড় চিকিৎসকের তুলনায় কিছু কম উজ্জ্বল হতে পারেন, কিন্তু স্বজন বলেই তার মায়া-মমতা এবং ব্যক্তিগত স্পর্শগুলি আমাদের কাছে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। এখানে সত্যবতীর। ক্ষেত্রেও তাই হল।
তিনি অর্থমূল্যের বিনিময়ে বিধিসম্মতভাবেই একজন শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণকে দিয়ে তার দুই পুত্রবধূর গর্ভাধান করাতে পারেন। কিন্তু আপন রক্তের সম্বন্ধের মধ্যেই যদি সেই মমত্বময় বিপত্তারণ মানুষটি সত্যবতী পেয়ে যান, তবে এই রকম একটি স্পর্শকাতর বিষয়ে অন্য ব্রাহ্মণকে ডেকে আনার প্রয়োজন কী? এর মধ্যেই সেই কাছের মানুষটির সন্ধান তিনি পেয়ে গেছেন, তাকে তিনি স্বচ্ছন্দে স্মরণ করতে পারছেন। কিন্তু সেই ব্যক্তিটি তার অত্যন্ত কাছের মানুষ হলেও হস্তিনার রাজবাড়ি তাকে চেনে না। হস্তিনার রাজবধূর গর্ভে যেখানে সন্তান উৎপাদন করাতে হবে, সেখানে নিজের একক ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত রাজবাড়ির ভাগ্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যায় না। তিনি যা ভাবছেন, তা মহারাজ শান্তনুর প্রথম পুত্র ভীষ্মের কাছে জানাতে হবে। পিতার জীবিত অবস্থা থেকেই যিনি প্রায় হস্তিনার রাজবাড়ির অভিভাবকের মতো, তাকে অতিক্রম করে সত্যবতী একা সেই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন না। যে সিদ্ধান্ত প্রসিদ্ধ ভরত-বংশের সামগ্রিক ধারাকে প্রভাবিত করবে, সেটা ভীষ্মের সঙ্গে আলোচনা করতেই হবে।
