ভীষ্ম বললেন–রানীমা! আপনি যে এত ধর্ম-ধর্ম করছেন, আপনি ধর্মের দিকেই একবার তাকিয়ে দেখুন। আমাদের সবাইকে এইভাবে ডুবিয়ে দেবেন না-রাত্রি ধর্মান্ অবেক্ষস্ব মা নঃ সর্বান্ ব্যনীনশঃ। ভীখ এবার ক্ষত্রিয়ের চিরন্তন ধর্ম স্মরণ করিয়ে সত্যবতীকে বললেন–সত্য থেকে চ্যুত হওয়া অথবা নিজের প্রতিজ্ঞা থেকে সরে আসাটা কি ক্ষত্রিয়ের ধর্ম হতে পারে, না সেটা ক্ষত্রিয়ের পক্ষে মানানসই হয়–সত্যাঙ্ক্ষতিঃ ক্ষত্রিয়স্য ন ধর্মেধু প্ৰশস্যতে। ভীষ্মের এই কথায় মহারাজ শান্তনুর রাজ্ঞী, সত্যবতী যদি দুঃখ পান, তাই ভীষ্ম তার দুশ্চিন্তার অংশীদার। হয়ে প্রস্তাব করলেন–মহারাজ শান্তনুর সন্তানধারা যাতে অব্যাহত থাকে, সেই বংশধর্মের কথা আপনাকে আমি নিশ্চয় বলব এবং যা বলব, তা আপনি হস্তিনাপুরের রাজপুরোহিত এবং অন্যান্য ব্রাহ্মণদের সঙ্গে আলোচনা করুন। আপদ্ধর্ম তো আর একরকম নয়। সমস্ত ব্রাহ্মণ এবং স্বয়ং পুরোহিত যারা আপদ্ধর্মের নানা বিধানের সঙ্গে পরিচিত, তারা সামাজিক নীতি-নিয়মের সম্বন্ধে অভিজ্ঞ, আপনি তাদের সঙ্গে আলোচনা করে করণীয় বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিন– আপদ্ধর্মার্থকুশলৈলোকতন্ত্রমবেক্ষ্য চ।
ভীষ্মের ভাবটা এই–বংশরক্ষার মতো আপধর্মের প্রসঙ্গ যদি থাকে, তো সেখানে। মুশকিল আসান হলেন ব্রাহ্মণেরা; আমি কেন? ভীষ্ম সত্যবতীর কাছে পরশুরামের একটি ঘটনা বললেন। পরশুরাম পিতাকে হত্যা করেছিলেন হৈহয়-যাদবদের বিখ্যাত রাজা কার্তবীর্য–অর্জুন। প্রতিহিংসা নেবার জন্য পরশুরাম কার্তবীর্য-অর্জুনকে আপন কুঠারের আঘাতে নৃশংসভাবে মেরে ফেলেন এবং তার রক্ত দিয়ে পিতার তর্পণ করেন। কিন্তু শুধু পিতৃহন্তাকে শাস্তি দিয়েই পরশুরামের ক্রোধাগ্নি প্রশমিত হল না। তিনি রথে চড়ে কাঁধে কুঠার নিয়ে বেরিয়ে পড়লেন–কোথায় কোন ক্ষত্রিয় আছে, তাদের সবাইকে মারবার প্রতিজ্ঞা নিয়ে।
পৌরাণিকেরা বলেন–পরশুরাম একুশবার পৃথিবীকে ক্ষত্রিয়শূন্য করে দেন। ক্ষত্রিয় পুরষেরা যখন কেউই আর বেঁচে রইলেন না, তখন তাদের বিধবা পত্নীরা ক্ষত্রিয়দের বংশধারা কোনওমতে জিইয়ে রাখবার জন্য বেদবিৎ শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণদের কাছে পুত্রার্থিনী হয়ে মিলন কামনা করলেন। ব্রাহ্মণরাও ক্ষত্রিয়াণী রমণীদের আপদগ্রস্ত দেখে আপধর্মের বিধানে তাদের গর্ভে পুত্র উৎপাদন করলেন–উৎপাদিতন্যপত্যানি ব্রাহ্মণৈর্বেদপারগৈঃ। সেকালের দিনের বৈদিক আচার এবং সামাজিক নিয়ম অনুযায়ী অন্যের দ্বারা উৎপাদিত ক্ষেত্রজ পুত্ৰও পরিণেতার পুত্র বলে গণ্য হতেন–পাণিগ্রাহস্য তনয়ঃ ইতি বেদেষু নিশ্চিতম।
ব্যাপারটা বোঝাতে গেলে এই রকম দাঁড়ায় : ক্ষেত্র মানে জমি। যে কোনও স্ত্রীলোকই ক্ষেত্র বলে পরিচিত, কেন না, ক্ষেত্র থেকে যেমন ধান-গম পাওয়া যায়, স্ত্রীলোকেন্দ্র গর্ভ থেকেও তেমনি আমরা পুত্র-কন্যার ফল লাভ করি। অতএব ক্ষেত্র অর্থ স্ত্রীলোক। বিবাহিত পুরুষের নিজের স্ত্রী হলেন তার স্বক্ষেত্র। এখন স্বক্ষেত্রে যদি বিধিসম্মতভাবে বিবাহিত পরিণেতা (যিনি বিয়ে করেছেন) পুরুষের সন্তান না হয়, তবে স্বামী ইচ্ছা করলে অন্য উচ্চকুলজাত শাস্ত্রজ্ঞ ব্রাহ্মণ পুরুষকে টাকা-পয়সা দিয়েই হোক, অথবা ব্যাকুলচিত্তে আহ্বান করেই হোক, অথবা যেভাবে হোক–তিনি তার নিজের স্ত্রী বা স্বক্ষেত্রে পুত্র উৎপাদন করার জন্য তাকে আহ্বান জানাতে পারেন।
এই প্রক্রিয়ার মধ্যে যেহেতু স্বামীর অনুমতি, তার অর্থ অথবা তার নিজকৃত নিমন্ত্রণ-প্রক্রিয়া জড়িত থাকে, তাই পুত্রটি তার নিজের বলেই পরিচিত হয়–ধনাদিনা উপনিমন্ত্রনা ক্ষেত্রপতেরেব সা সন্ততির্ন বিপ্রস্যেতি। এখানে নিয়োগকর্তা স্বামী, পুত্রও তারই। যে সব ঘটনায় স্বামী জীবিত না থাকেন, সেখানে স্ববংশীয় বৃদ্ধরা এই বিষয়ে অনুমতি করেন। আবার যেখানে স্বামীও নেই, বৃদ্ধরাও নেই, সেখানে স্ত্রী স্বয়ং উপযুক্ত ব্যক্তির কাছে পুত্র যাচনা করতে পারেন, যেমন এই পৃথিবী নিঃক্ষত্রিয় হবার পর তাদের ক্ষত্রিয় স্ত্রীলোকদের ক্ষেত্রে ঘটেছিল। লক্ষণীয়, এই পুত্র-যাচনার মধ্যে স্বামীর বংশধারা রক্ষা করার তাগিদটাই যেহেতু বেশি থাকে, তাই এই ‘তথাকথিত’ অবৈধ মিলনের মধ্যে রতি, রমণ বা ইন্দ্রিয়চরিতার্থতার বৃত্তি পুষ্ট হওয়ার কথাটা গৌণ হয়ে যেত। পুত্র-প্রাপ্তিই যেহেতু প্রধান লক্ষ্য, তাই এই ব্রাহ্মণ-সংসর্গের মধ্যেও ধর্মবুদ্ধিই প্রধান কার্যকরী শক্তি বলে মনে করা হত-ধর্মং মনসি সংস্থাপ্য ব্রাহ্মণাংস্তা সমভ্যয়ুঃ।
ভীষ্ম সত্যবতীর কাছে সাধারণভাবে প্রথমে জানালেন যে, কীভাবে উচ্ছিন্ন ক্ষত্রিয় বংশ ব্রাহ্মণদের দ্বারা পুনঃস্থাপিত হয়েছিল। দ্বিতীয় উদাহরণে তিনি সেই অন্ধ ঋষি দীর্ঘতমার প্রসঙ্গ উত্থাপন করলেন। দীর্ঘতমার কথা আমরা পূর্বে বলেছি। বলেছি–উতথ্য এবং বৃহস্পতির প্রসঙ্গে। বৃহস্পতি তার অগ্রজ উতথ্যের পত্নী মমতার অনিচ্ছা সত্ত্বেও তাকে গর্ভবতী অবস্থায় ধর্ষণ করেন। মমতার গর্ভস্থ সন্তান বৃহস্পতির শাপ লাভ করে অন্ধ অবস্থায় জন্মগ্রহণ করেন। অথবা গর্ভবতী অবস্থায় ধর্ষিতা হবার কারণেই হয়তো তিনি অন্ধ দীর্ঘতমার জননী হন।
