সত্যবতীর কথার মধ্যে মমতা ছিল, ব্যক্তিত্ব ছিল এবং গুরুজনোচিত আদেশও ছিল। তিনি বলেছিলেন–আমার আদেশে আমারই পুত্রবধূদের গর্ভে তুমি পুত্র উৎপাদন করো। আমাদের কুলের বৃদ্ধি হবে তাতে–তয়োরুৎপাদয়াপত্যং সন্তানায় কুলস্য নঃ।
আপনারা জানেন–সেকালে এই নিয়ম প্রচলিত ছিল। যে রমণী অপুত্রক অবস্থায় বিধবা হলেন অথবা যাঁর স্বামী পুত্র উৎপাদনে অক্ষম, সেই রমণীকে পুত্রহীনতার অভিশাপ নিয়েই সারা জীবন কাটাতে হত না। বিধবা রমণী হলে একই বংশজ দেবরের দ্বারা পুত্রোৎপত্তি সামাজিকরা মেনে নিতেন। দেবর কিংবা স্বামীর বংশজ কেউ না থাকলে ধার্মিক ব্রাহ্মণকেও পুত্র উৎপাদন করার জন্য অনুরোধ করা হত। কিন্তু অপুত্রক রমণী নিজের ইচ্ছামতো যাকে পছন্দ তাকে দিয়েই নিজের গর্ভাধান করাতে পারতেন না। এক্ষেত্রে বাড়ির বয়োজ্যষ্ঠ বা হিতৈষী বৃদ্ধদের অনুমতি প্রয়োজন হত। তার বংশরক্ষার প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যক্তিকে পুত্রোৎপাদনে নিয়োগ করতেন বলেই–এই প্রথার নাম নিয়োগ-প্রথা। সত্যবতীর মুখেও ভীষ্মের প্রতি এই নিয়োগের উচ্চারণ শুনতে পাই–তোমাকে আমি এই কাজে নিযুক্ত করছি–কার্যে ত্বাং বিনিযোক্ষ্যামি তদ্ভুত্ব কর্তুমহসি। অথবা সত্যবতী বলছেন–আমার আদেশে তুমি এই ধর্মকার্য সম্পন্ন করো–মন্নিয়োগাহাবাহো ধর্মং কর্তৃমিহাইসি।
ভীষ্ম সত্যবতীর কথার উত্তর দিলেন আনুপূর্বিক যুক্তি সহকারে। বললেন–মা! আপনি যে প্রস্তাব করেছেন, তা অবশ্যই ধর্মসম্মত, কিন্তু পুত্র উৎপাদন করার ব্যাপারে আমি পূর্বে যে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম, সে তো আপনি ভালই জানেন– প্রতিজ্ঞাং বে মে পুরা। আপনার বিবাহের পণ হিসেবেই আমাকে এই প্রতিজ্ঞা করতে হয়েছিল এবং তাও আপনার না জানা থাকার কথা নয়-জানাসি চ যথাবৃত্তং শুল্কহেতোস্তদন্তরে। আমি এই তিন ভুবন ত্যাগ করতে পারি, আমি যদি দেবতাদের রাজা হই, তো সেই রাজত্বও আমি ত্যাগ করতে পারি, কিন্তু আমার প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করতে পারি না। আজকে যদি সূর্য তার প্রভা ত্যাগ করে অথবা চাঁদ ত্যাগ করে তার শীতলতা–প্রভাং সমুৎসুদকঃ..সোমঃ শীতাংশুতাং ত্যজেৎ–তবু আমি আমার প্রতিজ্ঞা ত্যাগ করতে পারি না।
সত্যবতী ভীষ্মের কাছে যে প্রস্তাব দিয়েছিলেন, তাতে যে এই বয়স্ক পুত্রটির কাছে বেশ খানিকটা কটু কথা শুনতে হবে, সে কথা তিনি বেশ ভালই জানতেন। এর জন্য তিনি রাগও করলেন না ভীষ্মের ওপর। কারণ, তিনি জানেন–ভীষ্মের প্রতি যে অসম্ভব বঞ্চনা পূর্বেই হয়ে গেছে, তার জন্য এই সামান্য প্রায়শ্চিত্তটুকু তাকে করতেই হবে। ভীষ্মের মুখে এত কঠিন কথা শুনেও সত্যবতী তবু অবুঝের মতো বলে উঠলেন–জানি। আমি জানি। তুমি যে দৃঢ়ভাবে সত্যে প্রতিষ্ঠিত–তা জানি। আমি এও জানি–আমারই কারণে এই কঠিন প্রতিজ্ঞা তুমি করেছিলে–জানামি চৈব সত্যং তম্মমার্থে যচ্চ ভাষিত। কিন্তু দেখ, আপদ-ধর্মের কথা তো তোমাকে বুঝতে হবে। তোমাকে তো ভাবতেই হবে, যাতে তোমাদের এই বিশাল বংশের ধারাটি ছিন্ন না হয়ে যায়, যাতে ধর্ম বিপন্ন না হয়ে পড়ে–যথা তে কুলতশ্চ ধর্মশ্চ ন পরাভবেৎ।
আপদ-ধর্ম, বংশ-রক্ষা, কুল-ধর্ম–সত্যবতী অনেক ধর্মের কথা বলেছেন। সন্দেহ নেই–অতিরিক্ত বিপন্নতার মধ্যে মানুষকে তার নীতি-ধর্ম থেকে সরে আসতে হয়। এই সরে আসাটা আপদ-ধর্মের মধ্যে গণ্য হয় বলেই শাস্ত্ৰকারেরা তার মধ্যে কাপদৃষ্টি করেন না। প্রচণ্ড অন্নকষ্ট এবং দুর্ভিক্ষের মধ্যে এক মুনিকে কুকুরের মাংস খেয়ে জীবনরক্ষা করতে হয়েছিল সেই ঐতিহাসিক খবর আমরা মহাভারত থেকেই ভবিষ্যতে উদ্ধার করব। সত্যবতী মনে করেন-আজ ভরতবংশের কুলতন্তু ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় এই রকমই এক বিপন্নতা তৈরি হয়েছে, যা জীবনরক্ষার চেয়ে কম কিছু গুরুত্বপূর্ণ নয়। সত্যবতী যা বলেছেন, তা ভরতবংশের প্রতি মমতাবশতই বলেছেন, কিন্তু এই বলাটার মধ্যে এমনই এক বিলম্বের বিড়ম্বনা আছে, যা ভীষ্মের প্রতি সুবিচারের তথ্য বহন করে না।
পিতা শান্তনুর সঙ্গে সত্যবতীর বিবাহের সময় ভরতবংশের যুবরাজ যুবক ভীষ্মকে যে অসম্ভব প্রতিজ্ঞা করে নিজের যৌবনকে প্রতিহত করতে হয়েছিল, এখন সেই ভীষ্মকেই যদি তার পরিণত বয়সের পরিণতিকে অস্বীকার করে শুধু ভরতবংশের ধারা রক্ষা করার জন্য, তিনি পূর্বে যা করবেন না বলে প্রতিজ্ঞা করেছেন, তাই করতে হয়, তবে সেটা ভীষ্মের প্রতিই অবিচার করা হয়। মহাভারতের কবির নিরপেক্ষ দৃষ্টিতেও ভীষ্মের প্রতি এই সহানুভূতিটুকু আছে। অতএব কবির জননী হওয়া সত্ত্বেও সত্যবতী যা বলেছেন–তা সে আপ-ধর্মই হোক অথবা কুলধর্ম-মহাভারতের কবির মতে সত্যবতী যা বলেছেন, তা ভীষ্মের ওপর অবিচার করে বলেই তা অধর্ম-ধৰ্মাদ অপেতং ধ্রুবতীং…কৃপণাং পুত্ৰগৃদ্ধিনীম্।
ভীষ্ম সত্যবতীর আপদ্ধর্মের কথার সূত্র ধরেই উত্তর দিলেন। সত্যবতী ভীষ্মকে বলেছিলেন–আমি তোমায় নিয়োগ করছি, আদেশ করছি–কার্যে ত্বং বিনিযোক্ষ্যামি… মন্নিয়োগামহাবাহো–ভীষ্ম সেই আদেশেরও প্রত্যুত্তর দিচ্ছেন। এই প্রত্যুত্তর জননীর প্রতি নয়, কারণ প্রকৃত জননী হলে ভীষ্মের মনোব্যথা তিনি বুঝতেন। এই এক মুহূর্তের আদেশের মধ্যে সত্যবতী তার প্রায় সমবয়স্ক অথবা উত্তরবয়সী বন্ধুটির বন্ধুত্ব এবং অবশ্যই পুত্রত্বও অতিক্রম করে অন্যায়ভাবে ভীষ্মের ওপর জোর খাটাচ্ছেন। এই জোর খাটানোটা অন্তত সেই মুহূর্তের জন্য তার কাছে প্রয়োজনীয় মনে হলেও, সেটা জননীর মতো নয়। ভীষ্মও তাই জননীকে উত্তর দিচ্ছেন না। উত্তর দিচ্ছেন পুরু-ভরতবংশের রাজমাতাকে, রাজরানীকে। বিচিত্রবীর্যের মৃত্যুর পর হস্তিনাপুরের রাজ-সিংহাসন এখন রিক্ত। এখানে অফিসিয়ালি আদেশ দেবার মতো এখন কেউ নেই। কিন্তু মহারাজ শান্তনুর পরিণীতা পত্নী এবং রাজা বিচিত্রবীর্যের মাতা মহারাজ শান্তনুর সমস্ত রাজকার্যে উপস্থিত। তিনি রাজবংশের স্থিতিশীলতা নিয়ে চিন্তা করছেন। অতএব ভীষ্ম তাকে বোধহয় নিতান্ত ইচ্ছাকৃতভাবেই সম্বোধন করলেন রাজ্ঞী বলে।
